৯ এবং ১০ নম্বর কামরার দু জন বয়স্কা ফরাসি মহিলার পাসপোর্ট পরীক্ষা করার পর বন্ডের পাসপোর্টটা দেখেও দেখল না। ফরাসি ভাষায় প্রশ্ন করল, আপনি কি করিম বে-র সঙ্গে যাচ্ছেন?
হ্যাঁ।
ধন্যবাদ শিয়ে। আপনার যাত্রা শুভ হোক। সে স্যালুট করে জোরে জোরে টোকা দিল ৬ নম্বর কামরার দরজায়। দরজাটা খুললে সাদা পোশাকের লোকটি ভেতরে গেল।
মিনিট পাঁচেক পরে দরজাটা সশব্দে খুলে গেল। সেই সাদা পোশাকের অফিসারের চেহারা এখন কঠোর কর্তৃত্বের ছাপ। ইঙ্গিতে সে দুজন পুলিশকে ডাকল। তুর্কী ভাষায় কড়া গলায় কি সব বলল। হার গোল্ডকার্ব! আপনাকে এ্যারেস্ট করা হয়েছে। রাজ কর্মচারিকে ঘুষ দেবার চেষ্টা করা তুরস্কে গুরুত্বর অপরাধ বলে মনে করা হয়।
রাগতস্বরে গোল্ডকার্ব চেঁচাতে লাগল। তারপর রুশী ভাষায় সংক্ষিপ্ত এবং রূঢ় কথা শুনে সে চুপ করল। বেরিয়ে এল গোল্ডকার্ব। তার চোখ উন্মাদের মত। ১২ নম্বর কামরায় সে ঢুকল। একজন পুলিশ সেই কামরায় দরজার সামনে দাঁড়িয়ে রইল।
হের বেনজ। আপনার পাসপোর্ট ইত্যাদি দিন। এখানে আসুন আপনার ফটো মিলিয়ে দেখতে হবে।
বেনজ-এর গায়ে একটা উজ্জ্বল নীল রঙের ড্রেসিং গাউন। তার মাংসল মুখটা রাগে ফেকাশে হয়ে গেছে। সাদা পোশাকের কর্মচারি পাসপোর্টটা বন্ধ করে কন্ডাক্টরের হাতে দিল। হের বেন আপনার কাগজপত্র ঠিক আছে। এবার কিছু যদি মনে না করেন, আপনার মালপত্র পরীক্ষা করে দেখতে হবে। কামরায় সে এবং দ্বিতীয় পুলিশটি ঢুকল। বন্ডের দিকে পিঠ ফিরিয়ে বেনজু তার মালপত্র খানা তল্লাশ করতে লাগল।
লোকটার ড্রেসিং গাউনের নিচে বাঁ হাতের তলায় একটা ফোলা অংশ আর কোমরের জড়ানো পুরু একটা বেল্ট বন্ডের নজরে পড়ল। খানা তল্লাশ শেষ হল। সাদা পোশাকের লোকটা চলে গেল। MGB-র লোকটা ৬ নম্বর কামরায় ঢুকে সশব্দে দরজাটা বন্ধ করে দিল। একটা লোককে পার পেয়ে যেতে দেখে বন্ড ক্ষুণ্ণ হল। বন্ড জানালার দিকে মুখ ফেরাল। যে দরজাটায় POLIS লেখা, বন্ড দেখল একটা মোটাসোটা লোককে তার মধ্যে পুলিশ পাহারায় নিয়ে যেতে। লোকটার মাথায় হোমবুর্গ টুপি। ঘাড়ে একটা দগদগে ফোঁড়া। গোল্ডকার্ড ট্রেন থেকে নামল। তার সঙ্গে একজন পুলিশ।
ইঞ্জিন হুইস দিল। জানালা নামিয়ে শেষবারের মত বন্ড তুরস্ক সীমান্তের দিকে তাকাল, যেখানে একটা ঘরে দুজন লোক বসে আছে মৃতুদণ্ড মাথায় নিয়ে। দুটো চিড়িয়া খতম। সে ভাবল তিনটের মধ্যে দুটো।
ঠাণ্ডা, মিষ্টি সকালের বাতাস থেকে নিজের মাথাটা ভিতরে সরিয়ে এনে সশব্দে জানালাটা বন্ড তুলল। সমস্ত ব্যাপারটা শেষ পর্যন্ত তলিয়ে দেখবে।
.
