বন্ড বলল, কিন্তু এই প্লটের উদ্দেশ্য কি? তারা কি লাভ করতে চায়। আমরা একটা চক্রান্তে জড়িয়ে পড়েছি। তাতিয়ানা হয়ত সেই চক্রান্তের সঙ্গে জড়িত। আমি জানি সে কিছু একটা লুকোচ্ছে। তাতিয়ানা বলেছে সে লন্ডনে পোঁছে আমাকে সব কিছু বলবে। সবকিছু মানে কি? শুধু বলেছে–তাকে যেন বিশ্বাস করি। বিপদের কিছু নেই।
করিমের চোখে কোনরকম উৎসাহ দেখা গেল না।
ঘাড় ঝাঁকিয়ে বন্ড বলল, স্বীকার করছি আমি তাতিয়ানার প্রেমে পড়েছি। কিন্তু, ডার্কো, আমি নেহাৎ একটা পাঠা নই। সব সময়েই রহস্যটার সমাধানের সূত্র খুঁজে চলেছি। তুমি তো জানো দু জন মানুষের মধ্যে যখন কোন প্রতিবন্ধক না থাকে তখন অনেক খবর জানা যায়। তোমাকে বলছি? আমাদের মধ্যে কোন প্রতিবন্ধক নেই। তাই বলছি তাতিয়ানা সত্যি কথা বলছে। অন্তত শতকরা নব্বই ভাগ। আমাকে ঠকালে সে নিজেকেও ঠকাচ্ছে। কিন্তু প্রশ্নটা হল– এসব ব্যাপারের আসল উদ্দ্যেশ্যটা কি?
ব্যাপারটা পুরোপুরি জানতে হলে তাদের শেষ পর্যন্ত খেলে যেতে হবে।
বন্ডের একগুয়ে দৃষ্টিতে হঠাৎ হো হো করে হেসে উঠলেন করিম, আমি হলে দোস্ত, মেশিন সমেত মেয়েটিকে নিয়ে সালোনিকা স্টেশনে চুপিসাড়ে নেমে পড়তাম। তারপর গাড়ি নিয়ে এথেন্সে পৌঁছে পরের প্লেনে লন্ডনে যেতাম। আমার কাছে এটা একটা গুরুতর দায়িত্ব। তুমি একজন জুয়াড়ি। M-ও তাই। তিনিও জুয়াড়ি না হলে এ কাজটার দায়িত্ব তোমাকে দিতেন না। তিনিও এই ধাঁধার উত্তরটা জানতে চান। তুমি ভাবছ সবকিছু তোমার অনুকূলে চলছে। কিন্তু শোন দোস্ত। এটা একটা বিলিয়ার্ড টেবিল। মসৃণ, সবুজ বিলিয়ার্ড টেবিল। তুমি সাদা বলটাকে নির্ভুলভাবে মেরেছ। সেটা শান্ত মসৃণ গতিতে এগোচ্ছে লাল বলটার দিকে। তোমার সাদা বলটা লাল বলটাকে ধাক্কা দেবে। আর লাল বলটা টুক করে পকেটে পড়বে। বিলিয়ার্ড টেবিলের এটাই আইন, বিলিয়ার্ড ঘরের এটাই কানুন। কিন্তু এই আইন কানুনের বাইরেও নানা ঘটনা ঘটে। ধর, একজন জেট পাইলট অজ্ঞান হয়ে গেছে, তার প্লেনটা সোজা পড়ছে বিলিয়ার্ড ঘরের ওপর। হয়ত সেই মুহূর্তে-ফাটতে চলেছে গ্যাসের মেন পাইপটা কিংবা সেখানে পড়ছে একটা বাজ। তা হলে যে সাদা বলটা লাল বলকে ফসকাতে পারত না, কিংবা সে লাল বলটার পকেটে না পড়ে কোন উপায় ছিল না– সেগুলোর কি হবে? সে রকম, যে আইন ট্রেনটা এগুচ্ছে, যে আইনের ছকে তুমি চলেছ তোমার গন্তব্য জায়গায়–এই খেলায় সেগুলোই একমাত্র আইন নয়।
