একটু এগিয়ে দেখল রিসেপশন রুমে সেখানেও কেউ নেই। তার পরেই স্কী রুম আর সেখানেই সে ঢুকে পড়ল। গোমড়া মুখে একটা লোক এক মনে কাজ করে যাচ্ছে। বন্ড একাই কথা বলতে শুরু করে দিল।–আবহাওয়া তুষার ঝড় ইত্যাদি। এমন দিনে ধাতুর তৈরি কী কি কাঠের তৈরি স্কী থেকে কি বেশি বিপদের নয়?
সাজানো আছে কীগুলি দেখতে লাগল সে, সবই প্রায় মেয়েদের। এতে কোন কাজ হবে। ঠিকমত তার বুটের সাথে বাধা যাবে না। হঠাৎ তার দেয়ালে নজর গেল। কয়েক জোড়া গাইডের স্কী সাজানো আছে। বন্ড তার চোখটা ছোট করে দেখতে লাগল কোন জোড়া তার পক্ষে জুতসই হবে। লাল v মার্কা স্কী-টাই মনে মনে ঠিক করে নিল। তারপর আপন মনে বকবক করতে করতে স্কী রুম থেকে বের হয়ে এল।
তারপর তার ঘরে এসে ঢুকল।
.
পাতালের পথে
এবার শুধু তার সময় কাটানো। শুধু অপেক্ষা করা। ক্যাম্পবেলকে সাবাড় করতে আর কত দেরি হতে পারে? কি বন্ড যেন একটু চমকে উঠল।
হঠাৎ প্রচণ্ড অত্যাচারে সুবিধা হবে না কিছু, অজ্ঞান হয়ে গেলে কে কথা বলবে? আস্তে আস্তে মারের মাত্রা বেড়ে যাবে। আর ক্যাম্পবেলও একদম কাঁচা লোক নয়। সে-ও থেকে থেকে অস্পষ্ট কথা বলতে থাকবে। সেগুলি ঠিক কিনা বুঝতে গিয়ে ওদের কিছুটা সময় লেগে যাবে। কিন্তু তা আর কতক্ষণ? ক্যাম্পবেল যদি কোন মিথ্যে বলে আবার তার উপর মার শুরু হয়ে যাবে বা আরো অন্য কোন অত্যাচার। তবে এইটুকু বিশ্বাস তার আছে, ক্যাম্পবেল অবশ্যই বুঝতে পারবে বন্ড কেন এখানে এসেছে। সে যে ক্যাম্পবেলকে চিনতে পারেনি এটাই তার প্রমাণ।
কিন্তু কতক্ষণ?
বৈদ্যুতিক শক, সুঁচের ফোঁড়, ছুরি দিয়ে গালের চামড়া ছিঁড়ে নেওয়া–এমনকি নানারকম অমানুষিক অত্যাচার সে কতক্ষণ সহ্য করতে পারবে?
ও সাথে করে কি বিশেষ বড়ি এনেছে। মনে প্রাণে বন্ড ভাবল তাই যেন হয়।
তবে এটাও ঠিক। বেশি সময় তার হাতে নেই। ওরা যে কোন সময়েই চলে আসতে পারে তার খোঁজে। তবে মনে হয় সন্ধ্যের আগে তো নয়ই। তার আগে স্যার হিলারীকে নিয়ে জবরদস্তি করলে মেয়েদের মনে চাঞ্চল্য দেখা দিতে পারে।
রাতেই তারা ওকে নিতে আসবে।
আর সকাল বেলায় খবর দেওয়া হবে যে রাতেই স্যার হিলারী কেবল গাড়িতে চলে গেছে। আর এর মধ্যে স্যার হিলারী শুয়ে আছে বরফের কবরে খাদের নিচে। হয়ত পঞ্চাশ বছর পরে তার দেহ খুঁজে পাবে কেউ। না, অতদিন পরে তাকে কেউ সনাক্ত করতে পারবে না।
টেবিল ছেড়ে বন্ড উঠে পড়ল। পঞ্চদশ শতাব্দীর ব্লিউভিলি বংশের পরিচয় লিখছিল। সে জানালাটা খুলে দিল। বরফ পড়া বন্ধ হয়ে গেছে। এখানে সেখানে আকাশ নীল দেখা যাচ্ছে। গ্লোরিয়া ঢালে এক ফুট বরফ জমে আছে। তবে ভালই হবে। তাকে এবার প্রস্তুত হতে হবে।
বাথরুমে গিয়ে সোয়েটারের নিচে থেকে দস্তানা জোড়া বের করে হাতে পরে নিল। সিস্টার্ন-এর পিছনে লুকিয়ে রাখল দস্তানা জোড়া।
এরপর?
পোশাকের কি হবে?