গ্রীসের বাইরে
পিথিয়নের ছোট্ট বুফে থেকে গরম কফি এল (দুপুরের আগে এই ট্রেনে কোন রেস্তরা কার জোড়া হবে না)। তারপর গ্রীক কাস্টমস আর পাসপোর্টের কন্ট্রোল কর্মচারিরা এসে বিনা ঝামেলায় তাদের কর্তব্য শেষ করল। ট্রেনটা ছুটল দক্ষিণে গালফ অফ এনেজের দিকে। বাইরে প্রচুর আলো, বাতাসটা শুকনো। ছোট ছোট ক্ষেতে মানুষগুলোর চেহারা সুন্দর। সূর্যমুখী ফুল। ভুট্টা, আঙুর আর তামাক রোদে পেকে উঠছে। ডাকোর ভাষায় : নতুন একটা দিন। দরজায় টোকা দিয়ে করিম এলেন। ঝুঁকে তাতিয়ানাকে অভিবাদন করলেন। দরজার এক কোণে বসে তিনি বললেন, ভারি চমৎকার পারিবারিক দৃশ্য। এর চেয়ে সুন্দর গুপ্তচর দম্পতি খুব কমই দেখেছি।
তাতিয়ানা কটমটিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বলল, পাশ্চাত্য রসিকতায় আমি অভ্যস্ত নই।
করিম হো হো করে হেসে উঠলেন, ভেবো না, ধীরে ধীরে শিখবে। ইংল্যান্ডের লোকেরা রসিকতা করতে খুব ভালবাসে। সবকিছু সহজ হয়ে ওঠে। আজ সকালে প্রচুর হেসেছি। উজুনকোরুর বেচারা সেই লোকগুলো। আমার খুব ইচ্ছে হল ইস্তাম্বুলে জার্মান কনসুলেটকে পুলিশ যখন টেলিফোন করবে তখন সেখানে হাজির থাকা। জাল পাসপোর্টের ওটাই মস্ত ঝামেলা। পাসপোর্ট জাল করা কঠিন নয়, কিন্তু জন্মের সার্টিফিকেট জাল করা প্রায় অসম্ভব। মিসেস্ সমারসেট, তোমার দু জন কমরেডের কর্মজীবন ভারি করুণভাবে শেষ হয়ে গেল বলে ভয় হচ্ছে।
টাই বাঁধতে বাঁধতে বন্ড প্রশ্ন করল, কি করে করলে?
টাকা আর প্রতিপত্তি। কন্ডাক্টারকে পাঁচশ ডলার ঘুষ। পুলিশকে নানা গুলপটি। আমাদের দোস্ত ঘুষ দিতে গিয়ে। খুব সুবিধে করে দিয়েছিল। দুঃখের বিষয় পাশের কামরার শয়তান বেনজকে জড়িয়ে ফেলা গেল না। পাসপোর্টের কারসাজি দু-বার করতে পারব না। অন্য কোন উপায়ে তাকে নিকেশ করতে হবে। যে লোকটার ঘাড়ে ফোঁড়া তাকে কব্জা করা কঠিন হয়নি। লোকটা জার্মান ভাষা জানে না। তাছাড়া বিনা টিকিটে ভ্রমণ মারাত্মক অপরাধ। দিনটা ভালই শুরু হয়েছে। প্রথম রাউন্ডে আমরা জিতেছি। কিন্তু আমাদের পাশের ঘরের দোস্ত এখন থেকে ভারি হুশিয়ার হবে। সে জানে কিসের জন্য তাকে প্রস্তুত থাকতে হবে। হয়ত সেটাই ভাল। সারাদিন তোমাদের দুজনকে এই কামরায় লুকিয়ে রাখা ভারি বিশ্রী ব্যাপার হত। এখন আমরা ঘুরে বেড়াতে পারব। পারিবারিক জহরতের ব্যাগটা সঙ্গে আনলে এমন কি আমরা এক সঙ্গে লাঞ্চ খেতেও পারি। শুধু আমাদের লক্ষ্য রাখতে হবে কোন স্টেশন থেকে লোকটা টেলিফোন করে কিনা। কিন্তু গ্রীক টেলিফোন এক্সচেঞ্জে সে খুব একটা সুবিধে করতে পারবে বলে মনে হয় না। যুগোশ্লাভিয়ায় না পৌঁছান পর্যন্ত সে হয়ত অপেক্ষা করবে, কিন্তু সেখানে আমার লোকজন আছে। দরকার হলে আমরা দল ভারি করতে পারব। যাত্রাটা ভারি ইন্টারেস্টিং হতে চলেছে। ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেসে সব সময়েই একটা উত্তেজনা থাকে। করিম দাঁড়িয়ে উঠে দরজা খুলে বললেন, আর থাকে রোমান্স। কামরার মধ্যে তাকিয়ে তিনি হাসলেন। লাঞ্চের সময় আমি তোমাদের ডাকব। তুর্কীদের চেয়েও গ্রীক খাবার খারাপ। কিন্তু আমার পেটটাও রাণীর জন্য সবকিছু করতে প্রস্তুত!
