করিডোর দিয়ে বিরাট মানুষটাকে অনায়াসে হেঁটে যেতে দেখে বন্ডের বলিষ্ঠ, প্রফুল্ল, পেশাদার গুপ্তচরের প্রতি অনুরাগে মন ভরে উঠল।
কন্ডাক্টারের কেবিনে করিম অদৃশ্য হলেন। বন্ড ৭ নম্বর কামরার দরজায় টোকা দিল।
.
তুরস্কের বাইরে
রাতের মধ্যে দিয়ে সগর্জনে ট্রেনটা ছুটে চলল। বাইরের দৃশ্য দেখতে দেখতে বন্ড জেগে থাকার চেষ্টা করল।
তাকে ঘুম পাড়াতে সবকিছুই যেন ষড়যন্ত্র করছে–ট্রেনের ছুটন্ত চাকা, মাঝে মাঝে হুইসেল সব শব্দের মধ্যেই সে যেন ঘুমপাড়ানি গান শুনছে। এমন কি দরজার ওপরকার গাঢ় বেগুনি রঙের বাতিটা বলছে যেন, আমি তোমাদের পাহারা দেব। তোমাদের কোন বিপদ হবে না। চোখ বুজে ঘুমোও ঘুমোও, ঘুমোও।
তার কোলে মেয়েটির মাথা উষ্ণ আর ভারি।
একমাত্র চাদরের তলায় কোন মতে শোবার জায়গা।
বন্ড একবার চোখ বুজে আবার তাকাল। করিডর ঘড়িটায় দেখল ভোর চারটে। তুরস্কের সীমান্তে পৌঁছতে আর মাত্র এক ঘণ্টা। দিনের বেলায় সে ঘুমোত পারবে। তাতিয়ানা পাহারা দেবে।
পাশ ফেরা ঘুমন্ত সুন্দর মুখটিকে ভারি নিষ্পাপ দেখাচ্ছে। ঠোঁট দুটি সামান্য ফাঁক, এক গোছা চুল ছাড়িয়ে পড়েছে কপালে, তার প্রতি মমতায় ভরে উঠল বন্ডের হৃদয়। হঠাৎ তার ইচ্ছে হল মেয়েটিকে গভীরভাবে আলিঙ্গন করতে। এইভাবে ঘুমুবে বলে তাতিয়ানা বলেছিল, আমাকে জড়িয়ে না ধরলে আমি ঘুমব না। আমি জেগে উঠে তোমাকে ছুঁতে না পারলে ভারি ভয় পাব। প্লিজ জেমস্, আপত্তি কর না।
কোট আর টাই খুলে নিজের সুটকেসের ওপর পা রেখে বিছানার এক কোণে বন্ড বসেছিল। হাতের নাগালের মধ্যে বালিশের তলায় রেখেছিল তার বেরেটা পিস্তলটা। গলায় সেই কালো ফিতেটা ছাড়া আর সব পোশাক খুলে আরাম করে সে শুয়েছিল। চুলের মুঠি ধরে মাথাটা নামিয়ে বন্ড তাকে চুমু খেয়েছিল তারপর তাকে ঘুমিয়ে পড়তে বলে।
এবার মনে থেকে তাতিয়ানার চিন্তা ছেড়ে বন্ড ভবিষ্যত যাত্রার কথা ভাবল।
কিছু পরেই তারা তুরস্ক থেকে বেরিয়ে যাবে। কিন্তু গ্রীস থেকে বেরুনো কি সহজ হবে। গ্রীসের সঙ্গে ইংল্যান্ডের সদ্ভাব নেই। আর যুগোস্লাভিয়া? টিটো কার পক্ষে? ঐ তিনজন MGB-র লোকেদের ওপর যে অর্ডারই থাকুক না কেন তারা জানবেই বন্ড আর তাতিয়ানা এই ট্রেনে রয়েছে। তা বলে চারদিন ধরে জানালার খড়খড়ি নামিয়ে এই কূপের মধ্যে থাকা সম্ভব নয়। আর সকালের মধ্যেই তারা জানতে পারবে স্পেক্টরটা খোয়া গেছে। তারপর কি হবে? এর সমস্ত ব্যাপারটাই যদি কোন রহস্যময় জটিল রুশী প্লটের একটা অংশ হয় তাহলে কি হবে? কোন ছোট স্টেশনে প্ল্যাটফর্মের উলটোদিকে চুপিচুপি ট্রেন থেকে সে আর তাতিয়ানা কি নেমে গাড়ি ভাড়া করে কোন মতে একটা প্লেন ধরে লন্ডনে পালাবে!
