বন্ডের কথায় করিম হাসলেন, আজকের ঘটনার জন্য তাহলে ক্ষমা করছ তো?
তোমাকে ক্ষমা, কিসের জন্য? তোমাকে একটা কাজ শেষ করতে হবে। সেই কাজটার ধরন দেখে আমি অত্যন্ত অভিভূত। তোমার কাছে আমারই ক্ষমা চাওয়া উচিত। আমার অনেক ঝামেলা তোমার ঘাড়ে চাপিয়ে দিয়েছি। আমি শুধু তোমার পেছন পেছন ঘুরছি, আপন কাজ কিছুই হয়নি। M নিশ্চয়ই অধৈর্য হচ্ছেন। হয়ত হোটেলে কোন খবর পাঠিয়েছেন।
হোটেলে পৌঁছে বন্ডকে নিয়ে করিম কেরানির টেবিলে এসে জানলেন বন্ডের কোন খবর আসেনি। করিম পিঠ চাপড়ে হেসে বন্ডকে বললেন, দোস্ত ভেবো না। পেট ভরে ব্রেকফাস্ট খেয়ে, সকালে আমি গাড়ি পাঠাব। তোমার পিস্তলটা সাফ করে নিশ্চিন্তে এখন ঘুমোও।
বন্ড দরজা খুলে ঘরে ঢুকে ভেতর থেকে তালা বন্ধ করল। জামা-কাপড় খুলে বাথরুমে গিয়ে কয়েক মিনিট সে শাওয়ারের তলায় দাঁড়িয়ে দাঁত মেজে একটা ওষুধ দিয়ে মুখটা কুলকুচো করে ধুয়ে ফেলল। বাথরুমের আলো নিভিয়ে শোবার ঘরে এল।
জানালায় দাঁড়িয়ে জ্যোত্সায় ঝকঝকে সমুদ্রের বড় বড় ঢেউ দেখল। হাতঘড়িতে দেখে রাত দুটো, বন্ড হাই তুলল। ড্রেসিং টেবিলের আলো নেভাতে গিয়ে হঠাৎ উত্তেজনায় টান টান হয়ে উঠল তার শরীর।
ঘরের পেছন দিকে একটা মেয়েলি হাসির গলা, বেচারা মিস্টার বন্ড। নিশ্চয়ই তুমি ভারি ক্লান্ত। বিছানায় এস।
.
লালের ওপর কালো ছাপ
বন্ড চমকে বিছানার দিকে তাকাল, কিন্তু কিছুই দেখতে পেল না। বিছানার পাশের গোলাপী শেড ঢাকা আলোটা জ্বালাল। বিছানার চাদরের তলায় দীর্ঘ একটি দেহ। বালিশে বাদামী চুল ছড়িয়ে পড়েছে।
বন্ড হেসে আলগোছে টানল সেই চুল।
চাদরের তলা থেকে মৃদু প্রতিবাদ শোনা গেল। সে বিছানার পাশে বসে চাদরের একটা কোণ সন্তর্পণে খুলল। একটা আয়ত নীল চোখ তাকে দেখছে।
তোমাকে ভারি অসভ্যের মত দেখাচ্ছে। চাদরের তলা থেকে ঝাপসা স্বর শোনা গেল।
তোমার বেলায় কি? কি করে এখানে এলে?
দুটো তলা হেঁটে নেমে এসেছি।
আমি বিছানায় আসছি।
সঙ্গে সঙ্গে মেয়েটি বিছানায় উঠে বসল। মুখ টকটকে লাল। না-না। এ বিছানায় কক্ষনো আসবে না।
কিন্তু এটা তো আমার বিছানা। তুমিই তো বলেছিলে বিছানায় আসতে।
মেয়েটির মুখ অবিশ্বাস্য সুন্দর। বন্ড খুঁটিয়ে দেখতে লাগল। মেয়েটির মুখ আরো টকটকে হয়ে উঠল।
সেটা কথার কথা। আলাপ করবার জন্য বলেছিলাম।
তোমার সঙ্গে দেখা হওয়ায় আমি ভারি খুশি। আমার নাম জেমস্ বন্ড।
আমার নাম তাতিয়ানা রোমানাভো। বন্ধুরা আমাকে তাতিয়া বলে ডাকে।
খানিক চুপচাপ। পরস্পরকে তারা দেখতে লাগল। মেয়েটির চাহনিতে কৌতূহল আর একটা নিশ্চিন্ত ভাব ফুটে উঠল। বন্ড তাকাল নিষ্প্রাণ-সন্দিগ্ধ-দৃষ্টিতে।
মেয়েটিই প্রথম কথা বলল।
তোমাকে দেখতে ঠিক তোমার ফটোর মত, মেয়েটির মুখ আবার লাল হয়ে উঠল। কিন্তু কিছু একটা পরো। তোমার এরকম চেহারা দেখে আমি হকচকিয়ে গেছি।
আমিও কম হকচকিয়ে যাইনি। এই হকচকিয়ে ওঠা বা খাবি খাবার ভাবটারই নাম যৌন আকর্ষণ। তোমার পাশে বিছানায় ঢুকলে কিছু আসে যায় না। ভাল কথা, তোমার পরনে কি আছে?
