.
রক্তাক্ত তুষার
সে বরফের উপরে গিয়ে ঠিক পড়ল।
এখানেও যথেষ্ট আলো আছে। চারিদিকে সব বিশ্রী ছায়া ঘুরছে, যে কোন ছায়াই হতে পারে বিপজ্জনক গিরিসংকট। সে পিছনদিকে তাকাল। এখানে গনভোলার শব্দ নেই। নিচে পাহাড়ে ওরা টেলিফোনে অনায়াসেই যোগাযোগ করতে পারে, কিন্তু গনডোলটা থামল কেন।
এর জবাবে সে দেখতে পেল সামনে নীল আলোর রেখা। কিন্তু বুলেটের কোন শব্দ তার কানে এল না। ওপর থেকে কেউ যেন গুলি ছুঁড়ছে। সে কি তবে আর কোন চূড়ার দিকে চলে যাচ্ছে? সে ঠিক বুঝতে পারল না। সে কি তবে কালো পতাকার দিকে চলে যাচ্ছে। হা, সৃষ্টিকর্তা, তাই তো? কিন্তু হিমপ্রবাহের জন্য এই রাস্তাটা তো বন্ধ আছে। তার তো আর সময় নেই। লাল পথের নিশানা বার করবার। লাল পতাকার পথটা আবার তারের পাশপাশি চলে। গেছে। তার আর ভাববার কোন সময় নেই। সে এই বিপজ্জনক কালো পথেই চলতে থাকল। এত খাড়া পথ দিয়ে সোজা যাওয়া ঠিক হবে না, বন্ড এঁকেবেঁকে চলতে লাগল। দূরে গাছের সারি দেখা যাচ্ছে। আবার শূন্যে তারা বেশ কয়েকটা রকেট ছুঁড়ল। যেন ক্রীসমাসের সন্ধ্যার উৎসব শুরু হয়ে গেছে। আলপস্ পাহাড়ে ঝড় উঠল, সে যা ভয় পেয়েছিল। সেই হিমানী, সম্প্রপাত, অ্যাভাল্যাশ। মনে হল তার পায়ের নিচে মাটি কাঁপছে। হয়ত এবারে বিরাট বরফের চাই ধ্বসে তার উপর পড়ে যাবে। যেন মনে হল একসঙ্গে একশ সুড়ঙ্গের মধ্যে এক্সপ্রেস ট্রেন ছুটে যাচ্ছে।
ওঃ সৃষ্টিকর্তা! এবারে সে কি করবে? কি করা নিয়ম? বন্ড গাছের সারি লক্ষ্য করে তার স্কী সেই দিকে চালাল, আরও জোরে আরও জোরে চল হতচ্ছাড়া। সামনে ঝড় ও হাওয়া তাকে দেওয়ালের মত করে বাধা দিচ্ছে। না, ঝড়ো বাতাস নয়, তাকে বাধা দিচ্ছে নিজের গতির বেগ। যেন মনে হল যে কোন মুহূর্তেই সে বরফের মধ্যে উল্টে পড়ে যাবে। পেছনে তাড়া করছে দৈত্যের মত ধ্বস। যেন মনে হচ্ছে গোটা পাহাড়টাই উঠে আসছে তার কাছে। আর গাছগুলির কাছে চলে গেলেই বা এমন কি সুবিধা পাওয়া যাবে? তবে জঙ্গলের মধ্যে যেতে পারলে তবু খানিকটা নিরাপদে থাকা যেত। বরফের বন্যার ধাক্কায় প্রথম একশ ফার গাছের চিহ্ন থাকব না পর্যন্ত, দেশলাইয়ের কাঠির মতই উড়ে যাবে।
গাছের সারি যেন তার দিকেই দৌড়ে আসছে। এমন গতি সামলে সে কি পারবে গাছের কোন ফাঁকে ঢুকে যেতে? বন্ড বেগ কমাতে নিজের প্রতি সে কৃতজ্ঞ হয়ে গেল। তাছাড়া মনে হচ্ছে আগের থেকে মাটির কাঁপুনিও বেড়ে যাচ্ছে। গাছ ভাঙ্গার শব্দটা এই প্রথম শুনতে পেল। একটা বড় ফাঁক-এর মধ্যে ঢুকে যেতে পারলে হত। গাছ অনবরত ভেঙ্গে পড়ছে। শব্দটা ক্রমেই এগিয়ে আসছে। সে থেমে গেল এক মুহূর্ত।
