প্রেমপূর্ণদৃষ্টিতে মেয়েটি তাকাল বন্ডের মুখের দিকে। মানুষটা কি ভাবছে ঐ শীতল স্থির ধূসর-নীল চোখ দুটির পিছনে কি ঘটে চলেছে, যে দুটি মাঝে মাঝে কোমল হয়ে ওঠে, মাঝে মাঝে ঝলসে ওঠে হীরের মত–গত রাতে তাতিয়ানার বাহুবন্ধনে তার কামনা বাসনা চরম পরিতৃপ্তি পাবার আগে যে রকম ঝলসে উঠেছিল। এখন সেই চোখে চিন্তার ছায়া। তাদের দুজনের জন্য সে কি দুর্ভাবনা করছে তাদের নিরাপত্তার জন্য দুর্ভাবনা? যদি তাতিয়ানা তাকে শুধু বলতে পারত ভয়ের কিছু নেই, যদি বলতে পারত সে তার ইংল্যান্ডে যাবার পাসপোর্ট মাত্র–সে আর এই ভারি কেসটা, রেসিডেন্ট ডিরেক্টর সেই সন্ধ্যেয় অফিসে যেটা তাকে দিয়েছিলেন। ডিরেক্টর একই কথা বলেছিলেন। হেসে বলেছিলেন, কর্পোরাল, এই নাও তোমার ইংল্যান্ডে যাবার পাসপোর্ট। ব্যাগের জিপটা খুলে তিনি বলেছিলেন, এই দেখ; ঝকঝকে নতুন একটা স্পেক্টর। যতদিন না অন্য প্রান্তে পৌঁছচ্ছে ততদিন কক্ষনো ব্যাগটা আর খুলবে না কিংবা এটাকে তোমার কম্পার্টমেন্টের বাইরে যেতে দেবে না। তা না হলে ঐ ইংরেজটা এটা নিয়ে তোমাকে আস্তাকুড়ে ফেলে দেবে। এই মেশিনটা ওরা চায়। দেখ, এটা যেন তোমার কাছ থেকে ওরা বাগিয়ে নিতে না পারে। তারা এটা হাতিয়ে নিতে পারলে জানবে–ডিউটিতে তুমি ফেল করছ, বুঝলে?
জানালার বাইরে গোধূলির নীলচে আলোয় একটা সিগন্যালবক্স দেখা গেল। উঠে পড়ে বন্ড জানালাটা নামিয়ে বাইরের অন্ধকারে মাথা বাড়াল। তার শরীরটা তাতিয়ানার খুব কাছে। হাঁটু দিয়ে বন্ডকে সে স্পর্শ করল।
হাত বাড়িয়ে তাতিয়ানা বন্ডের কোটের একটা পাশ ধরে টানল। জানালাটা তুলে দিয়ে ঘুরে দাঁড়াল বন্ড। তার দিকে তাকিয়ে তার চাহনির অর্থ বুঝতে পেরে বন্ড মৃদু হাসল। ঝুঁকে ফার কোটের ওপর দিয়ে তার বুকে হাত রেখে নির্মমভাবে ঠোঁট চুম্বন করল বন্ড। তাতিয়ানা পেছনে হেলান দিয়ে তাকে নিজের ওপর টেনে নিল।
দরজাটায় মৃদু দুটো টোকা পড়ল। বন্ড উঠে দাঁড়িয়ে রুমাল বার করে তার ঠোঁটের ওপরকার রুজের দাগ চটপট ঘষে মুছে ফেলল। তারপর বলল, নিশ্চয়ই আমার বন্ধু করিম। ওর সঙ্গে আমার কথা বলতে হবে। বিছানা পেতে দিতে কণ্ডাক্টারকে বলেছি। সে যতক্ষণ বিছানা না পাতে তুমি এখানে থাক। আমার ফিরতে দেরি হবে না। দরজার বাইরে থাকবে। ঝুঁকে তাতিয়ানার হাত স্পর্শ করে বন্ড তাকাল তার আয়ত চোখ আর আধ খোলা বিষণ্ণ ঠোঁটের দিকে। আমাদের জন্য গোটা রাতটা পড়ে আছে। প্রথমে দেখা দরকার তুমি নিরাপদে আছ কিনা? দরজার ছিটকিনি খুলে সে বেরিয়ে গেল।
ডার্কো করিমের বিরাট শরীরটা করিডোর জুড়ে ছিল তা পিতলের রেলিঙে ভর দিয়ে। সিগারেট টানতে-টানতে অন্যমনস্কভাবে তিনি তাকিয়েছিলেন সি অফ মারমারার (Sea of Marmara) দিকে।
উপকূল থেকে উত্তর দিকে ঘুরে দীর্ঘ ট্রেনটা সাপের মত যেতে শুরু করায় সমুদ্রটা ক্রমশ দূরে সরে যাচ্ছিল। তার পাশে গিয়ে বন্ড রেলিঙের উপর ঝুঁকল। অন্ধকার জানালায় বন্ডের মুখের ছায়ার দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় করিম বললেন, খবর ভাল নয়। ওদের দলের তিনজন এই ট্রেনে আছে।
তাই নাকি! বন্ডের শিরদাঁড়া দিয়ে যেন একটা ইলেকট্রিক শক্ বয়ে গেল।
সেই ঘরে যে তিনজন অপরিচিত লোককে দেখেছিলাম, এরা সেই তিনজন। স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে তোমার আর মেয়েটির পিছু নিয়েছে। ঘাড় ফিরিয়ে করিম তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে তাকালেন। এর থেকে মনে হয় মেয়েটি ডাবল (dou ble)–দুই বিরোধী ভূমিকায় অভিনয় করছে তাই না?
