বন্ড বলল, তাতিয়ানা, কি ভাবছো জানি না। মনে হচ্ছে কোন দরকারি কথা তুমি আমার কাছে চেপে যাচ্ছ। আমি বিশ্বাস করি তুমি ভাবছ আমরা নিরাপদ। হয়ত তাই। হয়ত আকস্মিক যোগাযোগ ছাড়া আর কিছুই নয় তবু করিমের সঙ্গে আমার আলোচনা করতে হবে। তোমার চিন্তা নেই, তোমার দেখাশুনা আমরাই করব। কিন্তু এখন আমাদের খুব সাবধানে থাকতে হবে।
কামরার চারিদিকে তাকাল বন্ড। পাশের কূপের সঙ্গে যাতায়াতের দরজাটা সে টেনে দেখল। দরজাটা তালা বন্ধ। সে স্থির করল কন্ডাক্টার চলে গেলে দরজাটায় একটা গোজ দেবে আর বাইরে যাবার দরজায়ও গোজ দেবে আর সারা রাত তাকে জাগতে হবে। চাকার ওপর হানিমুন এভাবেই কাটাতে হবে। মৃদু হেসে বন্ড কন্ডাক্টারের জন্য ঘণ্টা বাজাল। বন্ড বলল, দুর্ভাবনা কোর না, তানিয়া। লোকটা চলে গেলে শুয়ে পড়। যতক্ষণ না জানতে পারবে আমি এসেছি ততক্ষণ দরজা খুল না। আজ রাতে আমি জেগে পাহারা দেব। কাল হয়তো অবস্থাটা সহজ হয়ে উঠবে।
কন্ডাক্টার দরজায় টোকা দিল। বন্ড তাকে ভেতরে আসতে দিয়ে করিডোরে বেরিয়ে গেল। ট্রেনটা রাতের অন্ধকারে জোরে ছুটছে, করিম বাইরে তাকিয়ে আছে। তাতিয়ানার সঙ্গে তার যা কথাবার্তা হয়েছে বন্ড করিমকে জানাল। মেয়েটিকে সে বিশ্বাস করে এবং তার চোখের ভাষা ও অনুভূতির কথা যখন করিমকে জানাচ্ছিল তখন জানালার কাঁচে করিমের মুখে জ্রিপভরা মৃদু হাসি সে লক্ষ্য করল।
হাল ছেড়ে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে করিম বললেন, জেমস্, এখন তুমিই কর্তা, সব দায়িত্ব তোমার। ট্রেনের বিপদ, ডিপ্লোমেটিক ব্যাগে মেশিনটা ইংল্যান্ডে পাঠাবার সম্ভাবনা, মেয়েটির সততা এসব নিয়ে আমরা চুল চেরা বিচার করেছি। মেয়েটি ও তুমি দুজনে দুজনার কাছে বিনা শর্তে আত্মসমর্পণ করেছ। আজ সকালে M-এর সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয়েছে। তিনি বলেছেন তোমার সিদ্ধান্তকে অনুমোদন করবেন। কিন্তু তিনি জানতেন না MGB-র তিনজন আমাদের সঙ্গে থাকবে ট্রেনে। জানলে হয়ত আমাদের সমস্ত ধারণা পালটে যেত। তাই না?
হ্যাঁ।
তাহলে একমাত্র করণীয় হচ্ছে এই তিনটে লোককে বিদেয় করা। ট্রেন থেকে তাদের তাড়ানো। যদি আকস্মিক যোগাযোগও হয় তবু আমাদের সঙ্গে তারা এই ট্রেনে যেতে পারবে না। ঠিক তো?
