ট্রেনের দিকে তাকাতে তাকাতে সে ফার্স্টক্লাস কামরায় ঢুকল। হঠাৎ তার চাহনির অর্থ বন্ড বুঝতে পারল। বুঝতে পারল এ লোকটা নিশ্চয়ই তাদের গুপ্তচর দপ্তরের। M তাহলে তার সাহয্যের জন্য একজনকে পাঠিয়েছে। লোকটার অদ্ভুত চোখে সে খবরটাই ছিল। লোকটা শীঘ্রই তার সঙ্গে যোগাযোগ নিশ্চয়ই করবে।
M-এর ধরনটাই এ রকম। কোনরকম ঝুঁকি তিনি নিতে চান না।
.
আগন্তুক
যোগাযোগ সহজ করার জন্য বন্ড বেরিয়ে বাইরে করিডোরে গিয়ে দাঁড়াল। আজকের দিনের কথাগুলোর সাংকেতিক সে ভেবে নিল। সেগুলো কয়েকটা নির্দোষ কথা, প্রতিমাসের প্রথম তারিখে সেগুলো বদলানো হয়। এই সহজ কথাগুলো ইংরেজ গুপ্তচরেরা নিজেরা বলাবলি করে পরিচয় জানায়।
ট্রেনটা চলতে শুরু করল, করিডোরের শেষে যাতায়াতের দরজাটা সশব্দে বন্ধ হল। হঠাৎ জানালায় সেই লাল। সোনালি মুখটার ছায়া পড়ল।
ক্ষমা করবেন, একটা দেশলাই দিতে পারেন?
আমি লাইটার ব্যবহার করি বন্ড তার লাইটার বার করে লোকটাকে দিল।
দেশলাইয়ের চেয়ে অনেক ভাল।
যতক্ষণ না খারাপ হয়ে যায়।
বন্ড লোকটার মুখের দিকে তাকাল। কারণ সংকেত বিনিময় শেষ হয়েছে। লোকটার পুরু ঠোঁট সামান্য কুঁকড়ে উঠল আর তার ফ্যাকাশে নীল চোখ হল নিষ্প্রাণ। লোকটা তার বর্ষাতি খুলেছিল, তার পরনে লালচে-তামাটে রঙের টুইডের কোট, ফ্লানেলের ট্রাউজার, ফ্যাকাশে হলদে শার্ট এবং রয়াল আর্টিলারির গাঢ় নীল রঙের ওপর লাল ডোরা কাটা টাই। লোকটাই ডান হাত রেলিঙ ধরা, হাতের কড়ে আঙুলে সোনার একটা সিগনেট আংটি চকচক করছে। তার কোটের বুক পকেটে সিল্কের লাল রুমালের একটা কোণ। বাঁ হাতের কব্জিতে রূপার হাতঘড়ি।
লোকটা শক্তিশালী, প্রহরীর উপযোগী। M সবচেয়ে কাছাকাছি যাকে পেয়েছেন তাকেই পাঠিয়েছেন। তোমাকে দেখে খুশি হলাম। কি করে এলে?
একটা সিগন্যাল পেয়েছিলাম, M-এর কাছে থেকে গিয়েছিলাম ব্যাক্তিগতভাবে অনেক রাতে, হকচকিয়ে গেলাম ওল্ডম্যান।
উচ্চারণটা অদ্ভুত। অনেকদিন বিদেশে থেকে ক্রমাগত বিদেশী ভাষা বলতে বলতে উচ্চারণটা এ ধরনের হয়েছে। আর তাছাড়া কথাটার শেষে ঐ কদর্য ওল্ডম্যান কথাটা জুড়ে দেওয়া।
হকচকিয়ে যাবারই কথা। সিগন্যালে তোমাকে কি কি কথা বলা হয়েছিল?
