তার ট্রেসীর কথা কবে শুনতে পাবে। ওকে সে কথা দিয়ে এসেছে, কিন্তু সে যদি কোন দরকারী কাজে পড়ে যায়। যদি চেষ্টা করেও সময় না পায়?
যেমন করেই হোক তাকে সময় করতেই হবে। সে তার নিজের দেশে স্কটল্যান্ডেই বিয়ে করবে। হঠাৎ তার সম্বিৎ ফিরে এল, ভাবল স্বপ্নে সময় নষ্ট করলে চলবে না। সে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল, মেয়েদের নামের তালিকা বার করল। স্টেশনে Z-এর সাথে তাকে যোগাযোগ করতে হবে।
উইন্ডসর ফরেস্টের কাছে M-এর বাড়ি। অবশ্য লোকজনের সঙ্গে দেখা সাক্ষাৎ করার তাগিদে তিনি যে কোন। জায়গাতেই থাকতে পারতেন, সমুদ্রে বা পাহাড়ে। M গুপ্তচর সংস্থার প্রধান কর্তা। বছরে সে ৫০০০ পাউন্ড পারিশ্রমিক পান। রোলস রয়েস গাড়ি আর ড্রাইভার ফ্রিতে পান। নৌ-বিভাগের ভাইস এ্যাডমিরাল ছিলেন, অবসর নিয়ে ছিলেন। সেখানে তিনি পেনশন পান ১৫০০ পাউন্ড পর্যন্ত। ট্যাক্স বাদ দিয়ে ভদ্রলোক বছরে ৪০০০ পাউন্ড অনায়াসে আয়। করেন। দরজার বেলটা বাজিয়ে এসব কথা ভাবছিল। হ্যামন্ড তার কুশল জিজ্ঞেস করে ঘরের ভিতরে নিয়ে গেল।
অবিবাহিত জীবনে M-এর অন্যতম সখ ছিল ছবি আঁকা। ঊনবিংশ শতাব্দীর প্রকৃতিবাদী চিত্রকরদের মত বন্য। অর্কিডের ছবি আঁকতে ভালবাসতেন। তার ছবির হাতও ভাল, টেকনিকের দিক দিয়ে কোন ত্রুটি নেই, আর রঙ মেশানোর ব্যাপারেও নয়।
M জানালার পাশে বসেই ছবি আঁকেন। ড্রইং বোর্ডের উপর নিচু হয়ে। সামনেই পানিভরা গ্লাসে একটি ফুল। ফুলটির দিকে শেষ একবার গভীর নজর দিয়ে M যেন অনিচ্ছা সত্ত্বেও দাঁড়ালেন। বন্ডের দিকে তার সেই বিরল হাসির। রেশ ছড়িয়ে বললেন, শুভ সন্ধ্যা, জেমস্। হ্যাপি ক্ৰীসমাস এবং আর যা আছে সব কিছু। একটা চেয়ার টেনে নিয়ে বস। M-ও নিজে তার চেয়ারে গিয়ে বসলেন। কথা বলতে শুরু করার আগেই বন্ড টেবিলের উল্টোদিকের চেয়ারে গিয়ে বসল। সাধারণতঃ এই চেয়ারটায় তিনি বসেন। তামাক ভরতে লাগলেন M। সেই মোটা আমেরিকান ডিটেকটিভের নামটা কি? সেই যে সব সময় অর্কিড নিয়ে নাড়াচাড়া করত? অর্কিড ঘর থেকে বের হয়ে প্রচুর খাবার নিয়ে বসে যেত। আর খেতে খেতেই সে খুনের সমাধা করে ফেলত। কি যেন নামটা?
