বন্ড বলল, ডাকো, আমি তোমার মর্যাদাহানি ঘটাব না। মেয়েতে মেয়েতে লড়াই এক কথা, মেয়ের সঙ্গে পুরুষের লড়াই অন্য কথা। কিন্তু সেই বোমাটা যেটা তোমার অফিসে ফেটেছিল সে বিষয়টা কি হল? সে সম্বন্ধে লোকটা কি বলছে?
এটা সেই মুখহীন মানুষগুলোর সর্দারের কাজ। গোল্ডেন হর্ন দিয়ে নৌকায় এসে মই বেয়ে দেওয়ালে বোমাটা সে আটকায়। কিন্তু আমাকে মারতে পারেনি। লোকটা ডাকাত। বুলগারিয়ান রিফিউজি। নাম ক্রিলেনসু। তার সঙ্গে আমার একটা বোঝাঁপড়া করতে হবে। এ ধরনের জ্বালাতন আমি বরদাস্ত করব না। জানি লোকটা কোথায় থাকে। ভাঙরা জানতে পারে ভেবে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি নিয়ে আসার জন্য শোফারকে পাঠিয়েছি।
একটি তরুণী টেবিল থেকে উঠে এসে করিমকে অভিবাদন জানাল। তার সর্বাঙ্গে একটা বন্য আকর্ষণ। পরনে কালো মোটা সাবেকী ফ্রক। গলায় স্বর্ণমুদ্রার হার। এক-এক হাতে দশটা করে সোনার সরু বেসলেট। করিমকে কি যেন বলল, করিম তার উত্তর দিলেন।
করিম বললেন, টেবিলে আমাদের ডাক পড়েছে। আশা করি হাতে করে তোমার খাওয়ার অভ্যেস আছে। দেখছি আজ রাতে সবাই সবচেয়ে ভাল পোশাক পরেছে। এই মেয়েটার প্রচুর সোনাদানা। একে বিয়ে করলে লাভ আছে।
টেবিলে জিপসি সর্দারের দু পাশে দুটো জায়গা আমাদের জন্য দেওয়া হল। করিম সবাইকে শুভেচ্ছা জানালেন। তারাও সামান্য ঝুঁকে অভিবাদন জানাল। বন্ড আর করিম বসল। তাদের প্রত্যেকের সামনে রসুনের তীব্র গন্ধে ভরা এক প্লেট মসলাদার মাংস, এক বোতল রাকি। একটা পানির কুঁজো আর একটা গ্লাস। টেবিলে আরো অনেক বোতল রাকি । করিম আধ গ্লাস রাকি ঢালার পর অন্য সবাই নিজের গ্লাসে রাকি ঢালল। করিম গ্লাস তুললেন তারপর সবাই নিজেদের গ্লাস তুলে পান করল। বন্ডের পাশের এক বুড়ি তার হাতে লম্বা একটি রুটি দিয়ে কি যেন বলল। বন্ড মৃদু হেসে বলল, থ্যাংক ইউ। বন্ড এক টুকরো রুটি ভেঙ্গে করিমের হাতে দিল।
তার দেখাদেখি বন্ডও খাওয়া শুরু করতে গেলে করিম মৃদুস্বরে বললেন, ডান হাত দিয়ে জেমস্। বাঁ হাতটা এরা শুধুমাত্র একটি কাজেই ব্যবহার করে।
বন্ড এবার ডান হাত দিয়ে খেতে শুরু করল। মাংসটা খুবই সুস্বাদু কিন্তু বেজায় ঝাল। তাদের খাওয়া প্রত্যেকে লক্ষ্য করল। মাঝে মাঝে সেই বুড়ি বন্ডের স্টুর মধ্যে আঙুল ডুবিয়ে তার জন্য বেছে দিল মাংসের টুকরো।