তার স্বরের মধ্যে কোন কথা লুকোবার চেষ্টা রয়েছে। বন্ড আড়চোখে তাকাল। মুহূর্তের জন্য তার চোখে লাল একটা শিখা ঝলসে উঠল।
তুমি আসায় খুব খুশি হয়েছি। যাত্রার শুরুতে তিনজন রুশী আমাদের পিছু নিয়েছিল। তাদের ভাগানো গেছে। কিন্তু ট্রেনে হয়ত আরো নতুন লোক তাদের আছে নয়ত আসবে। এই মেয়েটাকে নিঝঞ্ঝাটে আমাকে লন্ডনে নিয়ে যেতে হবে। আজ রাতে একসঙ্গে থেকে আমরা পালা করে পাহারা দেব। শেষ রাতে আমি কোন ঝুঁকি নিতে চাই না। আমার নাম জেমস্ বন্ড। ডেভিড সমারসেট নামে চলেছি আর ঐ মেয়েটি ক্যারোলিন সমারসেট।
লোকটা ভিতরের পকেট থেকে পুরানো পরিচয়পত্র বার করল এবং বন্ডকে সে দিল। তাতে লেখা ও ক্যাপটেন নরম্যান ন্যাশ। বাঁ দিকে লেখা ও রয়েল অটোমোবাইল ক্লাব।
পকেটে রাখার সময় আঙুল বুলিয়ে বন্ড টের পেল কার্ডটা এনগ্রেভ করা। ধন্যবাদ, ন্যাশ। মিসেস্ সমারসেটের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই। তাকে উৎসাহিত করার জন্য বন্ড মৃদু হাসল। ন্যাশকে ভিতরে আসতে ইঙ্গিত করে বন্ড তার পেছনে দরজাটা বন্ধ করে দিল। তাতিয়ানার চোখে ফুটে উঠল বিস্ময়, এ হচ্ছে ক্যাপটেন ন্যাশ, নরম্যান ন্যাশ। আমাদের ওপর নজর রাখতে একে বলা হয়েছে।
হাউ-ডু ইউ-ডু। দ্বিধান্বিতভাবে হাত বাড়াল তাতিয়ানা। একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল সে। হাসলেন না। তাতিয়ানা অপ্রস্তুতভাবে মৃদু হাসল, বসবেন না?
ধন্যবাদ, একটা, ইয়ে, সিগারেট নেবেন? তাতিয়ানা একটা সিগারেট নিল। চক্ষের নিমেষে ন্যাশ লাইটার জ্বালল। বন্ড ভাবছিল লোকটাকে কি করে সাহায্য করা যায়। ন্যাশ সিগারেট আর লাইটারটা বাড়িয়ে দিল। আপনি নেবেন না, ওল্ডম্যান?
ধন্যবাদ, বলল বন্ড। একটা সিগারেট নিয়ে সে ধরাল। তাহলে গোয়েন্দা দপ্তরকে নানা আজব চিড়িয়াকে দিয়ে কাজ করাতে হচ্ছে। ট্রিয়েস্টে আধা-কূটনীতিক লোকটাকে নিশ্চয়ই ঘনঘন মেলামেশা করতে হয়। সেটা সে করে কি করে?
বন্ড বলল, তোমাকে খুব ফিট দেখাচ্ছে ন্যাশ। টেনিস খেল।
না সাঁতার।
ট্রিয়েস্টে অনেক দিন আছ?
প্রায় তিন বছর।
কাজের ধরনটা তো জানেন, ওল্ডম্যান।
বন্ড ভাবছে ন্যাশের এই ঘনঘন ওল্ডম্যান বলা কি করে থামানো যায়। কিন্তু কোন কিনারা পেল না। সবাই চুপচাপ।
ন্যাশ বুঝল তার কিছু বলা বা করার পালা এসেছে। পকেট থেকে খবরের কাগজের কাটিং বের করল। Corrice de la Sera সংবাদপত্রের প্রথম পৃষ্ঠা। বন্ডকে দিল, এটা দেখেছেন, ওল্ডম্যান লোকটার চোখ দুটো ঝলসেও নিভে গেল।
কালো-কালো মোটা হরফগুলো শুকায়নি। হেডলাইনগুলোয় যা লেখা, তর্জমা করলে দাঁড়ায় এই রকম :
ইস্তাম্বুলে সাংঘাতিক বিস্ফোরণ
সোভিয়েত অফিস ধ্বংস
বিশ্রী কাণ্ড, সে বলল, মনে হচ্ছে গ্যাসের পাইপটা ফেটেছিল। সুড়ঙ্গের চোর-কুঠরির সেই কুৎসিত চেহারার বোমাটাকে বন্ড দেখতে পেল। আর শুনেছিল পাহাড়ের ওপরকার স্ট্রিট অফ বু -এ বজ্র গম্ভীর একটা শব্দ। সেই ঠাণ্ডা ঘরে সবাই ছিল। ঘৃণায় চকচক করে উঠেছিল তাদের চোখ। প্রতিহিংসা, চোখের পানি ফেলার রাতটা পড়ে আছে। আর ইঁদুরগুলো? কত হাজার ইঁদুর সুড়ঙ্গটার মধ্যে মরেছে। তখন কটা বাজে। বিকেল চারটে। দৈনন্দিন মিটিং কি চলছিল? সেই ঘরে তিন জন মারা পড়েছে। বাকি অংশে মারা পড়েছে আরো অনেক লোক হয়ত তাতিয়ানার তারা বন্ধু, খবরটা তাতিয়ানাকে জানাবে না। ডার্কো কি দেখেছিলেন ভালহাল্লার কোন জানালা দিয়ে। (valhalla স্ক্যান্ডেনেভিয়ার পুরানে বর্ণিত নিহত বীরপুরুষদের আত্মার জন্য সুখ-প্রসাদ)। সেখানকার দেয়ালে প্রতিধ্বনিত করিমের বিজয়ের হাসি বন্ড যেন শুনতে পেল। করিম বহু লোককে নিয়ে গেল।
