নিচের দেহটা করিমের। একটা ছোরার হাতল তার গলার কাছ থেকে বেরিয়ে রয়েছে। মাথাটা নিচের দিকে। একটা হিংস্র, রুক্ষ, কুদ্ধভাবে ফুটে উঠেছে তার মুখে। থুতনি দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্তধারা।
তার ওপরে MGB-র সেই মোটা লোকটা হাত-পা ছড়িয়ে পড়ে, যার নাম বেজ। করিমের বাঁ হাত নির্মমভাবে। তার গলা জাপটে রয়েছে। কালসিটে পড়া একটা মুখ আর গোঁফের খানিকটা বন্ড দেখতে পেল। করিমের ডান হাত বেনজের পিঠে। সেই ডান হাতের মুঠোতে একটা ছোরার হাতল।
কল্পনায় সমস্ত দৃশ্যটা বন্ড দেখতে পেল। ডার্কো ঘুমুচ্ছিল। বেনজ দরজা খুলে নিঃশব্দে এসে বিদ্যুত গতিতে ছোরাটা বসিয়ে দিল তার গলার কাছে। সঙ্গে সঙ্গে হত্যাকারীকে জাপটে ধরে নিজের ছোরাটা করিম হত্যাকারীর পাঁজরের মধ্যে বিধিয়ে দিলেন।
আশ্চর্য এই মানুষটা। এখন তার দেহে প্রাণের কোন রকম স্পন্দনই নেই।
কি অদ্ভুত।
বন্ড ঘুরে দাঁড়াল। যে লোকটা তার জন্য প্রাণ দিল তার কাছ থেকে সরে এল সে।
.
বিপদ মুক্ত
বিকেল তিনটের আধ ঘণ্টা দেরি করে ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস ধীরে ধীরে বেলগ্রেডে পৌঁছল এই ট্রেনের অন্য অংশ বুলগারিয়া থেকে লৌহ যবনিকার মধ্য দিয়ে পৌঁছানো পর্যন্ত আট ঘণ্টা এখানে অপেক্ষা করতে হবে।
বাইরের ভীড় দেখতে দেখতে দরজায় ঢোকার জন্য বন্ড অপেক্ষা করতে লাগল। যার আসবার কথা সে করিমের লোক। ফারের কোট পরে দরজার পাশে বসে বন্ডকে দেখছিল।
জানালা দিয়ে তাতিয়ানা সবকিছুই দেখছিল লম্বা বেতের বাস্কেট ট্রেনে আনা, পুলিশ ফটোগ্রাফারদের ফ্ল্যাশ বান্ধের ঝলসানো আর বডের দীর্ঘ দেহ।
বন্ড তার কাছে বসে তার দিকে তাকিয়ে তীক্ষ্ণগলায় অনেক নিষ্ঠুর প্রশ্ন করেছিল। তাতিয়ানা ঘুরিয়ে ফিরিয়ে আগের কথাই বলছিল। জানতো এ ব্যাপারের সঙ্গে SMERSH জড়িত বললে সে চিরকালের মত বন্ডকে হারাবে।
এখন ভয়ে তার বুক কাঁপছে। সে জালে জড়িয়ে পড়েছে, মস্কোতে তাকে যে সব মিথ্যে বলা হয়েছে তার কি উদ্দেশ্য ভেবে তার ভয় হচ্ছে। আর সবচেয়ে বেশি ভয় তার চোখের মণি লোকটাকে হারাবার ভয়।
দরজায় টোকা পড়তে বন্ড গিয়ে সেটা খুলল। ঘরের মধ্যে হুড়মুড়িয়ে ঢুকল একটি শক্তসমর্থ চেহারা, করিমের মত নীল চোখ, মাথায় এলোমেলো সাদা চুল।
তাদের দুজনের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, আমার নাম স্টেফান ট্রেমপো। লোকে আমাকে টেম্পো বলে। কর্তা কোথায়?
