খাটের পাশে সরে এল বন্ড। হাতটা ধরে তাতিয়ানার চোখের দিকে তাকাল। মনে মনে সে বলল, হে সৃষ্টিকর্তা, আশা করি এর মধ্যে কোন ভুল নেই। আশা করি এই উন্মাদ প্ল্যানটা ভেস্তে যাবে না। এই আশ্চর্য মেয়েটি কি প্রতারক? সে কি সত্যি কথা বলছে তাতিয়ানা অন্য একটা হাত বাড়িয়ে বন্ডের গলা জড়িয়ে ধরে সজোরে তাকে টেনে আনল নিজের ওপর। বন্ডের ঠোঁটের স্পর্শ পেয়ে তার ঠোঁট দুটো কেঁপে উঠল। তারপর উত্তেজনায় থরথর করে উঠে তাকে এমনভাবে সে চুমু খেতে লাগল সেটা যেন শেষ হবার নয়।
বিছানার ওপর বন্ড নিজের পা দুটো তুলল। চুমু খেতে খেতে একটা হাত সে রাখল তাতিয়ানার বা স্তনের ওপর। বন্ড টের পেল অসহ্য কামনায় সেই স্তন কঠিন হয়ে উঠেছে। তাতিয়ানা মসৃণ পেটের ওপর দিয়ে বন্ডের হাত নামতে লাগল। অবসন্নভাবে কেঁপে উঠল তাতিয়ানার পা দুটো। মৃদুস্বরে সে কাতরে উঠল। বন্ডের ঠোঁট থেকে সরে গেল তার দুটো ঠোঁট। তার বোজা চোখের পাতা কাঁপতে লাগল। মৌমাছির ডানার মত।
চাদরের একটা কোণ ধরে টান মেরে সেই বিরাট বিছানার পায়ের দিকে বন্ড ছুঁড়ে ফেলল। গলায় সেই কালো ফিতে আর পায়ের কালো মোজা ছাড়া তাতিয়ানার পরনে কিছু ছিল না। অন্ধের মত তার হাত দুটো বন্ডকে খুঁজতে লাগল।
তাদের বিছানার ওপরে সোনালি ফ্রেমে বাঁধানো ভূয়ো আয়নাটার পিছনে SMERSH-এর দুজন ফটোগ্রাফার ঠাসাঠাসি করে বসে ছিল। খুপরি ঘরটার মধ্যে মধুচন্দ্রিমা যাপনের রাতে নব-দম্পতিকে দেখার জন্য কৃস্টাল প্যালেসের মালিকের বহু বন্ধু-বান্ধবরা সেখানে এর আগেও গাদাগাদি করে বসে থেকেছে। এই ফটোগ্রাফারদের কথা তাতিয়ানা বা বন্ডকেউই জানতে পারল না। তাদের সিনে ক্যামেরাগুলো অস্পষ্ট ঘর্ঘর শব্দ করে চলল।
.
ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস
বড়-বড় ট্রেনগুলো একে একে ইউরোপে যাচ্ছিল। ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস যায় সপ্তাহে মাত্র তিনবার, ১৪০০ মাইল ধরে, ইস্তাম্বুল থেকে প্যারিসে।
গাঢ় নীল রঙের কামরাটার পাশে ব্রোঞ্জের বড় বড় হরফে লেখা ছিল–দ্য গ্রান্ড ইউরোপিয়ান এক্সপ্রেস । সেই হরফগুলোর ওপরে সাদার ওপরে কালো। কালো অক্ষরে তিন লাইনে লেখা ছিল বিভিন্ন স্টেশনের নাম।
জেমস বন্ড এই নিয়ে দশ-বারো বার তার হাতঘড়িটার দিকে তাকাল। আটটা একান্ন। রুমাল বের করে বন্ড মুখ । মুছল। মেয়েটা কোথায়? ধরা পড়ল নাকি? নাকি ভয় পেয়ে পালিয়েছে। সেই বিরাট বিছানাটায় তার সঙ্গে সে কি খুব একটা নিষ্ঠুর কঠোর ধরনের ব্যবহার করেছিল?
