.
হেলিকপ্টারের রক্ত কণিকা
পরদিন লাঞ্চের পর বন্ড স্ট্রাসবার্গ প্লেনে করে এল। এখানে এক নামী হোটেলে তার থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। চারদিকে ভদ্রতা ও সৌজন্যের ছড়াছড়ি। সর্বত্র ইউনিয়নের প্রতিপত্তি।
তার সারা দিন কিছু করবার ছিল না। পরদিন সারা সকালটাও শুয়ে কাটিয়ে দিল। পরে সে এক সময়ে স্কী পোশাক, গগলস ও এক জোড়া চামড়ার দস্তানা আনতে বলে দিল।
পিস্তল থেকে গুলি বার করে আয়নায় গুলি ছোঁড়া অভ্যাস করতে লাগল। তারপর আবার গুলি ভরে নিল পিস্তলে। পিস্তলটা কোমরের বেল্টে আটকে নিল।
হোটেলের বিল আগেই মিটিয়েছিল। সুইকেসটা ট্রেসীর ঠিকানায় পাঠাতে বলে দিয়েছে। তারপর খবরে কাগজ নিয়ে জানালার কাছে বসে পড়ল। ঘরের চারপাশে তাকিয়ে নিয়ে ঘরের বাইরে এল দরজাটা ভেজিয়ে দিয়ে। নিচে তার অপেক্ষায় গাড়ি দাঁড়িয়েছিল।
চে চে বসেছে স্টীয়ারিং হুইলে। বন্ডের অভিবাদনটা নিঃশব্দে মাথা নেড়ে মেনে নিল। এক ঘণ্টা গাড়ি ছোটার পর একটা সরু গলির মধ্যে গাড়ি ঢুকে গেল। রাস্তার নানা স্থানে কাদায় ভরে আছে। এই পথটা কিছুটা এগিয়ে গিয়ে জঙ্গলে চলে গেছে। গাড়ি জঙ্গলে ঢুকে গেল।
চারদিকে দেয়াল, ভাঙ্গা লোহার গেট দিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ল। ভেতরে বড় একটা পার্ক। বন্ডের গাড়ির চাকার দাগ চোখে পড়ল।
পেছন দিকে আর একটা খোলা গেট দেখা গেল। এই গেট পার হয়ে তারা ফাঁকা মাঠে এসে পড়ল। তারপর আবার জঙ্গল। জঙ্গলের শেষে একটা গোলা বাড়ি। চে চে তার গাড়ি এখানে থামাল, তিনবার হর্ন বাজাল। গোলার দরজা খুলে বের হয়ে এল মার্ক এ্যানজে। তাকে হাসি মুখে ভিতরে নিয়ে গেল।
ভেতরটা প্রায় ফিল্ম সেটের মত দেখতে। মাঝখানে একটা হেলিকপ্টার। কোন দিক থেকে জেনারেটরের শব্দ আসছে বন্ড তা বুঝতে পারল না। মনে হল ঘরের মধ্যে বেশ অনেক লোক জমা হয়েছে। ইউনিয়নের কিছু মুখ আছে যা তার চেনা। দুটি লোক সিঁড়ির উপর দাঁড়িয়ে হেলিকপ্টারের গায়ে রেড ক্রুশ চিহ্ন এঁকে দিচ্ছে।
মার্ক বন্ডের সাথে পাইলটের আলাপ করিয়ে দিল। খুন চটপটে যুবক নাম জর্জেস। বন্ড তুমি ওর পাশে গিয়ে বসবে, বলল মার্ক, ও হেলিকপ্টারের ওস্তাদ লোক। কিন্তু এই জায়গাটা ভাল জানা নেই। ও নিজ গ্লোরিয়ার নাম কোনদিন শোনেনি। উৎসাহ নিয়ে হেসে মার্ক বলল, ফরাসী ভাষায় সুইস এয়ার ডিফেন্সের সাথে আমাদের কিছু মজার কথাবার্তা হবে, কি বল জর্জঃ জর্জ বলল, মনে হয় ওদের বোকা বানানো যাবে। ফলে কাজে মন দিল। এই সময় কোন পুলিশ বাহিনী সুইজারল্যান্ডে নেই, বন্ড হেসে বলল, তবে এ মনে হয় না তারা এত খোঁজ রাখে। মার্ক ঘড়ি দেখে নিল। ফরাসীতে বলল দুটো পঁয়তাল্লিশ। সবাই তৈরি, তবে এখন রওনা হওয়া যাক।
