তুমি তবে প্রতিজ্ঞা কর। সে জিজ্ঞেস করল মিথ্যে আশা দিচ্ছ না তো আবার?
বন্ড মার্কের ডান হাতটা নিজের হাতের মধ্যে নিয়ে একটু সহানুভূতির চাপ দিল।
নাও! শপথ করলাম। তুমি আমার মনটা বিক্ষিপ্ত করে রেখ না। এবার একটা ড্রিংকের অর্ডার দাও। বন্ড হাসল, দু জনে একইসাথে দরজার দিকে তাকিয়ে দেখল ট্রেসী আসছে। ও বোধহয় ভাবছে আমরা বোধহয় মারপিট শুরু করে দিয়েছি, বলে ফেলল বন্ড।
হ্যাঁ, আমি তো তাই আশংকা করেছিলাম। আর জীবনে এই প্রথম আমি তোমার কাছে হেরে গেলাম।
.
হে বন্ধু বিদায়
তুমি জেমস বন্ড, মিসেস টেরেসাকে স্ত্রী বলে গ্রহণ করছ?
করছি।
সকাল সাড়ে দশটা তখন। বছরের প্রথম দিন। ব্রিটিশ কনসাল জেনারেলের ড্রইং রুম। একে ছুটির দিন তার উপর নববর্ষের আগের সন্ধ্যায় খুব হৈচৈ হয়েছে। তখনও নেশার ঘোর কেটে যায়নি। তবু ভদ্রলোক যথেষ্ট মানবতার পরিচয় দিলেন। তবে অনেক আচার-অনুষ্ঠান বাদ দিয়ে গেলেন। না হলে আরও কয়েকদিন দেরি হত। প্রথম দিন তাদের একসাথে দেখেই বললেন, তোমাদের দুজনকে নীরোগ বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু কমান্ডার বন্ড, তোমার কপালে যে কাটা দাগটা এখনো শুকোয়নি। কাউন্টসেকেও একটু ক্লান্ত, বিবর্ণ বলে মনে হয়। তবে ওটা কিছু নয়। যাক, সব কাগজপত্র আমি ঠিক করে রেখেছি। তাহলে পয়লা দিনই শুভ কাজটা হয়ে যাক, কি বল? তিনি মিষ্টি করে হাসলেন।
গাড়ির চারদিক সাদা ফিতে দিয়ে জড়ানো আছে, বন্ড একটু আড়চোখে তাকাল কনসালের স্ত্রীর কাজ হবে এটা। গাড়ির আশেপাশে বেশ লোক জড়ো হয়ে আছে। সদ্য বিবাহিত লোক দুটির প্রতি মানুষের চিরন্তর আগ্রহ থাকে।
গাড়িতে ট্রেসী আগে উঠল। মাথায় টুপি খুলে পিছনে ছুঁড়ে দিল, তারপর বন্ড উঠে গেল।
ট্রেসী গাড়ি চালাতে লাগল ও আস্তে আস্তে গাড়ির বেগ বাড়িয়ে দিল। গাড়ি রাস্তায় বাঁক নিল।
ওহে রাজকন্যা, বন্ড গাঢ় স্বরে ডাকল, গাড়িটা পথের ধারে একটু দাঁড় করালে ভাল হয়। দু টো কথা আছে।
ট্রেসী গাড়ি থামিয়ে তার দিকে তাকাল। বন্ড হাত বাড়িয়ে তাকে স্নেহ ও ভালবাসা দিয়ে চুমু খেল।
এই গেল আমার প্রথম কথা। বন্ড বলল, আর আমার দ্বিতীয় কথা হল আজ থেকে তোমার সব ভার আমি নিলাম।
যেমন করে ট্রেসী আয়নায় মুখ দেখে তেমন করে বন্ডকে দেখতে লাগল। এর জন্যই মনে হয় মিঃ ও মিসেস বলে তাই নয় কি? কিন্তু তোমাকেও কিছু ভার দেওয়া দরকার। এসো না দুজনে ভাগাভাগি করে ভাগ নেব।
বেশ তাই হবে।
কিন্তু এবার গাড়ির ফিতেগুলি খুলে দিই। ভারি বাজে লাগছে। তুমি কিছু মনে করবে না তো?
না, না, মনে করার কি আছে, বলে ট্রেসী হাসল।
বন্ড নেমে সব ফিতে ছিঁড়ে ফেলল। সূর্যের উষ্ণ আলো তার মুখে এসে লাগল। গাড়ির হুড যদি খুলে রাখি তবে ঠাণ্ডা লাগবে কি?