মেয়েটি চাদরটা সামান্য নামাল। তার তলায় দেখা গেল চওড়া মখমলের একটা ফিতে। বন্ড অনুভব করল তার শরীরটা যেন শাসন মানছে না।
কিন্তু তোমার বাদবাকি পোশাকগুলো কোথায়? এই পোশাকেই লিফট দিয়ে নেমেছিলে নাকি?
না-না। সেটা ভদ্রতা নয়। বাকি পোশাক বিছানার তলায় আছে।
যদি ভেবে থাক এমনি এমনি এ ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে, তা হলে…
বন্ড বিছানা থেকে উঠে গাঢ় নীল রঙের সিল্কের কোট পরল।
তোমার প্রস্তাবটাও ভদ্র নয়।
তাই নাকি? ব্যঙ্গের হাসি হেসে বন্ড বিছানার পাশে একটা চেয়ারে বসল, পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরীদের মধ্যে তুমি একজন।
মেয়েটির মুখ লাল হল, সত্যি বলছ? আমার ধারণা হাঁ-মুখটা আমার খুব বড়। পাশ্চাত্য দেশের মেয়েদের মত আমি সুন্দরী। একজন আমাকে বলেছিল গ্রেটাগার্বোর মত দেখতে। কথাটা সত্যি?
বন্ড বলল, তার চেয়েও সুন্দরী! তুমি আরো বেশি ঝলমলে।
ঝলমলে, কথাটার মানে কি?
বন্ড বলল, তোমার চোখ দুটো ভারি সুন্দর–ভারি হাসিখুশি।
তাতিয়ানা গম্ভীর হয়ে বলল, শুনতে অদ্ভুত লাগছে। রাশিয়াতে হাসিখুশির কথা কেউ বলে না। তাতিয়ানা ভাবল গত দু মাসের মানসিক উদ্বেগের পরে কি করে তাকে হাসিখুশি দেখাতে পারে? তবে হ্যাঁ, তার মনটা খুব হালকা লাগছে। নাকি যে মানুষটাকে দেখার পর তার দুশ্চিন্তা কেটে গেছে, দারুণ স্বস্তি পেয়েছে সে। মানুষটা বাস্তবিকই সুপুরুষ। তাই তার চোখ-মুখ হাসি-খুশি? কিন্তু লন্ডনে পৌঁছবার পর মানুষটা যখন শুনবে তার মন ভোলাবার জন্য তাকে পাঠানো হয়েছে–তখন এই মানুষটা কি তাকে ক্ষমা করবে? তাতিয়ানা বলল, তোমার চেহারাটা ভারি সুন্দর, দেখতে আমেরিকান ফিল্মস্টারের মত।
বন্ড বলল, দোহাই! ও-কথা বোলো না। কোন পুরুষের পক্ষে এর চেয়ে অপমান আর নেই।
তাতিয়ানা তাড়াতাড়ি নিজের ভুল শুধরে বলল, আমি বানিয়ে বলেছিলাম, তোমাকে খুশি করতে চেয়েছিলাম। লেরমন্তভ নামে এক রুশী লেখকের বইতে আমার প্রিয় হিরোর কথা লেখা আছে। একদিন তোমাকে তার কথা বলব।
বন্ড বলল, শুন তাতিয়া। কাজের কথায় আসা যাক। সত্যিই কি তুমি আমার সাথে ইংল্যান্ডে যেতে চাও?
