করিডোরে শোনা গেল হাত-ঘণ্টা। ক্রমশ এগিয়ে আসতে লাগল। যাত্রীদের লাঞ্চে যাবার অনুরোধ করা হচ্ছে।
তাতিয়ানার দিকে তাকাল বন্ড। তাতিয়ানার মুখটা ফ্যাকাশে। অশিক্ষিত লোকটার হাত থেকে বাঁচাবার আকুল মিনতি ফুটে উঠেছে তার চোখে।
বন্ড বলল, লাঞ্চ খেতে যাওয়া যাক।
সঙ্গে-সঙ্গে উঠে পড়ল তাতিয়ানা।
ন্যাশ, তুমি লাঞ্চ খাবে না?
ক্যাপটেন ন্যাশও উঠে দাঁড়িয়েছিল, আমার খাওয়া হয়ে গেছে। থ্যাঙ্কস, ওল্ডম্যান। ট্রেনের এমাথা-ওমাথা ঘুরে একবার দেখতে চাই। কন্ডাক্টার কি যাকে বলে? আঙুল দিয়ে টাকা বাজাবার ভঙ্গি সে করল।
হ্যাঁ-হ্যাঁ, সব দিক দিয়ে সে সহযোগিতা করবে। বন্ড বলল। সেই ছোট ভারি ব্যাগটা নামিয়ে সে ন্যাশের জন্য দরজা খুলল, পরে আবার দেখা হবে।
ন্যাশ বলল, নিশ্চয়ই হবে, ওল্ডম্যান।
ন্যাশ চলে গেলে বন্ড রেস্তরা-কারে গিয়ে খাবার আর এক বোতল কিয়ান্তি ব্রোগ লিও মদের অর্ডার দিল। তাতিয়ানা প্রফুল্ল মনে খেতে শুরু করল। বউ বলল, মানুষটা খাপছাড়া গোছের। কিন্তু সে এসেছে বলে আমি খানিক। ঘুমিয়ে নেবার সুযোগ পাব।
তাতিয়ানা বলল, লোকটাকে আমার ভাল লাগেনি। লোকটা কুলতুর্নি নয়। ওর চোখ দুটো আমার বিশ্বাস হয়নি।
হেসে উঠল বস্তু, তোমার কাছে কেউই যথেষ্ট কুলতুর্নি নয়।
লোকটাকে আগে চিনতে না?
না। কিন্তু লোকটা আমাদের অফিসের।
লোকটার নাম কি বলে?
ন্যাশ। নরমান ন্যাশ।
তাতিয়ানা বানান করে বলল, N, A, s, H? এই বানান?
হ্যাঁ।
আশা করি রুশী ভাষায় কথাটার মানে জান। Nash মানে আমাদের। আমাদের গুপ্তচর দপ্তরে আমাদের লোককে Nash বলে আর শত্রুপক্ষের হলে Sovi বলে। Sovi মানে তাদের, এই লোকটা নিজের নাম Nash বলছে, ভাল নয়।
বাস্তবিক তানিয়া! লোককে পছন্দ না করলে তুমি কত অদ্ভুত যুক্তিই না বল। Nash একটা অতি সাধারণ ইংরেজি নাম। যে জন্য লোকটাকে আমাদের দরকার সেদিকে সে যথেষ্ট তাগড়া গোছের।
তানিয়ানা সুস্বাদু খাবার আর মদ খেতে খেতে বলল, খাবারগুলো সত্যিই অতি চমৎকার! রাশিয়া থেকে আসার পর আমার সব সময়ই খিদে। জেমস্ তুমি সাবধান না হলে আমি সারাদিন শুধু খাব আর ঘুমাব। খুব বেশি খেলে আমাকে তুমি পিটুনি দেবে তো?
নিশ্চয়ই তোমাকে পিটুনি দেব।
সলজ্জভাবে খুঁজে এল তাতিয়ানার চোখের পাতা। সে বলল, বিল চুকিয়ে দাও, বন্ড। আমার ভারি ঘুম পেয়েছে।
কিন্তু এক মিনিটের মধ্যে আমরা যে ভেনিসে পোঁচাচ্ছি। ভেনিস তুমি দেখতে চাও না?
