বন্ড উঠে দরজায় তালা দিল। তিক্তস্বরে তাতিয়ানা বলল, তোমার বন্ধু কলুতুনি শিক্ষিত নয়। ঐভাবে তোমাদের রাণী সম্বন্ধে কথা বলা রাজদ্রোহের সামিল।
তার পাশে বসে ধৈর্য ধরে বন্ড বলল, তানিয়া! ও-মানুষটা অদ্ভুত মানুষ! খুব ভাল বন্ধু। আমার সামনে যা-খুশি বলতে পারে। আমার ওপর তার হিংসে হয়েছে। সে চায় তোমার মত একটি মেয়ে। তাই সে তোমাকে খেপায়। এটা এক ধাচের প্রেম নিবেদন করা। আসলে এটা তোমার প্রসংশা।
বড়-বড় নীল চোখ তুলে তার দিকে তাকিয়ে তাতিয়ানা বলল, তাই নাকি? কিন্তু নিজের পেট আর তোমাদের রাষ্ট্রের প্রধান সম্বন্ধে তার কথাগুলো ভারি বেমানান। তাতে তোমাদের রাণীর প্রতি অশ্রদ্ধা দেখান হয়। এ-ধরণের কথা বলা ভারি অসভ্যতা বলে মনে করা হয় রাশিয়াতে।
তখন তারা তর্ক করছিল, এমন সময় ঝাঁকানি দিয়ে ট্রেনটা থামল রোদে আগুন মাছি ভনভনে আলেপেপালিস স্টেশনে।
তারা একসঙ্গে লাঞ্চ খেল। সেই ভারি ব্যাগটা ছিল বন্ডের দুপায়ের মাঝখানে। তাতিয়ানার সঙ্গে চটপট ভাব জমিয়ে ফেললেন করিম। বেজু নামে MGB-র লোকটা রেস্তরাঁ-কারে এল না। তাকে প্লাটফর্মে দেখা গেল ফেরিওয়ালার কাছ থেকে স্যান্ডউইচ আর বিয়ার কিনতে। করিম প্রস্তাব করলেন লোকটাকে ব্রিজ খেলার জন্য আমন্ত্রণ করার। হঠাৎ নিজেকে ভারি ক্লান্ত মনে হল বন্ডের। তার মনে হল এই বিপদজ্জনক অবস্থায় তারা একটা পিকনিকে পরিণত করতে চলেছে। বন্ডের চুপচাপ ভাব তাতিয়ানা লক্ষ্য করল। উঠে পড়ে সে জানাল তার বিশ্রামের দরকার। সে আর বন্ড রেস্তরা কার থেকে বেরুবার সময় শুনল ব্র্যান্ডি আর সিগারেটের জন্য করিমকে দরাজ-গলায় অর্ডার দিতে।
কামরায় ফিরে এসে তাতিয়ানা দৃঢ় স্বরে বলল, এবার ঘুমবার পালা তোমার। জানালার খড়খড়িগুলো সে নামিয়ে দিল। দরজায় গোঁজ লাগিয়ে তাতিয়ানাকে বন্ড নিজের পিস্তলটা দিয়ে কার কোলে মাথা রেখে সঙ্গে সঙ্গে সে ঘুমিয়ে পড়ল।
তাতিয়ানা বন্ডের ঘুমভাঙার অপেক্ষায় ছিল। তখন গোধূলী, বস্তের ঘুম ভাঙলে তাতিয়ানা দুহাতে তার মুখটি ধরে ব্যগ্রস্বরে বলল, ডার্লিং, কতদিন এভাবে আমাদের সময় কাটবে?
অনেকদিন, বন্ড বলল।
কিন্তু ঠিক কতদিন?
