জন্তুর মত দাঁত বার করে ভিদা তার ওপর ঝাঁপিয়ে নখ দিয়ে তাকে খামচে আর পড়পড় করে চুল ছিঁড়ে চলল।
কিন্তু জোরা তার কনুই আর হাঁটু দিয়ে আত্মরক্ষা করে শেষ পর্যন্ত লাথি মেরে ভিদাকে ছিটকে ফেলল। কুটি কুটি পোশাকের ভেতর থেকে জোরার শরীরটা দেখা গেল। জোরা আবার ভিদাকে আক্রমণ করে তার জামা ছিঁড়ে দিল। ভিদাও জোরাকে কিল, চড়, ঘুষি মারতে লাগল। হঠাৎ জোরা আর্তনাদ করতে শুরু করল। দেখা গেল জোরার বুকটা ভিদা সজোরে কামড়ে ধরেছে। জোরা নিজের হাত ছাড়িয়ে ভিদার চুলের মুঠি ধরল। ভিদা আবার খামচাতে লাগল। মেয়ে দুজন। বেড়ালের মত পরস্পরকে ছেড়ে পিছু হটে ফেস-ফোঁস করতে লাগল। জোরার অনাবৃত বুক থেকে তখন রক্ত ঝরছে।
সতর্কভাবে তারা ঘুরে দাঁড়াল। ছাড়া পেয়ে দুজনই খুশি। ঘুরতে ঘুরতে তাদের পোশাকের শেষ ফালিগুলো তারা দর্শকদের দিকে ছুঁড়ল।
এই দুটি উলঙ্গ চকচকে শরীর দেখে বন্ড দম বন্ধ করল। সে টের পেল করিমও উত্তেজনায় উত্তপ্ত মনে হল জিপসিদের চক্র এই দুটি মেয়ের কাছে সঙ্কুচিত হয়ে উঠেছে। জ্যোৎস্নায় লোকগুলোর চোখ চকচকে এবং তপ্ত নিশ্বাসের অস্পষ্ট শব্দ শোনা গেল।
এভাবে লড়াই চলল।
শেষটায় জোরা কিন্তু পারল না। তাকে মাটিতে ফেলে, তার বুকে চেপে বসে দাঁত বার করে জোরার গলার কাছে। ভিদা মুখটা আনছিল।
হঠাৎ এমন সময় একটা বোমা ফাটায় মত বিকট শব্দে সেখানকার জমাট উত্তেজনা ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। নাচের জায়গায় পেছনকার অন্ধকার ঝলসে উঠল আগুনের শিখা। হঠাৎ সেই ফল বাগান মুখর হল ছুটন্ত মানুষের পায়ের শব্দে। সর্দার জিপসি তার বাঁকানো ছোরা সামনে ধরে এগিয়ে এল। তার পেছনে করিম, হাতে পিস্তল। মেয়ে দুটির চোখ ভয়ে যেন ঠিকরে পড়ছে। তাদের পাশ দিয়ে যাবার সময় সর্দার চেঁচিয়ে কি যেন বলল আর তারা দৌড়ে গাছগুলোর মধ্যে অদৃশ্য হল।
বেরেটা পিস্তলটা হাতে নিয়ে করিমের পেছনে বন্ড চলল, যেখানে বাগানের দেয়ালের এক একটা অংশ বোমায় উড়ে গিয়ে হাঁ করে রয়েছে। দেয়ালে গর্ত আর নাচের জায়গায় নানা লোক ধস্তাধস্তি করছে। কেউ ছুটে পালাচ্ছে। এগিয়ে আসার পর বুলগানিনদের বন্ড চিনতে পারল। জিপসিদের মধ্যে মনে হল জিপসিদের তুলনায় সেই মুখহীন মানুষের সংখ্যা দ্বিগুণ। সেই ধস্তাধস্তির মধ্যে এক জিপসি তরুণ নিজের পেট আঁকড়ে ধরে কাশতে কাশতে বন্ডের দিকে এগিয়ে এল। দু জন বেঁটে লোক ছোরা নিয়ে তার দিকে ধাওয়া করল।
সঙ্গে সঙ্গে এক পাশে সরে তাদের লক্ষ্য করে বন্ড দু বার গুলি ছুঁড়ল। লোক দুটো নিশব্দে মুখ গুজড়ে পড়ল।
দুটো বুলেট খতম। মাত্র ছ টা বাকি। পায়ে পায়ে লড়াইয়ের দিকে বন্ড এগিয়ে গেল। তার মাথার পাশ দিয়ে সাঁ করে একটা ছোরা ছুটে গিয়ে নাচের জায়গায় ঝনঝনিয়ে পড়ল।
