নিশ্চয়ই!
সত্যি বলছ?
হ্যাঁ।
তোমার ভয় করছে না?
তাতিয়ানার মনে পড়ল তাকে একটা দারুণ ভয় পাবার অভিনয় করতে হবে, হা! আমার ভয় করছে। কিন্তু আগেকার মত নয়। তুমিই তো আমাকে বিপদ থেকে রক্ষা করবে। করবে না?
নিশ্চয়ই। দুর্ভাবনা করো না। তোমার ভার নিলাম।
বন্ড এতদিন ধরে যে প্রশ্নটা করবে ভেবেছিল মেয়েটি সে ধরনের নয় বলে একটু ইতস্তত লাগছে। কিন্তু প্রশ্নটা তাকে করতেই হবে।
কিন্তু সেই মেশিনটা?
বন্ডের মনে হল মেয়েটির মুখে যেন সে চড় কষিয়েছে।
তাই বল–তোমার আসল দরকার মেশিনটা।
শান্ত গলায় বন্ড বলল, শুন। এই মেশিনটার সঙ্গে তোমার বা আমার কোন সম্পর্ক নেই। কিন্তু লন্ডনে আমার অফিসের লোকেরা সেটা চায়। তারা মনে করে রুশীদের এটা একটা আশ্চর্য আবিষ্কার। মেশিনটাকে তারা কপি করতে চায় তোমার দেশের লোকেরা যেমন বিদেশী ক্যামেরা-ট্যামেরা কপি করে।
তুমি এখন মিথ্যে বলতে শুরু করেছ।
মেয়েটির আয়ত নীল চোখ দিয়ে এক ফোঁটা পানি তার নরম গালের ওপর গড়িয়ে পড়ল, সে চাদরটা টেনে মুখ চোখ ঢেকে ফেলল।
চাদরের তলা দিয়ে বন্ড তা হাত স্পর্শ করল। তাতিয়ানা রেগে সরিয়ে দিল।
বন্ড বলল, চুলোয় যাক মেশিনটা। কিন্তু, দোহাই তানিয়া, মনে রেখ আমার ওপর একটা কাজের দায়িত্ব আছে। কি করে আমরা এখান থেকে ইংল্যান্ডে যাব ভাল করে প্ল্যান করা দরকার। মেশিনটা অবশ্য আমার অফিসের লোকেরা চায়নইলে মেশিন সমেত তোমাকে ইংল্যান্ডে আসার জন্য আমাকে পাঠাত না।
বিছানার চাদরে তাতিয়ানা চোখ মুছে ভাবল নিজের কাজের কথাটা সে ভুলে যাচ্ছে। বন্ডের কথাটাই ঠিক। তার ওপর একটা কাজ। তাতিয়ানারও রয়েছে এক দায়িত্ব।
শান্তভাবে তাতিয়ানা বলল, মেশিনটা আনব। তার জন্য দুর্ভাবনা করো না। আজ রাতেই আমাদের যেতে হবে। এখান থেকে পালাবার এটাই একমাত্র সুযোগ। আজ সন্ধ্যে ছ টা থেকে আমার রাতের ডিউটিতে থাকার কথা। অফিসে আমি একা থাকব। SPEKTOR মেশিনটা আমি নিয়ে আসব।
বন্ডের চোখ কুঁচকে উঠল। ভাবল মেশিনটা চুরি গেছে জানবার পর তাতিয়ানাকে কি করে সে প্লেনে তুলবে। মেয়েটি আর SPEKTOR মেশিন ফেরত পাবার জন্য রুশীরা নানা ব্যবস্থা করবে। অবরোধ, প্লেনে বোমাও থাকতে পারে। শান্ত গলায় বন্ড বলল, ঠিক আছে তাতিয়ানা। তোমাকে লুকিয়ে রাখব। তারপর কাল প্রথম প্লেন ধরব।
বোকার মত কথা বলো না। আমরা ট্রেন ধরব-ওরিয়েন্ট এক্সপ্রেস। আজ রাত নটায় ছাড়বে। প্রয়োজনের বেশি আমি এক মিনিটও ইস্তাম্বুলে থাকব না। কাল ভোরে আমরা সীমান্ত পেরিয়ে যাব। তোমাকে টিকিট ও পাসপোর্ট জোগাড় করতে হবে। তোমার বৌ সাজছি ভেবেই আমার ভাল লাগছে। একটা কৃপে কম্পার্টমেন্টে আমরা থাকব। নিশ্চয়ই সেই কামরাটা খুব আরামের। চাকার ওপর যেন ছোট্ট একটা ঘর। দিনের বেলায় আমরা গল্প করব আর রাতে বাইরে করিডোরে দাঁড়িয়ে তুমি আমাকে পাহারা দেবে।
বন্ড বলল, নিশ্চয়ই। কিন্তু শোন তাতিয়ানা, এই প্ল্যানটা একেবারে পাগলামি। কোন না কোন জায়গায় রুশীরা আমাদের ধরবে। ঐ ট্রেনে লন্ডনে পৌঁছতে আমাদের চারদিন, পাঁচ রাত লাগবে। অন্য প্ল্যান কর।
তাতিয়ানা বলল, অন্য কোনভাবে যাব না। ট্রেনেই যাব। তুমি একটা চালাক লোক–তবে তারা আমাদের কি করে ধরবে?