ঘুমের ঘোর কাটিয়ে বন্ড তার দিকে তাকাল। ট্রেনে পরের তিনদিন কাটিয়ে লন্ডনে পৌঁছবার পর কি ঘটবে কে জানে? তাতিয়ানা শক্রর গুপ্তচর। তার এবং বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রশ্নকারীদের জেরার কাছে হৃদয়াবেগ একেবারে অবান্তর। সম্ভবত ডোভারে তাতিয়ানাকে নিয়ে যাওয়া হবে সেই খাঁচার মধ্যে–যেটা গিন্ড ফোর্ডের কাছে প্রহরীঘেরা একটা বেসরকারি বাড়ি। তার গলার স্বর রেকর্ড করার জন্য ঘরটার আগা-পাশ-তলায় থাকবে গোপন জালপাতা। একের পর এক সাদা পোশাকের দক্ষ কর্মচারিরা এসে তার পাশে বসে কথা বলবে। নিচের তলার ঘরে ঘুরবে রেকর্ডারটা। সেই রেকর্ডগুলোর প্রতিলিপিগুলো তন্নতন্ন করে যাচাই করা হবে। তার সমবেদনার জন্য হয়ত কোন রুশী মেয়ে থাকবে। তাতিয়ানাকে পালাবার নানা মতলব সে দেবে। সে সময় বন্ডকে তার কাছ থেকে সুচতুরভাবে সরিয়ে রাখা হবে যদি না প্রশ্নকারীরা মনে করে তাদের দুজনের মধ্যে হৃদয়াবেগের সম্পর্কটা কাজে লাগিয়ে বন্ড তার কাছ থেকে পারবে আরো নানা নতুন তথ্য আবিষ্কার করতে। তারপর কি হয়ত তার নাম পালটে কানাডাতে নতুন একটা জীবন শুরু করার সুবিধে দেওয়া হবে তাকে। গোপনীয় ফান্ড থেকে বছরে এক হাজার পাউন্ড তাকে দেবার হয়ত ব্যবস্থা হবে। তখন বন্ড থাকবে কোথায়? তাতিয়ানা তখন ইংরেজদের ঘৃণা করবে, তাকে কি তখন সে ভালবাসবে?
তাতিয়ানা আবার প্রশ্ন করল, কতদিন?–বল না বন্ড, কতদিন?
যতদিন সম্ভব ততদিন। সবটাই আমাদের ওপর নির্ভর করছে। আমার কাছ থেকে হয়ত তোমাকে সরিয়ে ফেলা হবে। এখনকার মত ভবিষ্যতে সবদিন হয়ত আমরা একসঙ্গে থাকতে পারব না। কয়েকদিনের মধ্যেই হয়ত আমাদের পৃথিবীর মুখোমুখী হতে হবে।
বন্ডের দিকে তাকিয়ে তাতিয়ানা হাসল। তোমার কথাই ঠিক। বোকার মত আর কোন প্রশ্ন করব না। এই কটা দিন মিছিমিছি অপচয় করব না আমরা। কি বল?
ঘণ্টাখানেক পরে বন্ড যখন করিডোরে দাঁড়িয়ে, হঠাৎ করিম তার পাশে বন্ডকে বললেন, অতক্ষণ ধরে তোমার ঘুমানো উচিত হয়নি। উত্তর গ্রীসের ঐতিহাসিক প্রাকৃতিক দৃশ্য তোমার চোখ এড়িয়ে যাচ্ছে। এখন খাওয়ার সময় হয়েছে।
তোমার শুধু খাওয়ার চিন্তা। আমাদের সেই দোস্তের খবর কি?
লোকটা কামরা থেকে বেরোয়নি। আমার হয়ে তার ওপর কন্ডাক্টার নজর রেখেছে। ওয়াগন-লিট কোম্পানিতে এই কন্ডাক্টার সবচেয়ে ধনী হয়ে উঠবে। গোল্ডকার্বের কাগজপত্রের জন্য পাঁচশ ডলার দিয়েছি। যতদিন আমরা ট্রেনে আছি দৈনিক একশ ডলার করে সে পাবে। করিম হাসলেন, লোকটাকে বলেছি ভাল কাজের দরুন সে তুরস্কে একটা মেডেলও পেতে পারে। তার ধারণা আমরা এক চোরাকারবারীদের পিছু নিয়েছি। লোকটা তাই অবাক হয়নি বরং মোটা টাকা পেয়ে খুশি হয়েছে। এখন বল, তোমার ঐ রুশী রাজকন্যার কাছে থেকে নতুন কোন খবর পেয়েছ কিনা। এখনো আমি খুব একটা স্বস্তি পাচ্ছি না। ভয় পেয়েছে বলেই বন্ড হয়ত তার কামরা থেকে বেরুচ্ছে না। কিন্তু তবু, কি যেন।
করিম মাথা ঝাঁকালেন, রুশীরা দারুণ ভাল দাবা খেলোয়াড়। কোন একটা প্লট হাসিল করতে চাইলে–অদ্ভুত নিখুঁতভাবে সেটা তারা হাসিল করে থাকে। খেলার শুরুতে সুবিধে পাবার জন্যে নিজের খুঁটি প্রতিপক্ষকে তারা মারতে চায়। প্রতিটি চালের কথা তারা আগে থেকেই চুলচেরা হিসেব করে রাখে। আমার মনে হচ্ছে : তুমি আমি আর তাতিয়ানা একটা বিরাট দাবার ছকে কয়েকটা বোড়ে ছাড়া কিছুই নই। আমাদের এই খেলায় যে এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে তার কারণ ওরা যে খেলা খেলছে তার সঙ্গে আমাদের খেলাটা কোন বিরোধিতা করছে না।