আটটা বেজে পঞ্চান্ন। হঠাৎ দূরে বন্ড দেখতে পেল লাল একটা স্ফুলিঙ্গ। রঙ বদলে হয়ে গেল সবুজ।
স্টেশনমাস্টার কাছে এল। বাদামী ইউনিফর্ম-পরা wagonlit-এর কর্মচারি, বডের হাতে টোকা দিয়ে বলল কামরায় উঠে পড়তে। প্ল্যাটফর্মে আর কোন যাত্রী ছিল না। দীর্ঘকায় ইংরেজটির দিকে অসহিষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে কন্ডাক্টার ট্রেনে উঠল।
প্ল্যাটফর্মে তাড়াহুড়ো করে কাউকে আসতে দেখা গেল না। স্টেশনের ছাদের কাছে আলোকোজ্জ্বল বড় ঘড়ির মিনিটের কাঁটা সামনের দিকে এক ইঞ্চি লাফিয়ে গেল। বাজল নটা।
বন্ডের মাথার ওপরকার একটা জানালা ধুম করে নামল। প্রথমেই তার মনে হল জালের কালো ওড়নাটা বড় বেশি ফাঁক-ফাঁক করে বোনা। সেই ঢলঢলে মুখ আর উত্তেজিত নীল চোখ দুটি ঢাকবার এটা ভারি ছেলেমানুষি প্রচেষ্টা।
তাড়াতাড়ি উঠে পড়। ট্রেনটা চলতে শুরু করে দিয়েছিল। হ্যান্ডেল ধরে সিঁড়ির ওপর বন্ড লাফিয়ে উঠল। রেলকর্মচারি তখনো দরজা খুলে রেখেছিল। ধীরে-সুস্থে বন্ড ভিতরে ঢুকল।
রেল-কর্মচারি বলল, ম্যাডামের আসতে দেরি হয়েছে। করিডোের দিয়ে তিনি এসেছেন। নিশ্চয়ই শেষ কামরায় তিনি উঠেছিলেন।
কার্পেট মোড়া করিডোর দিয়ে মাঝখানকার কৃপেতে বন্ড পৌঁছাল। কামরার ধাতুর সাদা ফলকের ওপর দিকে কালো হরফে লেখা ৭; তার নিচে কালো হরফে লেখা ৮। দরজাটা খোলা। ভিতরে এসে বন্ড দরজাটা বন্ধ করে দিল। মেয়েটি তার ওড়না আর কালো স্ট্র-হ্যাটটা খুলে ফেলেছিল। বসেছিল এক কোণে, জানালার পাশে। তার ফারের লম্বা কোটটার বোতামগুলো খোলা। তার ভিতরে দেখা যাচ্ছিল বাদামী রঙের চীনে সিল্কের পোশাক, মধু রঙের নাইলনের মোজা আর কুমিরের চামড়ার কালো বেল্ট আর জুতা। তার মুখের ভাব শান্ত।
আমার ওপর তোমার বিশ্বাস নেই জেমস?
তার পাশে বসে বন্ড বলল, তাতিয়া তোমার জন্য আর একটু হলে আমার হার্টফেল করত। কি হয়েছিল?
নিরীহ স্বরে তাতিয়ানা বলল, কি আবার হবে? কিছুই হয়নি। আমি বলেছিলাম আসব–এসেছি। আমার ওপর। তোমার বিশ্বাস নেই। আমি ভাল করেই জানি আমার চেয়ে আমার যৌতুকটার ওপরেই তোমার ঝোঁক বেশি। সেটা ওপরে আছে।
বন্ড নিস্পৃহভাবে উপর দিকে তাকাল। র্যাকে তার সুটকেসের পাশে আরো দুটো ছোট ছোট কেস রয়েছে। তার হাত তুলে নিয়ে বন্ড বলল, সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ, তোমার কোন বিপদ হয়নি।
বন্ডকে স্বীকার করতে হল মেশিনটার চেয়ে মেয়েটার ওপরেই তার ঝোঁক বেশি। তার চাহনির মধ্যে সে কথা স্পষ্ট হয়ে উঠল। সেটা লক্ষ্য করে তাতিয়ানা নিশ্চিন্ত হল। তার হাত ধরে পরম পরিতৃপ্তির সঙ্গে কোণে হেলান দিয়ে বসল তাতিয়ানা।
সেরগ্লিও পয়েন্ট ঘুরে মৃদু ক্যাচক্যাচ শব্দ করে ট্রেনটা চলছে। বন্ড একটা সিগারেট ধরাল। তার মনে পড়ল চব্বিশ ঘণ্টারও কম সময় আগে যে বিরাট বিজ্ঞাপনটার পেছনে ক্রিলেনসু থাকত, অল্পক্ষণের মধ্যে সেটার পেছন দিয়ে তারা যাবে। সেই দৃশটা বন্ডের আবার স্পষ্ট মনে পড়ল; সাদা চৌমাথা, ছায়ার মধ্যে দুটি মানুষ, বিজ্ঞাপনের ছবির লাল ঠোঁট দুটোর মধ্যে দিয়ে সেই দুর্ভাগা লোকটা বেরিয়ে আসছে।