নিরো উল, স্যার। লেখক হলেন স্কাউট আমার বেশ ভাল লাগে।
হ্যাঁ, পড়া যায়। আমি ওর অকির্ডের ব্যাপারে লেখা দেখেছি। অর্কিডের মত এত বিশ্রী আকার ফুল যে লোকের। কেমনভাবে ভাল লাগে সেটা আমার বোঝার বাইরে। এটা জন্তুজানোয়ারের কথা মনে করিয়ে দেয়। কি রঙের বাহার। দেখলে আবার মনে হয় যেন হলদে জীভটা বের হয়ে আছে। বিশ্রী। কিন্তু গ্লাসে ফুলের দিকে আঙ্গুল তুলে বলেন ওটা কিন্তু সত্যিই ভাল। ওটাকে কি বলে জানতো? হেমন্ত-সুন্দরী ফুল। তবে আমার যে খুব একটা আগ্রহ আছে তা যেন। ভেব না। ইংল্যান্ডে অক্টোবর মাসে সব ফুল ঝরে যাওয়া দরকার। আমার একটি বন্ধু অর্কিডে ব্যাঙের ছাতা নিয়ে গবেষণা করছে। আমি তার কাছ থেকেই জোগাড় করেছি।
মানুষের কতরকমের খেয়াল যে থাকে এটা তারই নিদর্শন। অবশ্য এই অর্কিডের ব্যাঙের ছাতা কোন ক্ষতি করে না। বরং উল্টে অর্কিড খেয়ে ফেলে। বোঝ এবার কাণ্ডটা। আবার তেমনি হাসি। অবশ্য আমি তা আশা করছি না এসব ব্যাপারে তোমার কোন উৎসাহ আছে। এবারে শোনা যাক কিসব গণ্ডগোল তুমি বাধিয়ে বসে আছ। শোনা গেছে। তুমি শীতের খেলায় বেশ চমৎকার মেতে উঠেছিলে।
বন্ড এবার হেসে ফেলল। তার বুক পকেট থেকে ভাঁজ করা কাগজগুলি এবার বের করল। স্যার, এখানে শীতে যে খেলা করা হয়েছে তার কিছু বর্ণনা আছে। আপাততঃ একটা রিপোর্ট তৈরি করেছি তাড়াতাড়ি। হাতে আমার সময় বেশি ছিল না। M হাত বাড়িয়ে পিন দিয়ে আটকানো কাগজগুলি নিলেন। চশমাটা তার নাকের উপর দিয়ে কাগজগুলি পড়তে লাগলেন। জানালায় হাল্কায় বৃষ্টির শব্দ শোনা গেল, বন্ড দেওয়ালে টাঙানো ছবিগুলি দেখতে লাগল, পাহাড়, সমুদ্র আর জাহাজের ছবি। হঠাৎ তার ব্লোফেন্ডের কথা মনে পড়ল। কার গুপ্ত সাহায্যে তার এত শক্তি হয়ে গেছে তা বোঝা গেল না। রুশ? চীন? না কি সে নিজেই বসেছে রাজত্ব হাঁকিয়ে–যেমন করেছিল, অপারেশন থান্ডারবল -এর সময়।
ব্লোফেন্ডের আসল উদ্দেশ্য কি হতে পারে? গত সপ্তাহে তার পাঁচ ছ টা লোক মরে গেছে। কি এমন গভীর রহস্য আছে যা রক্ষা করার জন্য বিশ্বস্ত অনুচর প্রাণ হারাল। আমার সব রিপোর্ট পড়ে M কি কিছু যোগাযোগ বের করতে পারবেন? বিকেলে আসছেন কয়েকজন দক্ষ লোক। তারা কি পারবেন, এই সব রহস্য উদ্ধার করতে।
বন্ড তার ঘড়ি দেখবার জন্য হাত তুলল। কিন্তু কোথায় ঘড়ি? ঘড়িটা তার চলে গেছে। অবশ্য আর একটি ঘড়ির দাম তাকে দেওয়া হবে। তবে কি সে আর একটা রোলেক্স কিনবে? হয় তাই কিনবে? আত্মরক্ষার ব্যাপার তো।
কাগজগুলি সব টেবিলের উপর রাখলেন। M। তার পাইপের আগুন বেশ অনেকক্ষণ আগে নিভে গেছে। তিনি তখন আস্তে আস্তে আবার পাইপটা ধরিয়ে নিলেন। টেবিলের ওপর হাত রেখে তিনি অনভ্যস্ত নরম সুরে বললেন, জেমস্ তোমার অনেক ভাগ্য, ওখান থেকে বেরিয়ে আসতে পেরেছ। আমি এটা জানতাম তুমি কী করতে পার।
স্যার আমি কোনরকমে দেহটাকে জোর করে সোজা রেখেছিলাম। দ্বিতীয়বার আর চেষ্টা করব না।