তাতিয়ানা ভাবল, হা আল্লাহ্ কেন ওরা ট্রেনে যাবার জন্য জোর দিয়েছিল সে বন্ড কি করে বুঝবে। সেটাই তাদের পাকাপাকি সিদ্ধান্ত। তারা বলেছে প্রেম করবার জন্য বন্ড পুরো চারদিন পাবে এবং এটাই তাদের উপযুক্ত জায়গা। বন্ড তাকে রক্ষা করবে। প্লেনে গেলে তো নির্ঘাৎ জেলে যেতে হবে–ঐ চারটে দিন ভারি দরকারি। তাছাড়া ট্রেনে তাদের লোক তাতিয়ানার ওপর নজর রাখবে, ট্রেন থেকে পালানো একেবারে বারণ। ট্রেনে ওকে জোর করে নিয়ে। যাওয়াটাই তো তার ডিউটি। এখন দেখছে ডিউটি নয়–সমস্ত শরীর-মনের আকুল আকাঙ্ক্ষা।
বন্ডের চিন্তিত মুখ দেখে তার ইচ্ছে হল বলতে কোন ভয় নেই। তাদের কারোরই কোন ক্ষতি হবে না, কারণ এই প্লটে সেটা উদ্দেশ্য নয়।
এখনো আমার কিন্তু মনে হচ্ছে এটা নিছক পাগলামি, বন্ড M-এর প্রতিক্রিয়ার কথা কল্পনা করতে চেষ্টা করল, মনে হচ্ছে এটা হয়ত সম্ভব। আমার পাসপোর্ট আছে। শুধু যুগোশ্লাভিয়ার ভিসা দরকার। ভেব না তোমাকে নিয়ে ট্রেনে বুলগারিয়ার ভেতর দিয়ে যাব। বুলগারিয়ার মধ্য দিয়ে গেলে ভাববো তুমি আমাকে অপহরণ করতে চাও।
তাতিয়ানা হেসে বলল, তাই তো চাই।
হাসি থামাও, তানিয়া, আমাদের ভাল করে প্ল্যান করতে হবে। আমার দলের একজন সঙ্গে থাকবে তাতে তোমার ভাল লাগবে। তোমার নাম হবে ক্যারোলিন সমারসেট। ট্রেনে তুমি পৌঁছবে কি করে?
চমৎকার নাম। আর তুমি মিস্টার সমারসেট। কি মজা। আমার জন্য ভেব না। ছাড়বার ঠিক আগে আমি ট্রেনে পৌঁছাব। সিরকেসি স্টেশন, কোথায় জানি। আর আমরা দুর্ভাবনা করব না কেমন?
ধর শেষটায় তুমি যদি ঘাবড়ে যাও, তারা যদি তোমাকে ধরে ফেলে। তাতিয়ানার আত্মবিশ্বাস দেখে হঠাৎ তীব্র একটা সন্দেহে বন্ডের শিরা সিরসিরিয়ে উঠল।
তোমাকে দেখার জন্য আমি ভয় পেয়েছিলাম। এখন আর আমার কোন ভয় নেই। তাতিয়ানা ভাবতে চেষ্টা করল। এই কথাগুলো সত্যি। কেমন যেন তার মনে হল এগুলো বাস্তবিকই তার মনের কথা। এখন আর আমি ঘাবড়াব না। ওরা আমাকে ধরতে পারবে না। আমি জিনিসপত্র হোটেলে রেখে যে ব্যাগটা নিয়ে বেরোই শুধু সেটাই অফিসে নিয়ে যাব। কিন্তু আমার ফারের কোটটা ফেলে যেতে পারব না। সেটা আমার ভারি পছন্দের জিনিস, কিন্তু আজ রবিবার। তাই সেটা পরে অফিসে গেলে কেউ কোন সন্দেহ করবে না। আজ রাত সাড়ে আটটায় অফিস থেকে বেরিয়ে ট্যাক্সি নিয়ে স্টেশনে যাব। এখন আর তুমি দুর্ভাবনা কোর না। আবেগভরে একটা হাত বন্ডের দিকে সে এগিয়ে দিল। কারণ অভিনয় করাটা তার দরকার। বল, খুশি হয়েছ।