না, ঠাণ্ডা আবার কোথায়? ট্রেসী বলল, যদি ঠাণ্ডা লাগে তবে তুলে দিলেই হবে। দুটো স্কু খুলে দিয়ে পিছনের ক্যানভাসটা গুটিয়ে রাখল। রাস্তায় আরও গাড়ি ছুটে যাচ্ছে। কিন্তু দূরে একটা লাল মারসিডিস গাড়ি তেল নিচ্ছে। এক মুহূর্তের জন্য তার চোখে পড়ে গেল। সামনের সিটে একজন মেয়ে ও একটি ছেলে। পরনে তার সাদা কোট, গলা অবধি বোতাম আঁটা। চোখে ঘন সবুজ রঙের গগলস, প্রায় পুরো মুখটাই ঢাকা। স্পোর্টস কার যারা চালায় তাদেরই এরকম পোশাক থাকে।
বন্ড গাড়িতে উঠে পড়ল। ঝলমলে সিটে সোনালি সকালে দুই প্রেমিক-প্রেমিকা ছুটে চলল। মাইল মিটারের কাঁটা দ্রুত বেড়ে চলেছে।
শুধু বাতাসের গন্ধ।
বন্ড ঘড়ি দেখল, এগারোটা পঁয়তাল্লিশ। একটি বড় দুর্গের কাছে এসে পড়ল তারা। এখানে একটি সরু রাস্তায় কয়েকটি রেস্তোরাঁ। বাজনার শব্দ ধীরে ধীরে শোনা যাচ্ছে। অনেক দৌড়াদৌড়ি করে জার্মান টুরিস্টরা অস্ট্রিয়া থেকে ফেরার সময়ে এখানে একটু বিশ্রাম নেয়। মদ খায়, গান শোনে তাদের ক্লান্তি দূর করে।
বন্ড ট্রেসীর কানের কাছে মুখ এনে কথা বলছিল। এখানেই অস্ট্রিয়ার সীমান্ত, ১৯১৪ সালে যুদ্ধের স্মরণ-স্তম্ভ।
গাড়ি অনেক কমে গেছে। ওরা বোজেন হাইজের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে। দূরে, বরফে ঢাকা সাদা পাহাড়ের সারি, বন্ড একটু পিছনে দেখল। অনেক দূরে একটা লাল বিন্দু দেখা যাচ্ছে। সেই মারসিডিস গাড়িটা মনে হয়। ল্যানসিয়ার সাথে পাল্লা দেওয়ার ইচ্ছা ওদের নেই। আশি মাইল স্পোর্টস গাড়ির কাছে কিছু নয়।
দশ মিনিট পরে ট্রেসী বলল, পেছনে একটি লাল গাড়ি জোরে আসছে, ওটাকে মেরে তবে বেরিয়ে যাই।
না, ওটাকে আগে যেতে দাও। আমাদের হাতে অনেক সময় আছে।
মারসিডিসটি বেরিয়ে গেল না। পরক্ষণেই গুলির শব্দ পরপর শোনা গেল। ল্যানসিয়ার উইন্ডস্ক্রীন প্রচণ্ড শব্দে চুরমার হয়ে গেল। আর লাল গাড়িটা চলে যাওয়ার সময় অটোমেটিক পিস্তলটা তার চোখে পড়ে গেল।
ল্যানসিয়া সোজা যেতে পারল না। রাস্তা দিয়ে এঁকেবেঁকে বেরিয়ে গেল। প্রচণ্ড ধাক্কা লাগল। পর মুহূর্তে সে ছিটকে বেরিয়ে গেল গাড়ি থেকে। পড়ল কয়েক হাত দূরে ঘাসের উপর। তারপর সব অন্ধকার যখন তার জ্ঞান ফিরল, দেখল একজন পুলিশ গায়ের উপর ঝুঁকে তাকে কি যেন প্রশ্ন করছে।
বন্ড দেখতে পেল পাশেই ভাঙ্গা স্টিয়ারিং আর বাঁকানো লোহার মধ্যে মুখ গুঁজে পড়ে আছে ট্রেসী। সোনালি চুলে জমাট বাঁধা রক্ত। বন্ড তার কাঁধে হাত রেখে দেখল জামায় ছোপ ছোপ রক্ত। বউ আরও গায়ের কাছে সরে এল। সেই তরুণ পুরুষটি তখন জার্মান ভাষায় প্রশ্ন করল তাকে, ব্যাকুল তার গলার স্বর, উদভ্রান্ত তার চোখের দৃষ্টি। ব্যস্ত হবার কিছু নেই। বন্ড তাকে আস্তে করে বলল, ও একটু বিশ্রাম নিচ্ছে। আমরা আবার একটু পরেই যাব। তাড়া নেই কিছু, বুঝলে? বন্ড ট্রেসীর চুলের মধ্যে মুখ রাখল আর বলতে লাগল, কোন তাড়া নেই। আমাদের হাতে অফুরন্ত সময় আছে।
ইউ অনলি লিভড টোয়াইস
ইউ অনলি লিভড টোয়াইস
প্রথম পর্ব