সাদা ঢেউয়ের ফেনাটা আর কতদূর আছে? এবারে কি করতে হবে? নিচু হয়ে পায়ের গোড়ালি দিয়ে চাপ দিয়ে ধরতে হবে শক্তভাবে। যদি বরফের নিচে ডুবে যায় বেরিয়ে আসা তাহলে সম্ভব হতে পারে। এই সময়ে যদি বলের মত গড়িয়ে না যাওয়া যায়। তবে কবর সত্যিই হয়ে যাবে।
আস্তে করে সে কোন গাছের ফাঁকে যেতে লাগল। দূরে আবার ফাঁকা জায়গা চোখে পড়ল। এবারে ঢালুটা তেমন মোটেই নয়। চলন্ত বরফের ঢেউ-এর উচ্চতা কত হতে পারে? পঞ্চাশ ফুটের মত হবে? একশ? উড়ন্ত তীরের বেগে ডান দিকে ঘুরে গেল। এই তার মনে হয় শেষ সুযোগ। ঐ দূরে গাছের সারির মধ্যে ঢুকে যেতে হবে। আসা করছি তুষার প্রবাহ অতগুলি গাছকে ভাঙ্গাতে পারবে না। পেছনের ঐ ছুটন্ত গর্জমান ধ্বংসের সামনে আত্মহত্যাই নামান্তর মাত্র।
বন্ড সেই বনভূমি পার হয়ে এল। দৌড়ে গেল সামনের দিকে। একটা ছোট গাছের সাথে স্কীর ধাক্কা লাগল। সে সবসুদ্ধ সঙ্গে নিয়ে উল্টে পড়ে গেল। তাকে উঠে দাঁড়াতেই হবে কিন্তু। তবে উঠে দাঁড়ানোর মত ক্ষমতা তার আর। নেই। প্রচণ্ড বাতাসের ঝাপ্টা এসে তার চোখে মুখে লাগতে লাগল। বরফে ঢেকে গেল তার সারা শরীর, আর তুষার। স্রোতও এসে পড়ল সামনে। পাগলের মত পায়ের নিচের মাটি কেঁপে উঠল। আর এক ভয়াবহ শব্দস্রোত কানে যেন তালা লাগিয়ে দিচ্ছে। তবে শব্দটা ক্রমেই কমে আসতে লাগল।
চোখ থেকে বরফ মুছে সে দাঁড়িয়ে পড়ল। তার শরীর দুলছে, কী ও আলগা হয়ে গেছে। গগলস হারিয়ে গেছে। সামনে তার কিছু দূরেই বরফের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। প্রায় ফুট কুড়ি উঁচু হবে। বন্ড যেখানে এতক্ষণ দাঁড়িয়েছিল সে। জায়গাটা আপাতত শান্ত আছে। সে জানে, ঐ বনভূমিই তাকে এ যাত্রা বাঁচিয়ে দিয়েছে। এইবার পকেট থেকে ছোট ফ্লাক্সটা বের করে আনল। এই সময় এর মত জরুরী আর কিছু হতে পারে না। এক চুমুক দিয়ে ফ্লাক্সটা শেষ করে। দূরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। সে বলে উঠল, হ্যাপি ক্রীসমাস।
বন্ড আবার চলতে থাকল। তার হাতে কোন সময় নেই। কেবল স্টেশনের বেড়া সে দেখতে পেল। তার পাশ দিয়ে তাকে বেরিয়ে যেতে হবে। আর গনডোল দেখা যাচ্ছে না। হয়ত ওরা শেষ পর্যন্ত এসে পৌঁছায়নি। কিন্তু তারের শব্দ তার কানে এসে লাগল। তবে কি গনভোলা আবার পিজ গ্লোরিয়ার দিকে ফিরে যাচ্ছে, ওরা ধরেই নিয়েছে তুষার প্রবাহে তার মৃত্যু হয়ে গেছে।
সামনেই কেবল স্টেশনের আলো চোখে পড়ছে। কিন্তু কোন মানুষের দেখা পাওয়া যাচ্ছে না। বন্ড এবার ধীর গতিতে সামনে এগোতে লাগল। নিঃশ্বাস তার স্বাভাবিক হয়ে আসছে। সে হঠাৎ গুলির শব্দে চমকে উঠল। কেউ তার ডান দিক থেকেই গুলি ছুঁড়ছে। আবার পিস্তল গর্জন করে উঠল। একটি লোক তীর বেগে স্কী করে তার দিকে এগিয়ে আসছে। নিশ্চয় কোন গাইড হবে।
