বন্ড যতটা পারল সামনের দিকে ঝুঁকে দৌড় মারল। শরীরটাকে বাঁকাতে লাগল যাতে পেছনের লোকটি তাকে ধরতে না পারে। কিন্তু সঙ্গে গুলিও চলতে থাকল।
শেষ প্রান্ত চোখে পড়ল। সে তীর বেগে স্কী চালাচ্ছে। চারদিকে বেড়া মাঝখানে বেরোনোর জন্য একটা বড় ফাঁক দেখা গেল। তার পরেই রাস্তা পনট্রেসিয়া থেকে একেবারে সামাডেন পর্যন্ত।
আর একটা গুলি এসে গেল তার একেবারে পাশেই, বাতাসে কিছুটা বরফ উঠে এল। গুণে চলল বন্ড ছ টা গুলি, তার মানে লোকটার গুলি শেষ হয়ে গেল। কিন্তু তাতেই বা কি এসে যায়? হাতাহাতি করবার মত শক্তি তার দেহে আর নেই।
হঠাৎ আলো দেখা গেল আর তার সাথে ট্রেনের আওয়াজ। এক্সপ্রেস ট্রেন দৌড়ে যাচ্ছে। তার আগে সে কি রেল লাইনের উপর গিয়ে পৌঁছে যেতে পারবে? হয়ত তবে কিছুটা বিপদের হাত থেকে নিরাপদ হতে পারে।
কিন্তু সেটা কি সে পারবে?
বন্ড জোরে তার লাঠিতে চাপ দিল। স্পীড বাড়াতে লাগল। কেবিন থেকেও এর মধ্যে একটা লোক বের হয়ে গেছে। সে আবার গুলি ছুঁড়তে শুরু করল। বন্ড এঁকে বেঁকে তার ঘাড়ের কাছে গিয়ে একেবারে পড়ল পরে। স্কী লাঠিটা তার গায়ে একদম ঢুকিয়ে দিল। সরু সূচালো ডগা পোশাক ছিঁড়ে ঢুকে গেল ওর দেহের মধ্যে।
লোকটা চিৎকার করে কাৎ হয়ে সেই বরফের মধ্যে গিয়ে পড়ল। কয়েক গজ দূর থেকে লোকটা জোরে কি যেন বলে উঠল। রেল এসে পড়েছে ইঞ্জিন দেখা যাচ্ছে। বন্ড প্রায় একলাফ দিল। রেল লাইনটা কয়েক ফুট নিচে। ছিটকে পড়ল সে রেল লাইনের ওপারে, সঙ্গে সঙ্গে আর একটি ভয়ঙ্কর শব্দ তার কানে এল।
গাইড তাকে ধরতে এসে ট্রেনে কাটা পড়ল।
বন্ড তখনো দাঁড়াতে পারল না। সে এক মুঠো বরফ তুলে চোখে মুখে লাগাল। সোয়েটারের নিচে হাত দিয়ে পিঠে বরফ ঘষতে লাগল। ইঞ্জিন ড্রাইভার ব্রেক কষে তার গাড়ি থামিয়ে দিয়েছে। ইঞ্জিনের সামনে বরফ পরিষ্কার করার জন্য ধারাল ব্লেডের পাখা। পাখার ব্লেডগুলি রক্তে লাল হয়ে গেছে। কামরার জানালা খুলে সব লোক অবাক হয়ে তাকে দেখছে। কয়েকজন ট্রেন থেকেও নেমে পড়েছে।
বন্ড এবার দাঁড়াল। গা থেকে বরফ ঝেড়ে ফেলে দিল। সুইস ভাষায় নানা প্রশ্ন করছে তারা।
বন্ড কোন জবাব না দিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে লাগল। সামাডেন দুই মাইল বাকি আছে। আরও কিছু দূরে যেতে পারলেই সে আশ্রয় একটা পেয়ে যাবে। তার চারপাশে লোক দেখতে পাবে।
গ্রামের গীর্জা সে দেখতে পেল। খ্রিস্টমাস উপলক্ষে আলো দিয়ে সব সাজানো হয়েছে। গীর্জার বাঁ-দিকে বসতি চোখে পড়ল। তার এখন বাজনা শব্দ কানে এল। আর স্কেটিংয়ের শব্দ। খ্রিস্টমাস সন্ধ্যায় কেটিং বল নাচ। এই তার উপযুক্ত জায়গা। লোকজন, আনন্দ, হৈ-চৈ। এবার দেখতে হবে শিকারের খোঁজে। প্রেতাত্মা সংঘের গোয়েন্দা ও সুইস পুলিশ তার পিছনে লাগবে।
