প্রহরীর ঘাড়টাই জুতসই মনে হল বন্ডের। জিলেট ব্লেড পকেটে সে রেখে ছিল। দু পা এগিয়ে সে হাত মুঠো করে। প্রচণ্ড ঘুসি মারল। মাথা ও ঘাড়ের মাঝখানে ঠিক মেরুদণ্ডের উপরে। টেবিলের সাথে লোকটার মুখটা লেগে গেল। একটা ভোতা শব্দ হল।
এবারে ঘুসিটা মারল একদম চোয়ালের উপর। মনে হল ওর মুখের হাড়ের মধ্যে তার ঘড়িটা বুঝি আটকে যাবে। প্রহরীর নিস্পন্দ দেহটা গড়িয়ে গালিচার উপর পড়ে গেল, সব স্থির ও নিঃশব্দ। শুধু চোখে যেন কয়েকটা পলক পড়ল আবার তা একেবারে দৃষ্টিহীন হয়ে গেল সেই চোখ।
বন্ড ঝুঁকে নাড়ি দেখে বুঝল তার হৃদস্পন্দন নেই। টেলিফোন শব্দ করে উঠল। বন্ড চট করে রিসিভার তুলে নিল।
আলেস ইন অর্ডং (সব ঠিক আছে তো)? বন্ডের কানে এল।
বন্ড রুমালটা মুখের উপর চেপে ধরে উত্তর দিল, য়্যা (হ্যা)।
আর শোন, দশ মিনিটের মধ্যে আমরা ইংরেজটাকে ধরতে আসছি। বুঝেছ?
ঠিক আছে।
জায়গা ছেড়ে যাবে না কেমন?
অবশ্যই।
লাইনের ওপারে রিসিভার রাখার শব্দে তার কপালে ঘাম দেখা দিল, সৃষ্টিকর্তাকে অশেষ ধন্যবাদ যে সে কথার জবাব ঠিকমত দেওয়া হয়েছে।
তাহলে দশ মিনিটের মধ্যেই ওরা তাকে ধরার জন্য আসছে।
টেবিলের উপর একগাদা চাবি আছে। বন্ড তুলে নিয়েই দরজার কাছে দৌড়ে গেল। কয়েকটা চাবির পর একটা ঢুকে গেল তালায়।
এক লাফ দিয়ে স্কী রুমে ঢুকে গেল, তার নির্দিষ্ট স্কী জোড়া নিয়ে বাইরের দরজার দিকে ছুটে গেল, প্রথম চাবিটা লাগাতেই দরজা খুলে গেল।
বাইরে বেরিয়ে আবার তালা দিয়ে দরজা বন্ধ করে দিল বন্ড। চাবিটা ছুঁড়ে দিল দূরে বরফের স্তূপের মধ্যে।
আকাশে চাঁদের নৌকা, চারদিক আলোতে ভরে গেছে। বরফের কুচি তাই চিকচিক করছে। যতদূর চোখ যায় মনে হচ্ছে হীরের আলো ঠিকরে পড়ছে।
কিন্তু তার দামী সময় নষ্ট হল বুটের স্কী জোড়া ঠিক করে বেঁধে নিতে। গোলমাল হলে বিপদ হবে। দাঁড়িয়ে পরীক্ষা করে নিল সে ঠিকমত বাঁধা হয়েছে কিনা। ঠাণ্ডায় তার হাত অবশ হয়ে আসছে, হাতে দস্তানা পরে নিল। লাঠিজোড়া হাতে তুলে নিয়ে আস্তে শরীরটাকে সামনে ঠেলে দিল, গগলস নামিয়ে দিল চোখের উপর।
জেমস বন্ড ভেসে চলেছে ঢালু বরফের সমুদ্রে। স্কীর অস্পষ্ট হিসি হিস শব্দ বরফে চাপ দিয়ে সে তার গতি আরও বাড়িয়ে দিল। সে জানে সামনের দরজার তালা খুলে বাইরে আসতে যেটুকু সময় লাগবে। তারপরেই ওরা তার পিছু নেবে। ওদের মধ্যে যে গাইড সব থেকে ওস্তাদ সে তাকে ঠিক ধরে নেবে যদি না সে তার গতি আরও বাড়িয়ে না নেয়।