ছোট অ্যালুমিনিয়াম-এর দরজা দিয়ে তারা একে একে হেলিকপ্টারের মধ্যে ঢুকে গেল। সবাই বসে পড়ল। কোমরে বেল্ট জড়িয়ে নিল। সিঁড়ি উঠিয়ে নিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল।
নিচে মেকানিক ছোকরা ক জন বুড়ো আঙ্গুল তুলে দেখাল। পাইলট স্টার্টারে চাপ দিল। ইঞ্জিনটা একটু কেঁপে উঠল, প্রথমে খুব আস্তে তারপর জোরে। হেলিকপ্টার কাঁপতে লাগল এমনভাবে যেন মাটির মায়া ত্যাগ করতে পারছে না।
হঠাৎ একটা ধাক্কা লাগল। হেলিকপ্টার গাছপালা পার হয়ে উপরে উঠতে লাগল। কয়েক মিনিটের মধ্যে তারা রাইন নদীর উপর দিয়ে উড়ে যেতে লাগল।
শহরের উপরে আসতেই সুইস এয়ার কন্ট্রোল থেকে বন্ডের ইয়ার ফোনে অনুরোধ ভেসে এল, তারা যেন শীঘ্র তাদের পরিচয় জানায়। পাইলট কোন উত্তর দিল না।
আবার বাতাসে প্রশ্ন এল এবার কিন্তু বোঝা গেল গলার শব্দে খুবই জরুরী। পাইলট ফরাসী ভাষায় বলল, তোমার কথা কিছু বুঝতে পারছি না।
একটু চুপ করে গেল।
আবার ফরাসী ভাষায় অনুরোধ করল তাদের পরিচয় জানবার জন্য।
পাইলট বলল, পরিষ্কার বোঝা যাচ্ছে না। তারা যেন ভাল করে বলে।
আবার তারা একই কথা বলল।
পাইলট এবার জবাব দিল-রেডক্রস হেলিকপ্টার ইটালীতে ব্লাড প্লাজমা নিয়ে যাচ্ছে। রেডিওর আর কোন শব্দ হল না।
বন্ড অনুমান করল নিচে কোথাও কন্ট্রোল রুমে হৈচৈ পড়ে গেছে।
আবার শোনা যাচ্ছে তোমার কোথায় যেতে চাইছ?
পাইলট বলল, কিছুক্ষণ অপেক্ষা কর, এই তো আমার কাছেই রয়েছে। একটু পরে, সুইস এয়ার কন্ট্রোল।
হ্যাঁ, হ্যাঁ।
আমার গন্তব্য স্থল ওসপিডেল সানটা, মনিকা বেলিন জানা।
তোমরা এখানে বিনা অনুমতিতে চলে এসেছ। শীঘ্র নেমে পড়। ফ্লাইং কন্ট্রোল রিপোর্ট কর। আবার বলছি নামো। রিপোর্ট কর। পাইলট বলল, তুমি কি বলছ? মানুষের জন্য তোমার কোন দয়ামায়া নেই। মরণাপন্নের জন্য দুর্লভ রক্তকণিকা নিয়ে যাচ্ছি। একজন বৈজ্ঞানিকের জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে। এই রক্ত পৌঁছাতেই হবে। তা না হলে লোকটাকে মেরে ফেলা হবে। তুমি কি খুনী হতে পারবে?
এরপর তারা নিরাপদে এগিয়ে গেল।
বন্ড হেসে উঠল, আবার সব চুপচাপ। আলপস্ পাহাড়ের শ্রেণী দেখা গেল। এখনই তারা এসে উপত্যকায় নেমে পড়বে।
কিন্তু এরই মধ্যে বার্ন কন্ট্রোল রুমে ওরা তাড়াতাড়ি কাগজগুলি দেখে নিয়েছে। শোনা গেল একটা ভদ্র গলার স্বর।
ফেডোরেল এয়ার কন্ট্রোল অফিসে তোমাদের ওড়াবার কোন অনুমতি পত্র নেই। তাই সুইস আকাশ অনধিকার প্রবেশ করেছ। আর যদি কোন প্রমাণ পত্র তোমাদের না থেকে থাকে, তবে তোমাদের জুরিখ ফিরে যাবার কথা বলা হচ্ছে। সেখানে ফ্লাইং কন্ট্রোলে রিপোর্ট কর।
