কিন্তু কিসের এক উষ্ণ অনুভূতি–আর মনটা একদম পূর্ণ করে দিল। জেমস্ ও ট্রেসী বন্ড। কম্যান্ডার মিসেস বন্ড। সত্যি? কি অবাক কান্ড। কি অদ্ভুত যোগাযোগ।
তার কানে এল, অনুগ্রহ করে শুনবেন? ১১০ নং সুইস এয়ার ফ্লাইটের লন্ডন যাত্রীরা দু নম্বর গেটের কাছে জমায়েত হোন। গেটের কাছে চলে আসুন।
বন্ড তার সিগারেট নিভিয়ে দিল। শীঘ্র দরজার দিকে দৌড়ে গেল। তখনও সে তার ব্রেকফাস্ট শেষ করতে পারেনি, আর যেন জীবনের ছোট একটা অংশ পড়ে থাকল এই এয়ারপোর্টের রেস্তোরাঁয়।
.
বড়কর্তা M
বন্ড প্লেনে উঠে ঘুমিয়ে পড়ল।
আপনারা কোমরে বেল্ট বেঁধে ফেলুন। অনুগ্রহ করে সিগারেট নিভিয়ে দিন।
তার ঘুমটা ভেঙ্গে গেল।
কোমরে বেল্ট বাঁধতে বাঁধতে তার ট্রেসীর কথা মনে পড়ে গেল। চেলসির ফ্ল্যাটে তাদের দুজনের জায়গা হবে কি? ওপরের ঘরগুলি ভাড়া নেবার চেষ্টা করলে ভাল হয়।
ক্যারাভেল রানওয়ে স্পর্শ করল। আর তেমনি প্রচণ্ড শব্দ হল। ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে। তার কোন জিনিসপত্র নেই, তাই সোজা পাসপোর্ট অফিসে চলে যেতে পারে। আর সেখান থেকে সোজা তার ফ্ল্যাটে। হাস্যকর স্কী পোশাকটা ছাড়তে পারলে বেঁচে যাই। কি বিশ্রী ঘামের গন্ধ লাগছে। তার জন্য কি ওরা মনে করে একটা গাড়ি পাঠাবে?
এয়ারপোর্ট থেকে বেরিয়ে সে দেখল যে সত্যিই একটা গাড়ি তার জন্য অপেক্ষা করছে। ড্রাইভারের পাশে তার সেক্রেটারী মিস গুডনাইট বসে আছে।
বন্ড তখন এগিয়ে এসে বলল, মেরী এমন করে তোমাকে ক্রীসমাস কাটাতে হবে কে জানত? ভাল আছ তো?
মেরী গুডনাইট একটু হাসল, ঘাড় নাড়ল। বলল, হ্যাঁ, ভাল আছে।
এস, পেছনে চলে এস।
মেরী তখন পিছনে এসে বসল। বন্ড বসল তার পাশে।
মেরী তার দিকে তাকিয়ে বলল, ক্রীসমাসটা যে তোমারও ভাল কেটেছে তা তোমাকে দেখলে মনে হচ্ছে না। আমি দেখতে এসেছি তুমি ঠিক আছ কিনা। কিন্তু কি আর বলব, তোমার যা চেহারা হয়েছে। তোমার পকেটে কি একটাও চিরুনি ছিল না, আর দাড়িটা কামাওনি কেন? মনে হচ্ছে তুমি যেন একটা ডাকাত। তারপর নাকটা কুঁচকে, কতদিন গোসল করনি শুনি। ওরা তোমাকে এয়ারপোর্টে ঢুকতে দিল?