প্রতিটি ক্ষণ, এমনকি প্রতিটি মুহূর্ত সে যত বেশি এগিয়ে যেতে পারবে ততটুকুই তার লাভ হবে। সামনে কেবল হেড দেখা যাচ্ছে। ওখান থেকে শুরু হয়ে গেছে গ্লোরিয়া রান। বন্ড সমানে এগিয়ে যেতে লাগল, এবার ঢাল শুরু হল। বন্ড নিচু হয়ে লাফ দিল। পা ফাঁক হলে চলবে না, তাহলে বিপদ হবে। সে পা দুটো জোড়া করতে চেষ্টা করল। হুমড়ি খেয়ে পড়লে চলবে না, ঠিক করে রাখতে হবে শরীরটাকে। সে ঠিক মত পড়ে গেল। দুরন্ত বেগে সে নিচের দিকে চলতে লাগল। তার আত্মবিশ্বাস প্রচুরভাবে ফিরে পেল। চোখের নিমেষে সাদা চাদর সরে যাচ্ছে মনে হল। সামনে একটা বাঁক দেখা দিল। তার মনে কোন ভয় আর নেই। গতির মধ্যে অনেক আনন্দ আছে। তার উপর হঠাৎ তার মনে পড়ে যেতে লাগল ঠিক মুহূর্তে স্কিইং-এর সূক্ষ্ম কৌশলগুলি যখন যেখানে দরকার লাগছে।
বাঁকটায় সে ঠিকমতই ঝাঁপ দিল। বাঁদিক ঘুরে আবার ডানদিকে ভেসে গেল সে। বুলেটের মতই তার গতি। সে নিচে নেমে যাচ্ছে, তার সামনে গভীর ঢাল, দূরে তিনটে পতাকা বাতাসে উড়ছে কালো, লাল এবং হলদে। সে পাহাড়ের প্রায় মাঝামাঝি এসে গেছে। অনেক উপরে সাদা সাদা রঙের তার দেখা যাচ্ছে। ক্রমান্বয়ে নিচের দিকে নেমে গেছে। দূরে গাছপালার মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেছে। বন্ডের মনে আছে এবারের পথটা খুব আঁকাবাকা। পতাকাগুলির কাছে এসে সে একটু থামল, গগলস্ সরিয়ে কোনদিকে যাবে সেটা ঠিক করে নিল।
সে নামতে শুরু করে দিল। স্পীড নেবার পূর্বেই সে পাহাড়ের চূড়া থেকে এক গভীর শব্দ শুনতে পেল। আর শূন্যে উঠে গেল একটা আলোর ঝলমল। ঝুলতে লাগল প্যারাসুটের মত চারিদিকে জলন্ত ম্যাগনেসিয়ামের সাদা আলো ছড়িয়ে পড়ছে। কোনদিকে কোন অন্ধকার আর রইল না। সবই স্পষ্ট ও প্রখরভাবে দেখা যাচ্ছে।
পরপর কয়েকটি সেইরকম শব্দ কানে এল। চারদিকে আরো তীব্র আলো এসে পড়ল। রাতের অন্ধকারে আর কিছুই লুকানো যাচ্ছে না।
আর ঠিক সময়ে মাথার উপর তার গুলি বাজতে থাকল। তারমানে তাকে ধরবার জন্য গনডোল পাঠাচ্ছে ওরা। যে বা যারা আসছে তারা কি শূন্য হাতে আসবে? বন্ড কিন্তু থামল না, এঁকেবেঁকে সমানে চলতে থাকল।
গনডোল কতজোরে নামবে ঘণ্টায় দশ, পনের, বিশ মাইল।
অবশ্যই পঁচিশ মাইলের বেশি হতে পারে না। সে হাঁটুতে ব্যথা অনুভব করল। সাধারণতঃ সবারই এই উপসর্গটি দেখা যায়। বাঁকাভাবে দৌড়ানো বন্ধ করে সোজাভাবে দৌড়াতে লাগল।
ম্যাগনেসিয়ামের আলোও নিচে নামতে থাকল, প্রায় তার মাথার উপরে এসে ঝুলছে। যতদূর মনে হল আরো দুটো বাঁক তাকে নামতেই হবে। প্রচণ্ড শব্দে তার দুই পাশে বরফে বিস্ফোরণ হল। গনডোল থেকে ওরা হাতবোমা ছুড়ছে।
এবারটা হয়ত তার গায়ে লাগতে পারে। যেমন ভাবা অমনি একটা বোমা তার সামনে এসে ফাটল। বিরাট শব্দে তার কানের পর্দা কেঁপে উঠল। বন্ড তার স্কি ও লাঠি নিয়ে সামনে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল। সে কোনরকমে দাঁড়িয়ে পড়ল, মুখ থেকে থুতুর সাথে বরফ পড়তে লাগল। সে এখন হাঁপাতে লাগল। বরফে লাঠি ঠেকিয়ে যাবার জন্য প্রস্তুত হল। এবার কাছে নয় তবু আবার বোমা ফাটল। অন্তত তার থেকে কুড়ি গজ দূরে। তারের লাইনের রাস্তাটা তাকে ছাড়তেই হবে। একটু এগিয়ে গেলে বাঁদিকে নিচু খাদ, বন্ড সোজা না গিয়ে সেই খাদে লাফ দিল।
