বন্ড বলল, তোমার কথাই সই। তুমি ফসকালে জেনো আমার কাছে আর একটামাত্র বুলেট আছে।
অনিচ্ছাসত্ত্বেও করিম বললেন, চলে এস। অনেকটা হাঁটতে হবে। আর দুজন অন্য পথে যাবে।
শোফারের কাছ থেকে করিম একটা লম্বা ছড়ি আর একটা চামড়ার কেস নিয়ে কাঁধে ঝোলালেন। দূরে একটা লাইটহাউসের হলদেটে আলো নিভছে আর জ্বলছে। তারা হাঁটতে শুরু করল।
সরু দুর্গন্ধময় একটা গলিতে তারা পৌঁছাল। তার মধ্যে ঢুকে সন্তর্পণে হাঁটতে হাঁটতে করিম বললেন, সাবধানে চল, এখানে প্রচুর আবর্জনা।
জ্যোৎস্নায় ভিজে পাথরগুলো ঝকঝক করছে। সেই সঙ্গে যে কত রকমের দুর্গন্ধ! বন্ড ভাবল, এই কাজটা শেষ করার আগে আর কত ধরনের দুর্গন্ধ সইতে হবে?
গলির শেষে তারা থামল। তারপর ডান দিকের পথ ধরলেন। দু-পাশে সস্তা জিনিসপত্রের দোকান।
দশ মিনিট ধরে হাঁটল। তারপর করিম তাঁর গতি মন্থর করে ইশারায় বন্ডকে ছায়ায় ঢাকা একটা জায়গায় আসতে বললেন।
ফিসফিস করে তিনি বললেন, কাজটা সহজ। ঐখানে, রেল লাইনের পাশে ক্রিলেনসু থাকে। ওখানে আছে। বিজ্ঞাপনের মস্ত বড় একটা বোর্ড। আর ছোট একটা নড়বড়ে ঘর। সেই ঘরে লুকিয়ে থাকে ক্রিলেনসু। সেই ঘরটার। সামনের দিকে একটা দরজা আছে। বিজ্ঞাপনের বোর্ডের মধ্য দিয়ে আর একটা চোরা দরজা আছে পথের দিকে। আমার দুজন লোক যাবে সদর দরজায়। চোরা দরজা দিয়ে কেটে পড়বার চেষ্টা করবে। তখন তাকে আমি গুলি করব। ঠিক আছে?
তুমি বললেই ঠিক।
দেওয়ালের পাশ ঘেঁষে তারা এগিয়ে চলল। দশ মিনিট পরে কুড়ি ফুট উঁচু বিজ্ঞাপনের বোর্ডটা চোখে পড়ল। করিম এখন আরো সন্তর্পণে হাঁটতে লাগলেন। বিজ্ঞাপনের বোর্ডের প্রায় একশো গজ দূরে ছায়ায় ঢাকা জায়গা শেষ হয়েছে। ছোট ঘরটা জ্যোৎস্নায় ঝকঝক করছে। সেখান থেকে বন্ডের পিছনে দাঁড়িয়ে ফিসফিস্ করে তিনি বললেন, আমাদের এখন অপেক্ষা করতে হবে।
চামড়ার কেসটা খুলে একটা ইস্পাতের সরু অথচ ভারি টিউব করিম বের করলেন। প্রায় দু ফুট লম্বা। দুটো দিক ফোলা। বন্ডের হাতে দিয়ে বললেন, স্নাইপারস্কোপ, জার্মান মডেল। Intra-red লেন্স। অন্ধকারে দেখা যায়। ওখানে বিজ্ঞাপনটা দেখ। ঐ ঠোঁটজোড়া। নাকের ঠিক তলায় চোরা-দরজার সীমারেখা দেখতে পাবে।
বন্ড তার ডান চোখের কালো ছায়ার উপর সেটা ফোকাস করল। কালো জায়গাটা ধূসর হয়ে উঠল। দেখা গেল একটি মেয়ের মুখ আর কতকগুলো অক্ষর। বন্ড পড়তে পারল। লেখা ছিল–নায়েগ্রা –ভূমিকায় মেরিলিন মনরো এবং জোসেফ কনে। তার নিচে একটা কার্টুন ছবির নাম। নাসারন্ধ্রে অস্পষ্ট চৌকো একটা জায়গা দেখা গেল।
বন্ডের পেছনে খুটখুট শব্দ। করিম তার ছবিটা তুলে ধরলেন। বন্ড যা ভেবেছিল সেটা একটা সাইলেন্সর লাগান রাইফেল।
ফিসফিস্ করে করিম বললেন, নতুন 88 Winchester-এর নলচে। আংকারার লোক তৈরি করে দিয়েছে। 308 বোরের কার্তুজ এতে ভরা যায়। তোমার কাঁধে রাইফেলটা রাখলে অসুবিধা হবে?