নিশ্চয়ই।
তা হলে অন্তত আজ রাতের জন্য সেটা আমার ওপর ছেড়ে দাও। এখনো এটা আমার এলাকা। এখানে আমার বেশ ক্ষমতা ও প্রচুর টাকা আছে। আমি তাদের খুন করব না, ট্রেনটা বেশ কিছুক্ষণের জন্য আটকে যাবে। তুমি ও মেয়েটি হয়ত জড়িয়ে পড়বে। কিন্তু আমি অন্য ব্যবস্থা করব। তাদের দুজনের স্লিপিং বার্থ আছে। সেই সিনিয়র লোকটা যার মুখে এক জোড়া গোঁফ আর ক্ষুদে পাইপ–সে আছে তোমাদের পাশে, ও নম্বরে। সে একটা জার্মান পাসপোর্ট নিয়ে চলেছে নাম মেলকিওর বেলজু, পেশা–সেলসম্যান। কালো চেহারার সেই আর্মেনিয়ানটা আছে ১২ নম্বরে। তারও জার্মান পাসপোর্ট-কুট গোলডফার্ব কনস্ট্রাকশন ইঞ্জিনিয়ার। প্যারিস পর্যন্ত তার গ্রু টিকিট। তাদের পাসপোর্ট আমি দেখেছি। আমার একটা পুলিশ কার্ড আছে। তৃতীয়টি যার ঘাড়ে ফোঁড়া ছিল–এখন দেখা যাচ্ছে তার মুখেও অনেক ফোঁড়া। বোকা, কুৎসিত চেহারা। তার পাসপোর্ট আমি দেখিনি। আমার পাশের ফার্স্টক্লাস কামরায় সে যাচ্ছে। টিকিটটা সে দিয়েছে। করিম ঝট করে টিকিটটা বার করে বন্ডকে একবার দেখিয়েই আবার পকেটে ভরে রাখলেন।
কি করে পেলে?
করিম মুখ টিপে হেসে বললেন, রাতে ঘুমোবার তোড়জোড় করার আগে পাঁঠাটা ল্যাভেটরিতে গিয়েছিল। করিডোরে আমি তখন দাঁড়িয়েছিলাম। হঠাৎ মনে পড়ল ছেলে বয়েসে কি করে আমরা ফাঁকি দিয়ে ট্রেনে বেড়াতাম। তাকে এক মিনিট সময় দিয়ে আমি দরজায় ধাক্কা দিই। হ্যান্ডেলটা জোরে চেপে থাকি। চেঁচিয়ে বলি, টিকিট কালেক্টর টিকিট প্লিজ। একবার ফরাসিতে, একবার জার্মানিতে বলি। দরজাটা এমন জোরে চেপে ধরি যাতে সে মনে করে দরজাটা আটকে গেছে। বিনীতভাবে আমি বলি, ঘাবড়াবেন না। মশিয়ে। দরজার তলা দিয়ে টিকিটটা ঠেলে দিন। ভেতর থেকে দরজার হ্যান্ডেল ধরে আরো খানেক চেষ্টা করে তারপর দরজার তলা দিয়ে টিকিটটা দিয়ে দেয়। আমি বিনীতভাবে বলি, Merei Mouseeur। টিকিটটা নিয়ে আমি পরের কামরায় চলে যাই। পাঁঠাটা এখন নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছ; ভেবেছে টিকিটটা সীমান্তে তাকে ফেরত দেওয়া হবে। তাকে ট্রেন থেকে নামিয়ে দেওয়া হবে। বলা হবে সমস্ত ঘটনাটা তদন্ত করা এবং টিকিট এজেন্সির সঙ্গে তার বক্তব্য যাচাই করা দরকার। তাকে পরের একটা ট্রেনে যেতে দেওয়া হবে।
বন্ড হেসে বলল, তুমি একটা চিজ, ডার্কো। কিন্তু অন্য দুজনের কি ব্যবস্থা করছ?
দৃঢ় আত্মপ্রত্যয়ের সুরে ডাকো করিম বললেন, কোন একটা ব্যবস্থা হবেই। বোকা বানিয়ে রুশীদের ধরতে হয়। তাদের অপ্রস্তুত কর। তাদের নিয়ে হাসাহাসি কর। এগুলো তারা বরদাস্ত করে না। তারপর ডিউটিতে বিফল হবার দরুন MGB তাদের শাস্তি দেবে।
এমন সময় কন্ডাক্টার ৭ নম্বর কামরা থেকে বেরিয়ে এল। প্রফুল্ল স্বরে করিম বলল, দুর্ভাবনা কর না। জেমস বান্ধবীর কাছে ফিরে যাও। কাল সকালে আবার দেখা হবে। আজ রাতে তো আমাদের বিশেষ ঘুম টুম হবে না। কিন্তু উপায় কি?