বন্ড হাসল, শীতের খেলা অত্যন্ত পরিশ্রমসাধ্য, বরফ বল নিয়ে খেলা আর বরফের ওপর পড়া। তবে একটা কথা বলতে পারি কাল রাতে এক ফ্যান্সী-ড্রেস পার্টিতে ছিলাম। বড়দিনের সন্ধ্যা উপলক্ষে। সারা রাত না ঘুমিয়ে কাটিয়েছি।
আর ঐ বিশ্রী জুতা পায়ে? তোমার কথা মোটেই বিশ্বাস হল না।
আর তা যদি না পার জাহান্নামে যাও। রাতে আমি স্কেটিং হলেই ছিলাম, থাক এখন ওসব গল্প। হঠাৎ এমন সম্মানীয় ব্যবহারের কারণ তো শোনা যাক।
M-এর নির্দেশ। তোমাকে এখুনি যেতে হবে হেড কোয়াটার্সে। তারপর ওর সাথে লাঞ্চ খেতে যেতে হবে কোয়ার্টার ডেকে। তারপর হবে কনফারেন্স, তুমি যে তিন জনের সাথে দেখা করতে চেয়েছ, তারাও থাকবেন। সব কিছু খুবই দরকারী।
তাই ভাবলাম আমারও তৈরি থাকা দরকার। তুমিও অনেকের ক্রীসমাস নষ্ট করে দিয়েছ। তাই আমারটাও আর বাদ যায় কেন? তা ছাড়া খেলাটাও তো বেশ জমে গেছে দেখছি। তাই তো গাড়ি নিয়ে ছুটে এলাম।
সত্যি খুবই ভাল মেয়ে তুমি। যা হোক আমাকে এখুনি একটা রিপোর্ট তৈরি করে ফেলতে হবে। ল্যাবরেটরীতে এখন কাউকে পাওয়া যাবে? দরকার আছে।
নিশ্চয় পাওয়া যাবে। M-এর হুকুম সব জায়গায় কিছু কিছু লোক থাকতেই হবে। আচ্ছা, জেমস্, সত্যি বল, তুমি কি কোন বিপদে পড়েছ?
কিছু আছে হয়ত ঝামেলা, রিপোর্ট লেখার সময় মোটামুটি তোমার একটা ধারণা হবে। গাড়ি এসে দাঁড়াল বন্ডের ফ্ল্যাটের সামনে। আমি আগে বাথরুমে ঢুকে ভাল করে গোসল করে ক্লান্তিটা দূর করি। তুমি ততক্ষণ কফির বন্দোবস্ত করে ফেল, লক্ষ্মী মেয়ে, কফির সাথে ভাল করে ব্র্যান্ডি মিশিয়ে দিতে বলবে মে-কে। কিন্তু প্লাম-পুডিং চলতে পারে। এখন মাত্র নটা বেজেছে। ডিউটি অফিসারকে ফোন করে বলে দাও সব কিছু ঠিক আছে। M-এর কথামত কাজ হবে। সাড়ে দশটার সময় আমি তার সাথে দেখা করব। তাহলে এখন এই অবধি থাক।
বন্ড গাড়ি থেকে নেমে পড়ল। ঢুকল তার ফ্ল্যাট বাড়িতে।
সাড়ে দশটার ঠিক কয়েক মিনিট পরে বন্ড যখন তার টেবিলে এসে বসল, তখন তাকে বেশ সুস্থ দেখাচ্ছে।
মেরী তার নোট-বইটা হাতে নিয়ে ঘরে ঢুকল। তাড়াতাড়ি বলল মেরী। কিন্তু ভাষায় কিছু ভুল থাকতে পারে হয়ত–M-ঠিক বুঝে নেবেন। ওপরে একটা হেডিং দাও–টপ সিক্রেট। M-এর, ২২শে ডিসেম্বর-এর উপদেশ অনুযায়ী আমি ১-৩০ মিনিটে জুরিখ সেন্ট্রাল এয়ারপোর্ট পৌঁছেছি। অপারেশন করানোর ব্যাপারে যোগাযোগ করলাম।
বন্ড বলতে থাকল, মাঝে মাঝে সে তাকিয়ে দেখছে তার সেক্রেটারীর দিকে। কখনো বা জানালার বাইরে। রিজেন্ট পার্কের গাছের ডাল দেখা যাচ্ছে। তার শেষ তিনটি দিনের কথা মনে পড়ে গেল। তার নিশ্বাসে যেন বরফের গন্ধ ভেসে আসছে। ব্লোফেল্ডের সেই গভীর সবুজ চশমার নিচে অদেখা চোখের দৃষ্টি। তারপর বরফের ওপর সেই প্রাণ হাতে নিয়ে দৌড়ান। ইঞ্জিনের সামনে বরফ কাটবার পাখায় কাটা মানুষের রক্ত। মনে তার ভেসে বেড়াচ্ছে–ক্রীসমাস সন্ধ্যার সেই নাচ, তারপর হঠাৎ করে ট্রেসীর দেখা পাওয়া গেল।
তার বর্ণনার সব কথাই বলল, শুধু বলল না ট্রেসীর কথা। মেরী তার নোট বই নিয়ে পাশের ঘরে চলে গেল। তার পরে শুধু টাইপরাইটারের খটখট শব্দ হতে থাকল। তার আবার ট্রেসীকে মনে পড়ল। রাতে সে তার ট্রেসীকে ফোন করবে। সে যেন লাইনের ওপার থেকে ট্রেসীর কথা শুনতে পাচ্ছে, শুনতে পাচ্ছে তার হাসি।