বন্ড বলল, বসো। বুঝল এ ডার্কোর ছেলে। সন্তর্পণে বসাল তাদের দুজনের মাঝখানে। হঠাৎ তার চোখে ফুটে উঠল ভয় আর সন্দেহ। ডান হাতটা কোটের পকেটে ঢোকাল।
বন্ডের কথা শেষ হলে লোকটা উঠে দাঁড়াল। কোন প্রশ্ন করল না। শুধু বলল, ধন্যবাদ স্যার। দয়া করে আসুন। আমার ফ্ল্যাটে চলুন। সামনে অনেক কাজ। করিডোরে বেরিয়ে লোকটা রেল-লাইনের দিকে তাকিয়ে রইল। তাতিয়ানা বেরিয়ে এল করিডোর দিয়ে সে নামল। তার দিকে তাকাল না। ভারি ব্যাগ আর নিজের ছোট এ্যাটাচিকেসটা নিয়ে তাতিয়ানার পেছন পেছন বন্ড এল।
প্ল্যাটফর্মের মধ্যে দিয়ে তারা বেরুল স্টেশনের চকে। ঝিরঝির করে তখন বৃষ্টি পড়তে শুরু করেছে। কতগুলো। ঝড়ঝড়ে ট্যাক্সি আর আধুনিক ধাচের একঘেয়ে বাড়ি। দেখলেই মন দমে যায়। লোকটা একটা জরাজীর্ণ মরিস অক্সফোর্ড সেলুন গাড়ির দরজা খুলল। তারপর সামনের সিটে বসে ধরল গাড়ি চালানোর হুইলটা। মিনিট পনের পরে। চওড়া ফাঁকা পথ দিয়ে এসে একটা পাথর-বাঁধানো গলিতে ঢুকে তারা থামল।
টেম্পো তাদের নিয়ে এল ফ্ল্যাটবাড়ির মধ্যে। দোতলায় উঠে সে একটা দরজা খুলল। সেটা দু কামরার ফ্ল্যাট। ফার্নিচার বিশেষ কিছু নেই। জানলার লাল পর্দাগুলো টানা। ছোট একটা টেবিলে কয়েকটা ছিপি-আঁটা মদের বোতল, গ্লাস আর প্লেট-ভরা ফল আর বিস্কুট।
পানীয় বোতলগুলোর দিকে হাত দেখিয়ে টেম্পো বলল, স্যার আর ম্যাডাম, দয়া করে জিরিয়ে নিন। পাশেই বাথরুম। নিশ্চয়ই আপনারা গোসল করতে চান। দয়া করে ক্ষমা করবেন–আমাকে কয়েকটা টেলিফোন করতে হবে। লোকটার কঠোর মুখ কান্নায় ভেঙে পড়ার উপক্রম হল। লোকটা তাড়াতাড়ি শোবার ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করল।
তারপর ঘণ্টা দুই চুপচাপ। বন্ড মাঝেমাঝে পায়চারি করতে লাগল মাঝেমাঝে জানলার বাইরে বসে তাকাতে লাগল। প্রথম এক ঘণ্টা তাতিয়ানা পড়বার ভান করল, রাশিরাশি পত্রিকাগুলোর পাতা ওলটাতে-লাগল। তারপর হঠাৎ সে চলে গেল বাথরুমের মধ্যে। পান পড়ার শব্দ শুনতে পেল বন্ড।
ছ টা নাগাদ শোবার ঘর থেকে বেরিয়ে এল টেম্পো। বন্ডকে বলল সে বেরুচ্ছে। রান্নাঘরে খাবার আছে। ন-টায় এসে আপনাদের ট্রেনে পৌঁছে দেব। ধরে নেবেন এই ফ্ল্যাটটা আপনাদেরই। বন্ডের উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে ধীরে ধীরে দরজা বন্ধ করে সে বেরিয়ে গেল। বন্ড তার মরিস গাড়ির সেলফ স্টার্টারের শব্দ শুনতে পেল।
শোবার ঘরে গিয়ে বিছানায় বসে টেলিফোনের রিসিভার তুলে জার্মান ভাষায় সে চাইল, লং-ডিসট্যান্স এক্সচেঞ্জ।
আধ ঘন্টা পরে M-এর শান্ত স্বর সে শুনতে পেল।
ইউনির্ভাসাল এক্সপোর্টের ম্যানেজিং ডিরেক্টরকে একজন ট্রাভেলিং সেলস্ম্যান যে ভাবে কথা বলে, বন্ড সেইভাবে কথা বলতে লাগল। বললো তার পার্টনার ভারি অসুস্থ। নতুন আর কোন আদেশ আছে।
খুব অসুস্থ।