বাইরে ভোরের অস্পষ্ট আলো দেখা দিল। ভোর পাঁচটা, অল্পক্ষণের মধ্যেই তারা উজুনকোপরুতে পৌঁছবে। ট্রেনের পেছনের অংশে করিম কতটা সফল হলেন? সেই তিনজন MGB এজেন্টকে তাড়াতে না পারলে তারা ট্রেন থেকে নামবে না। না পারলে গ্রীসের কোন জায়গায় মেশিন সমেত মেয়েটিকে নামিয়ে অন্য পথে দেশে ফিরবে। সে আর করিম দক্ষ লোক। বেলগ্রেডে করিমের এক এজেন্ট আছে, ট্রেনে সে দেখা করতে আসবে। তা ছাড়া সাহায্যের জন্য তাদের এম্ব্যাসি তো আছেই।
বন্ড দ্রুত ভেবে চলল। সে টের পেল খেলাটা শেষ পর্যন্ত খেলবার আর আসল ব্যাপারটা জানবার একটা উন্মাদ আগ্রহ তার হয়েছে। M তার ওপর পুরো দায়িত্ব দিয়েছেন। মেয়ে আর মেশিনটা তো তার হাতের মুঠোয়। অতএব ঘাবড়াবার কি আছে। গাড়ির গতি মন্থর হল। এইবার প্রথম রাউন্ডের খেলা শুরু। করিম যদি বিফল হন…সেই তিনটে লোক যদি ট্রেনে থাকে…।
কতকগুলো মালগাড়ি পাশ দিয়ে চলে গেল। একটা ঝাঁকুনি, কাঁচক্যাচ শব্দ–ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস গ্রু লাইন ছেড়ে অন্য লাইনে এল। ট্রেনটা একটা খালি প্ল্যাটফর্মে থামল। ধীরে ধীরে তাতিয়ানার মাথাটা বালিশে নামিয়ে দরজা দিয়ে বেরুল বন্ড।
বন্ডের সামনে প্ল্যাটফর্মে একটা বন্ধ দরজা। তার ওপর লেখা ও POLIS, দরজার পাশের নোংরা জানালাটার ভেতর দিয়ে মুহূর্তের জন্য করিমের মাথা দেখা গেল।
সাদা পোশাকের একটা লোকের সঙ্গে দুজন পুলিশ করিডোরের মধ্যে এল। তাদের সামনে ওয়াগন লিটের কন্ডাক্টার। দরজায় দরজায় সে টোকা দিয়ে যাচ্ছিল।
১২ নম্বর কামরার সামনের কন্ডাক্টার তুর্কী ভাষায় রাগতভাবে কি যেন বলছিল। এক প্যাকেট তাসের মত হাতে তার এক গোছা টিকিট আর পাসপোের্ট। দরজায় সজোরে টোকা দিল। দরজাটা খুলল, এক পাশে সে সরে দাঁড়াল। তার পেছনে দাঁড়াল পুলিশ দুজন।
ধীরে ধীরে বন্ড করিডোের ধরে এগিয়ে গেল। শুনতে পেল ভাঙা ভাঙা গলায় কথাবার্তা। হার কুর্ট গোল্ডকার্বের পাসপোর্ট আর টিকিট হারিয়ে গেছে। হার কুর্ট গোল্ডকার্ব কি সেগুলো কন্ডাক্টরের কেবিন থেকে সরিয়েছেন? অবশ্যই। তাহলে ব্যাপারটা দুর্ভাগ্যজনক। একটা তদন্ত করা দরকার। ইস্তাম্বুলের জার্মান লিগেশন (German Legation) নিশ্চয়ই ব্যাপারটা ফয়সালা করে দেবে। ইতিমধ্যে দুঃখের সঙ্গে জানাতে হচ্ছে হার গোল্ডকার্ব আর যেতে পারবেন না।
MGB-র যে লোকটাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছিল তারই নাম গোল্ডকার্ব। লোকটা সেই কালচে চেহারার জুনিয়ার। ককেশিয়ান। চুলগুলো এলোমেলো পরনে শুধু পাজামা। সে দৌড়ে ৩ নম্বর কামরার সামনে গিয়ে দরজায় টোকা দিল। মুহূর্তের জন্য বন্ড একটা মাংসল নাক আর গোঁফের খানিকটা অংশ দেখল। চেনটা খুলে সড়াৎ করে কামরাটার মধ্যে সেঁধিয়ে গেল গোল্ডকার্ব।