ছায়ার ভিতরে থেকে করিম ছুটে আসছিল পেছনে তার দুজন লোক। ছোরাটা তাক করা হয়েছিল করিমের দিকে। দ্বিতীয় লোকটা থেমে তার ছোরা ছোড়বার জন্য হাত তুলল। আবার গর্জে উঠল বন্ডের পিস্তল। লোকটা লুটিয়ে পড়ল। অন্য লোকটা গাছের আড়ালে পালাল। বন্ডের পাশে এক হাঁটুতে ভর দিয়ে বসে করিম তার পিস্তলটা ছোড়বার প্রাণপণ চেষ্টা করতে লাগলেন।
আমাকে বাঁচাও, চেঁচিয়ে উঠলেন করিম। প্রথম গুলি ছোঁড়ার পর পিস্তলটা আটকে গেছে। লোকগুলো হারামজাদা বুলগানিয়ানা। আল্লাহই জানেন কি তারা করতে এসেছে।
প্রচণ্ড একটা ঘুষি খেয়ে বন্ড মাটিতে ছিটকে পড়ল। বুট দিয়ে কে একজন সজোরে তার ঘাড়ে লাথি মারল। ঘাসের ওপর পাশ ফেরার সময় বন্ড ভেবেছিল একটা ছোরা তার ওপর ঝলসে উঠবে। কিন্তু তারা তাকে ছেড়ে করিমকে আক্রমণ করল। তাদের চাপে করিম পড়ে গেলেন।
সঙ্গে সঙ্গে সামনে লাফিয়ে গিয়ে পিস্তলের কুঁদোটা সজোরে বন্ড বসিয়ে দিল গোল একটা চাঁছাছোলা মাথার ওপর। জিপসি সর্দারের বাঁকানো ছোরাটা বন্ডের চোখের পাশ দিয়ে ঝলসে উঠে আর একটা বুলগানিয়ানের পিঠে বিধল। করিম উঠে দাঁড়ালেন। তৃতীয় বুলগানিয়ান দৌড়াতে শুরু করল। পাঁচিলের ভাঙা জায়গাটা দাঁড়িয়ে আর একজন একটা কথা তখন বারবার চেঁচিয়ে চলেছে। আক্রমণকারীরা লড়াই থামিয়ে ছুটে সেই লোকটার পাশ দিয়ে পথে বেরিয়ে গেল।
করিম গর্জন করে উঠলেন, জেমস, গুলি কর, গুলি কর। ঐ লোকটাই ক্রিলেনসু। তিনি দৌড়াতে শুরু করলেন। বন্ডের পিস্তল একবারে গর্জে উঠল! কিন্তু লোকটা তখন মাথা নিচু করে পাঁচিলের আড়ালে পালিয়েছে এবং অটোমেটিক পিস্তল দিয়ে রাতে তিরিশ গজ দূরে কাউকে মারা প্রায় অসম্ভব। বন্ড তার গরম পিস্তলটা নামাল। বহু ল্যামব্রেটার ভটভট শব্দ শোনা গেল, তারপর তীরবেগে সেগুলোর চাপা আর্তনাদ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। করিম আর ভাঙরাকে বন্ড দেখাল পাঁচিলের ফাটল দিয়ে এসে সেই আহত মানুষগুলোকে মাঝে মাঝে পা দিয়ে ওলটাতে। পথ থেকে অন্যান্য জিপসিরা ফিরে এল। ছায়ার ভিতর থেকে দৌড়ে এসে বয়স্ক মেয়েরা আহত মানুষগুলোর পরিচর্যায় লেগে গেল।
বন্ড ভাবল, ব্যাপারটার মানে কি? গোটা বার মানুষ মারা পড়েছে। কিন্তু কেন? কাকে তারা হত্যা করার চেষ্টা। করছিল? নিশ্চয়ই তাকে নয়। মাটিতে পড়ার পর যখন সে ভাবছিল এইবার তার মরবার পালা লোকগুলো তখন তাকে ছেড়ে করিমের দিকে ছোটে। এই নিয়ে দু বার করিমকে হত্যা করার চেষ্টা হল। রোমানাভো মেয়েটির ব্যাপারের। সঙ্গে এ ঘটনার কি কোন যোগাযোগ আছে? কি যোগাযোগ থাকতে পারে?