যে পোশাক তার কাছে আছে তা দিয়েই কোনরকমে কাজটা চালাতে হবে। প্রথমে কিছু মিনটি রক্ত জমানো ঠাণ্ডা সহ্য করে নিতে হবে। তারপরই ঘামতে শুরু করবে। মুখটা কি ঢাকার দরকার হবে। গরম গেঞ্জিটা মুখে জড়িয়ে নিলে মনে হয় ভাল হবে। দেখার জন্য দুটো ফুটো তৈরি করে নিতে হবে। কিন্তু ফুটো যদি সরে যায়? তবে তো সাংঘাতিক বিপদ হবে। সিল্কের বড় রুমালটা যদি বেঁধে নেওয়া যায় তবে কেমন হবে? হ্যাঁ, তাই সে করে নেবে। পাতলা রুমাল দেখতে অসুবিধা হবে না।
না, আর কিছু করার নেই। বাকিটা আমার ভাগ্যের উপর ছেড়ে দিতে হবে। বন্ড আবার তার টেবিলে গিয়ে বসল। ডিনারের আবহাওয়া মনে হল আরো খারাপ। বন্ড বেশি করে খাবার ও হুইস্কি দিয়ে পেট ভরে খেতে লাগল। সবার সঙ্গে সৌজন্যমূলক কথা বলল। রুবির পায়ে পা দিয়ে আস্তে করে ধাক্কা দিল, কাজের কথা বলে একটু সম্ভ্রান্ত চাল দেখিয়ে বেরিয়ে গেল।
তার ঘরে এসে পেন্সিলটা একটু সরু করে নিল। তারপর কাগজে সে লিখতে শুরু করে দিল। সাইমন দা ব্লিউভিলি, ১৫১০-১৫৬৭, অ্যালফেঁসে দ্য ব্লিউভিলি, ১৫৪৬–১৫৮০, ম্যারিয়েট দি এসকর্ট-এর সাথে বিবাহ, ১৫৭১। সন্তান জাঁ ফ্রাঁসোয়া পিয়ের। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ যে, খুব দ্রুত সে এইসব আজগুবি কাজ থেকে রেহাই পেয়ে যাবে।
নটা পনের, নটা তিরিশ, নটা পঁয়ত্রিশ। পেটের মধ্যে থেকে বেড়ালের রোয়ার মত এক উত্তেজনায় ফুলে ফুলে উঠছে। হাতের ঘাম চটচটে হয়ে গেছে। সে ট্রাউজার্সে নিজের হাতটা ঘষে নিল। বাথরুমে গিয়ে প্রয়োজন অনুযায়ী শব্দ করে ঘরে এল, আলো নিভিয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ল আর দশ মিনিটের মধ্যেই সে নাক ডাকাতে শুরু করে দিল।
আরো দশ মিনিট। তারপর সে আস্তে আস্তে উঠে পড়ল। বিছানা থেকে নেমে সে কোন শব্দ না করে তার স্কী পোশাকটা পরে নিল। গোসলের ঘর থেকে দস্তানা এনে হাতে পরে নিল। গগলস কপাল পর্যন্ত আটকে রাখল। সময় হলে চোখে নামিয়ে নেমে। নাকের উপর রুমালটা শক্ত করে বেঁধে নিল। ছোট ফ্লাস্কটা পকেটে পুরে নিল। বাঁ-হাতের আঙ্গুলের ফাঁকে জিলেট ব্লেড, ডান হাতের মুঠোর রোলেক্স হাতঘড়ি স্টিল ব্যান্ড, ঘড়িটা আঙ্গুলের উপরে।
এক মুহূর্তের জন্য সে ঘরের মাঝে দাঁড়াল। তার জিনিসগুলি ঠিকমত নেওয়া হয়েছে কিনা একবার ভেবে দেখল। সবই ঠিক নিয়েছে। সে প্রস্তুত হল। দরজার কাছে এসে নিচু হয়ে প্লাস্টিক লাগিয়ে দরজা খুলে ফেলল, প্রার্থনা করল টেলিভিশন চোখটা যেন এখন বন্ধ থাকে। সোয়া ইঞ্চি দরজা ফাঁক করে শব্দ শোনার চেষ্টা করল। কোন শব্দ শুনতে পেল না। আস্তে করে দরজা খুলে ঘরের বাইরে এল। রিসেপশন রুম থেকে আলো এসে বাইরে পড়েছে। এই আলোটা সারা রাতি জ্বালানো থাকে। বন্ড দেওয়ালে লেগে সামনের দিকে এগিয়ে গেল। রিসেপশন রুমের পাশেই একজন। প্রহরী বসে আছে। সে মুখ নিচু করে কাগজ পড়ছে।