রাস্তার পাশে দেওয়ালে বরফ জমে আছে। বন্ড আর সামলাতে না পেরে সেই বরফ উপর গিয়ে পড়ে গেল। কি হচ্ছে–এই বলে নিজেকে সে ধিক্কার দিল। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাক। তবু নিজেকে একটু ভদ্রস্থ দেখাবে। এটা বড়দিনের সন্ধ্যে। ভুলে গেলে চলবে কেন? এই তো তুমি যাহোক আশ্রয় পেয়েছ। শুনতে পাচ্ছ একর্ডিয়ানের বাজনা।
সাবধানে লাঠিতে ভর দিয়ে সে সামনে এগোতে লাগল। হাত দিয়ে তার মাথার চুল ঠিক করে নিল। ঘামে ভিজা রুমালের ধার দিয়ে শার্টের কলারের নিচে ঢুকিয়ে দিল। অনেক গাড়ি সারি দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। কয়েক পা এগোতেই সামনে একটা সাইন বোর্ড দেখতে পেল। তিনটি ভাষায় লেখা আছে। খ্রিস্টমাস সন্ধ্যায় বিশাল বল-নাচ উৎসবে, যেমন ইচ্ছে সাজো, প্রবেশ মাসুল দু ফ্রা। বন্ধুদের নিয়ে এস। হুররে! দরজার পাশে তার স্কী লাঠিটা বরফে ঢুকিয়ে দিল। নিচু হয়ে স্কী খুলতে গিয়ে কাৎ হয়ে বরফে পড়ে গেল। তার একদম উঠতে ইচ্ছে হল না। যদি সে এই বরফের উপরেই কিছুক্ষণ চুপ করে থাকত বা ঘুমাতো, এই সাদা, নরম হাঁসের পালকের মত বরফের উপর কিন্তু উঠে তাকে বসতেই হল। আস্তে করে তার স্কী খুলে ফেলল। বন্ড ভিতরে দিকে গেল দরজাটা পার হয়ে। টিকিট টেবিলে যে লোক বসে আছে সে একবারে মাতাল। লোকটি তাকে জড়ানো গলায় বলল, ফ্রান্সি ড্রেস পড়তে হবে। এই নাও মুখোশ। একটি সাদা-কালো ডোরা কাটা মুখোশ এগিয়ে দিল। এক ফ্র। সে ভাল করে তাকানোর চেষ্টা করল। যাও, এবার তুমি ডাকু কিংবা গোয়েন্দা হয়ে যাও।
বন্ড এক ফ্রা দিয়ে মুখে মুখোশটা এটে নিল।
বড় হল-ঘর। চারিদের দেয়াল ঘেঁষা বসবার কাঠের বেঞ্চ। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ যে সে একটু বসতে পারবে। একটা খালি আসনে একবারে হুমড়ি খেয়ে বসে পড়ল।
সে বলল, দুঃখিত, এবারে ঠিক করে বসল।
তার পাশে স্কার্ট দুলিয়ে আর একটি মেয়েকে কি যেন বলল।
বলুক, তাতে বন্ডের কিছু এসে যায় না। এই রাত্রিতে তাকে নিশ্চয় ওরা তাড়িয়ে দেবে না। লাউডস্পীকারের ওয়া লজ্জ-এর সুরে বেজে যাচ্ছে। কেউই যেন উঁচু থেকে বলছে, সবাই শোন এই নাচ শেষ হল। মাঝে রাত হতে আর দশ মিনিট বাকি আছে। শেষ নাচ এটা।
চারদিকে আনন্দিত সব নারী-পুরুষের হর্ষ ধ্বনি শোনা গেল।
বন্ড ঝিমিয়ে পড়ল, সে দেওয়ালে হেলান দিয়ে ঘুমিয়ে পড়ল। মনে হল কেউ যেন ধাক্কা দিয়ে বলছে, অনুগ্রহ করে মাঝখানে চলে আসুন, সাহেব। এই শেষ, আর মিনিট এক বাকি আছে।