কাঁধ ঝাঁকিয়ে করিম তার দীর্ঘ বক্তৃতা শেষ করলেন। তারপর কৈফিয়তের সুরে, এসব কথাগুলো নিশ্চয়ই তোমার জানা। তাতিয়ানাকে খেতে ডাক। কিন্তু অপ্রত্যাশিত নানা ঘটনার জন্য প্রস্তুত থেকো। নিজের কোটের মাঝখানে আঙুল দিয়ে তিনি একটা ক্রশ-চিহ্ন আঁকলেন। আমি আমার হার্টের ওপর ক্রসচিহ্ন আঁকি না। সেটা গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। কিন্তু আমার পেটে আমি ক্রশচিহ্ন আঁকি। পথে আমাদের দুজনের জন্যই রয়েছে অপ্রত্যাশিত ঘটনা। সেই জিপসি আমাদের হুশিয়ার থাকতে বলেছিল। আমিও এখন সেই কথাই বলছি। বিলিয়ার্ড ঘরের বাইরের পৃথিবী সম্বন্ধে আমাদের সতর্ক থাকতে হবে। নিজের নাকে টোকা দিয়ে বললেন, আমার নাকটাও সে কথা বলছে।
করিমের পেটের ভিতর থেকে একটা গুড়গুড় শব্দ হল। করিম ব্যগ্রভাবে বললেন, শুনলে, তো? এক্ষুনি গিয়ে আমাদের খেতে বসা দরকার।
বেস্যালোনিকি স্টেশনে ট্রেনটা যখন ঢুকছে তখন তাদের ডিনার শেষ হল। বন্ডের হাতে সেই ভারি ব্যাগটা ছিল। বিদায় নেবার আগে করিম সাবধান করে বললেন, একটু পরেই লোকেরা আমাদের জ্বালাতন করবে। রাত একটায় আমরা সীমান্তে পৌঁছব। গ্রীকরা গণ্ডগোল করে না। কিন্তু প্রথম শ্রেণীর যাত্রীদের যুগোস্লাভ ঘুম ভাঙাতে ভালবাসে। তাদের মধ্যে কিছু হোমরা-চোমরা আমার পরিচিত জ্বালাতন করলে আমাকে ডেকে পাঠিও। পরের গাড়ির দ্বিতীয় কামরায় আছি। কাল ১২ নম্বর কামরার গোন্ডবার্ডের বিছানাটা দখল করব।
ট্রেনটা ছুটল যুগোস্লাভিয়ার দিকে। বন্ড ঢুকতে লাগল। তাতিয়ানা আবার তার কোলে মাথা রেখে ঘুমুতে লাগল। ডার্কো নিশ্চয়ই সন্দেহ করছে আমি তাতিয়ানার প্রেমে পড়ে আসল কাজের কথা ভুলেই গেছি। ট্রেন থেকে নেমে অন্যপথে দেশে ফেরা অবশ্যই অনেক নিরাপদ। কিন্তু আমি সত্যই আরো তিনদিন তাতিয়ানার সঙ্গে কাটানোর লোভ। সামলাতে পারলাম না। তাছাড়া M-ও সিদ্ধান্ত নেবার দায়িত্ব আমার ওপর ছেড়ে দিয়েছেন। ডার্কের কথাই ঠিক। M ও ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত খতিয়ে দেখতে চান। সব ভালই চলেছে। তাই ঘাবড়াবার কি আছে?
গ্রীক সীমান্তে ইন্ডোমেনি স্টেশনে পৌঁছবার দশ মিনিট পরে দরজায় দ্রুত টোকা পড়ল। কোল থেকে মাথা নামিয়ে দরজায় কান দিয়ে বন্ড জিজ্ঞেস করল, কে
কন্ডাক্টার, মশিয়ে। একটা দুর্ঘটনা ঘটেছে–আপনার বন্ধু করিম বের।
দাঁড়ান, তীক্ষ্ণস্বরে বলল বন্ড। খাপের মধ্যে তার বেরেটা ভরে কোট পরে, সজোরে সে দরজা খুলল।
কি ব্যাপার?
করিডোরের আলোয় কন্ডাক্টরের মুখটা হলদে দেখা গেল। আসুন। করিডোর দিয়ে সে ছুটল ফার্স্টক্লাস কামরার দিকে।
দ্বিতীয় কামরার খোলা দরজার কাছে বহু কর্মচারির ভীড়। তাদের সরিয়ে কন্ডাক্টার বন্ডের যাবার পথ করে দিল। দরজাটা পৌঁছে বন্ড তাকাল। তার ডানদিকের দুটে সিটে দুটো দেহ। একটা ভীবৎস মৃত্যু-আলিঙ্গনে দুটো নিস্পন্দ যেন ফিল্মের পোজ দিয়েছে।