ফিসফিস্ করে বললেন করিম, বিজ্ঞাপনের পেছনে ওদের যেতে হবে। বন্দুকের ব্যারেলটা নিজের কাঁধের ওপর অনুভব করল বন্ড।
বিজ্ঞাপনের পেছনের ট্রেনের সিগন্যালের একটা হাত ঝুলে পড়ল তারপর একটা ট্রেন চলে গেল। বন্ডের ডান কানে করিম ফিসৃফিস্ করে বললেন, আসছে।
পোস্টার ছবির বিরাট মুখের গহ্বর থেকে কালো মূর্তি বেরিয়ে এল। মনে হল মৃতদেহের মুখ থেকে যেন একটা মাকড়সা ঝুলছে।
বন্ডের কপালে বিন্দু-বিন্দু ঘাম জমে উঠল। লোকটা নিঃশব্দে ফুটপাত দিয়ে তাদের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। ব্যারেলটা আরো চেপে বসল বন্ডের কাঁধে। এবার লোকটা নিশ্চয়ই দৌড়াতে শুরু করবে–ভাবল বন্ড । বন্ডের কানের কাছে খট করে একটা শব্দ হল, যেন গাছে একটা কুড়ল আঘাত করল। দু হাত প্রসারিত করে লোকটা মুখ থুবড়ে পড়ল।
বন্ডের পায়ের কাছে একটা ফাঁকা কার্টিজ ঠং করে পড়ল এবং পরের গুলি চেম্বারে ঢোকাবার ক্লিক শব্দ হল।
লোকটা খানিক পাথরগুলো আঁচড়াল, জুতা সমেত পা ছুঁড়ল তারপর একেবারে স্থির।
চোখ ফিরিয়ে নিল বন্ড জীবনের উপর ঘেন্নায়। এই লোকটা দু-দুবার করিমকে খুন করার চেষ্টা করেছে। এক দিক দিয়ে ভাবলে এটা পুরনো দিনের ডুয়েল লড়ার মত।
বন্ড কিন্তু কাউকে ঠাণ্ডা মাথায় গুলি করেনি। ঠাণ্ডা মাথায় একজন মানুষ আর একজনকে খুন করছে এবং সে সাহায্য করছে–ভাবতেই বন্ডের অন্তরাত্মা বিদ্রোহ করে উঠল।
নিঃশব্দে করিম তার হাত ধরে নিয়ে চলল যে পথ দিয়ে এসেছিল সেই পথ দিয়ে।
মনে হল করিম বন্ডের মনের কথা বুঝেছেন।
দার্শনিকের মত তিনি বললেন, দোস্ত। জীবনটা মৃত্যু দিয়ে ভরা। ঐ লোকটাকে খুন করেছি বলে আমার কোন দুঃখ নেই। রুশীরা ভারি নিষ্ঠুর, আজ যাদের অফিসে দেখেছি তাদেরকে খুন করলে আমার বিবেক বাধা দেবে না। তাদের কাছে সবকিছু জোর করে আদায় করে নিতে হয় দয়া করে নয়। তোমার সরকারের রুশীদের প্রতি অনেক বেশি কড়া হওয়া উচিত–আজ রাতে ওদের যে সামান্য শিক্ষা দিলাম সেইরকম শিক্ষা দেওয়া।
পাওয়ার পলিটিক্সে, মানে শক্তির লড়াইতে তুমি যে সুযোগ পেয়েছিলে, যে রকম চটপট আর নিখুঁতভাবে কাজ হাসিল করলে সে কিন্তু নেহাত চুনোপুঁটি। রুশীদের সম্বন্ধে তুমি যা বললে আমিও তাতে একমত। আসলে তারা। ম্যাসোকিস্ট । তাদের শিরায় শিরায় যৌন বিকৃতি। লাঠি দিয়ে মার খেয়ে তারা আনন্দ পায়, সেই মার স্তালিন তাদের দিয়েছিলেন। জানি না ক্রুশ্চেভ আর তার দল কতটা সফল হবেন। ইংল্যান্ডের রাজনীতি এখন সবাইকে তোয়াজ করা, দেশ ও বিদেশেও। জানি না তাতে কতটা সফল হবে তারা।