বন্ডের মনে কোন চাঞ্চল্য নেই। মেয়েটি তাহলে একটা টোপ। কিন্তু তবু, তবু– না, হতেই পারে না। অসম্ভব, অভিনয় হতেই পারে না। কিন্তু সাইফার মেশিনটা? এক মিনিট সবুর কর, বলে বন্ড দরজায় টোকা দিল। তাতিয়ানা দরজা খুলে বলল সে ভেবেছে কন্ডাক্টার এসেছে বিছানা পাততে। এক মুখ হেসে সে বলল, তোমার কাজের কথা হয়েছে? বসো তাতিয়ানা। তোমার সঙ্গে কথা আছে। তাতিয়ানা বসল, বন্ড পাশে দাঁড়িয়ে দেখল তার মুখে কোন। ভয়ের ছাপ নেই শুধু বিস্ময় আর নিরুত্তাপ ভাব। কঠিন স্বরে বন্ড বলল, শোন তাতিয়ানা। কয়েকটা ব্যাপার ঘটেছে। আমাকে ঐ ব্যাগটা খুলে দেখতে হবে মেশিনটা আছে কিনা।
নির্লিপ্তস্বরে সে বলল, নামিয়ে দেখ। সে ভাবল ডিরেক্টরের কথাই ঠিক ঘটতে চলেছে। মেশিনটা নিয়ে তারা হয়ত তাকে ট্রেন থেকে ফেলে দেবে।
বন্ড কেসটা খুলে দেখল, হ্যাঁ, ভিতরেই রয়েছে চকচকে কালো পালিশকরা ধাতুর একটা কেস। তাতে তিন সারি চাবি–অনেকটা টাইপ রাইটারের মত। বন্ড প্রশ্ন করল, এটাই কি স্পেক্টর মেশিন
তাতিয়ানা বলল, হ্যাঁ।
তাতিয়ানার পাশে বসে বন্ড মোলায়েম স্বরে বলল, ট্রেনে তিনজন MGB-র লোক আছে। সোমবার তারা তোমাদের সেন্টারে গিয়েছিল। একানে তারা কি করছে?
তাতিয়ানা দারুণ একটা আতংকভরে বলল, মেশিনটা পেয়ে গেছ। এখন তুমি আমাকে ট্রেন থেকে ঠেলে ফেলে দেবে নাতো?
নিশ্চয়ই না। কিন্তু আমাদের জানতেই হবে এই লোকগুলো কি করছে। এর মানে কি? তুমি জানতে লোকগুলো ট্রেনে থাকবে? বন্ড ভাবল সে কি মনে মনে কিছু লুকাচ্ছে নিশ্চয়ই, কিন্তু সেটা কি? তাতিয়ানা চোখের পানি মুছে বন্ডের দিকে এমনভাবে তাকাল যেন সে জোর করে কথাগুলো বিশ্বাস করাতে চায়। সে বলল, জেমস। আমি জানতাম না ঐ লোকগুলো ট্রেনে আছে। আজ তারা জার্মানিতে যাবে জানতাম। কিন্তু ভেবেছিলাম তারা প্লেনে যাবে। আমার দেশের লোকেদের নাগালের বাইরে যতদিন না ইংল্যান্ডে পৌচচ্ছি ততদিন তুমি আর কিছু জানতে চেয়েও না। আমাকে বিশ্বাস কর। তোমার জন্য মেশিনটা নিয়ে এসেছি। তুমি ভয় পেয়ো না ঐ লোকগুলো আমাদের কোন ক্ষতি করবে না। তাতিয়ানা ভাবল ক্লেব কি তাকে পুরো সত্যি কথা বলেছিল? যাতে সে ট্রেন থেকে না পালায় সেটা দেখার জন্যই নিশ্চয়ই লোকগুলো চলেছে প্রহরীর মত। পরে, লন্ডনে পৌঁছলে SMERSH-এর নাগাল থেকে বন্ড তাকে লুকিয়ে ফেলবে। তখন বন্ড যা জানতে চায় সে বলবে। মনে মনে ভাবল এখন ওদের কথা ফাঁস করে দিলে কি ঘটবে, সৃষ্টিকর্তা জানেন কি ঘটবে। বন্ড আর তাকে মেরে ফেলবে সে কথা তাতিয়ানা জানে।