ভেনিস তো শুধুই আর একটা স্টেশন। অন্য আর একদিন আমি ভেনিস দেখব। এখন চাই তুমি আমাকে ভালবাস। প্লিজ জেমস্, যা চাইছি আমাকে দাও। সময় খুবই কম।
তারপর আবার সেই ছোট্ট ঘর। আবার মেঝেতে জামা-কাপড়ের ছোট দুটি স্তূপ, বাঙ্কে দুটি শরীরের ফিসৃফিস, মন্থর অনুসন্ধানী হাত আর প্রেমের গ্রন্থী রচনা। ট্রেনটা যখন প্রতিধ্বনিময় ভেনিস স্টেশনে পৌঁছাল তখন শোনা গেল চরম আত্মসমর্পণের অস্ফুট ধ্বনি।
সেই ছোট্ট ঘরের বাইরের নানা হাঁকডাক, নানা পায়ের শব্দ ডুবে গেল ঘুমের মধ্যে।
এল পাদুকা। তারপর ভিসেজা। তারপর সূর্যাস্তের লাল আর সোনালি আভা। করিডোরে শোনা গেল সেই হাতঘণ্টার ঝন্ঝন্ শব্দ। তারা জেগে উঠল। পোশাক পরে বন্ড করিডোরের বাইরে এসে দেখল লম্বার্ডি প্লেনের ওপরকার মিলিয়ে-আসা গোলাপী আভা আর ভাবল তাতিয়ানার ভবিষ্যতের কথা।
অন্ধকারে জানালার কাঁচে বন্ডের মুখের ছায়ার পাশে ন্যাশের মুখের ছায়া পড়ল। গলা নামিয়ে সে বলল, শত্রুপক্ষের একটা লোককে চিনেছি মনে হচ্ছে, ওল্ডম্যান।
বন্ড জানে কিছু ঘটার থাকলে আজ রাতেই ঘটবে। তাই নিস্পৃহ গলায় বলল, লোকটা কে?
তার আসল নামটা জানি না। কিন্তু সে ট্রিয়েন্টে দুইবার এসেছিল। হয়ত আলবেনিয়ার ব্যাপারে সেখানকার রেসিডেন্ট ডিরেক্টর। এখন সে আমেরিকান পাসপোর্ট নিয়ে চলেছে। উইলবার ফ্রাঙ্গ। পরিচয় দিয়েছে ব্যাংকের মালিক বলে। তোমাদের ঠিক পাশের কামরায় ও ৯ নম্বর-এ।
বন্ড লোকটার মুখের ভাব বুঝতে চেষ্টা করল। লোকটাকে তুমি চিনতে পারায় খুব উপকার হল। আজকে রাতটা বেজায় ঝামেলা হতে পারে। এখন থেকে তুমি.আমাদের কাছেই থেকো। মেয়েটিকে একলা রাখা ঠিক হবে না।
আমারও তাই ধারণা, ওল্ডম্যান।
তারা ডিনার খেল। তাতিয়ানার পাশে বসে ন্যাশ একবারও প্লেট থেকে মুখ তোলেনি। একেবারে আনাড়ির মত তার হাবভাব। লবণের শিশিটা আনতে গিয়ে তার হাত লেগে তাতিয়ানা কিয়ান্তির গ্লাসটা উলটে গেল। বার বার ক্ষমা চেয়ে আরেকটা গ্লাস আনিয়ে ন্যাশ নিজে ভরে দিল।
কফি এল। এবার কিন্তু তাতিয়ানার হাতেই কফির পেয়ালাটা আনাড়ির মত উলটে গেল। তাতিয়ানার মুখ ফ্যাকাশে, ঘনঘন নিঃশ্বাস পড়ছে।
বন্ড প্রায় উঠে দাঁড়িয়ে তাতিয়ানা! কিন্তু লাফিয়ে ওঠে ক্যাপ্টেন, সমস্ত অবস্থাটার পুরো দায়িত্ব নিয়ে বলল, লেডির মাথা ঘুরে গেছে। আমি দেখছি। নিচু হয়ে এক হাতে জড়িয়ে সে তাতিয়ানাকে তুলল। আমি একে কামরায় নিয়ে যাচ্ছি। আপনি ব্যাগটা সামলান, বিলটা চুকিয়ে আসুন। আপনি না আসা পর্যন্ত আমি একে দেখছি।
আমি ঠিক আছি। তাতিয়ানা বলছে, কিন্তু তখন সে অজ্ঞান হয়ে পড়ছে। ভেব না জেমস, আমি শুয়ে পড়ছি। ন্যাশের কাঁধে তার মাথাটা এলিয়ে পড়ল। ন্যাশ অত্যন্ত দক্ষ ও নিপুণভাবে তাকে নিয়ে গেল রেস্তরা ঘরের বাইরে।