তাদের প্লেট খালি হলে বন্ড আর করিমের মাঝখানে গোলাপ পাপড়ি ভাসা রূপার এক পাত্র পানি আর পরিষ্কার। একটা কাপড় একজন রাখল। বন্ড হাত মুখ ধুয়ে মুছে ধন্যবাদ জানিয়ে ছোটখাট একটা বক্তৃতা দিলেন। করিম তর্জমা করে দিলেন। টেবিলের সবাই তাকে তার বক্তৃতার তারিফ জানাল। জিপসি সর্দার বন্ডকে অভিবাদন জানাল এবং নিজের বন্ধু বলে জানাল। সর্দারের কথার করিম তর্জমা করে দিলেন। সর্দার তারপর জোরে হাততালি দিল। টেবিল থেকে সবাই উঠে বেঞ্চগুলো টেনে নিয়ে নাচের জায়গায় চারপাশে সাজিয়ে রাখল।
বন্ডের কাছে এসে করিম বললেন, কেমন লাগছে? ওরা মেয়ে দুটোকে আনতে গেছে।
সন্ধেটা বন্ডের ভালই লাগছিল।
একটা বেঞ্চের কাছে বন্ডকে করিম নিয়ে এলেন। জিপসি সর্দার একা সেখানে বসেছিল। তার ডান দিকে তারা বসল।
একটা হুড়কো খোলার শব্দ হল। তার মধ্যে থেকে চুলাচুলি করতে করতে রাগী বেড়ালের মত দুটো মেয়ে ঘাসের ওপর দিয়ে ছুটে নাচের রিং-এর মধ্যে এসে পড়ল।
.
রোমাঞ্চকর
জিপসি সর্দার চেঁচিয়ে উঠল। অনিচ্ছাসত্ত্বেও মেয়ে দুজন পরস্পরকে ছেড়ে তার দিকে ঘুরে দাঁড়াল। তীব্র ভৎর্সনার সুরে সর্দার কি সব গড়গড় করে বকে চলল।
মুখে হাত চাপা দিয়ে করিম ফিসফিস করে বলতে লাগলেন। ভারা বলছে, জিপসিদের মধ্যে একটা এক বিখ্যাত উপজাতি। তাদের মধ্যে এক বিরাট বিরোধ। সে বলছে, তাদের নিজেদের মধ্যে কোনরকম ঘৃণা নেই–ঘৃণা শুধু বাইরের লোকেদের। তাদের শান্তির জন্য লড়তে হবে। যে হারবে সে যদি না মরে তা হলে তাকে চিরকালের জন্য দল থেকে দূরে ঠেলে দিতে হবে। বন্য জন্তুদের জোর করে খাঁচায় ভরলে তাদের যা ঘটে, এদেরও তাই হয়।
করিম যখন কথা বলছিলেন রিঙের মধ্যে মেয়ে দুটিকে বন্ড ততক্ষণে খুঁটিয়ে দেখছিল। তারা সুন্দরী, টানটান শরীর, মুখচোখ উত্তেজনায় টকটক করছে–যেন দুটো রাগী জন্তু মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে।
তাদের রুক্ষ ও লম্বা ঘাড় পর্যন্ত চুল কালো। গায়ের রঙ জিপসিদের মত কালো। পরনে নানা রঙের তাপ্পি দেওয়া। পোশাক। একটি মেয়ে মোটা মুখটা গোমড়া, তার সৌন্দর্য অনেকটা সিংহীর মত, চোখে লাল আভা। বন্ড ভাবল এর গায়েই জোর বেশি এবং এ-মেয়েটারই জেতা উচিত।
এ মেয়েটি যদি সিংহী হয়, অন্যজন তাহলে চিতাবাঘ। খুব চটপটে, চোখ ধূর্ত, তীক্ষ্ণ। তার হাতের আঙুলগুলোতে তীক্ষ্ণ বাঁকা নখ। তার পায়ের পেশীগুলো দেখতে পুরুষের পায়ের পেশীর মত শক্ত। বন্ড ভাবল নিশ্চয়ই সেই প্রথমে আঘাত হানবে কারণ সে অনেক বেশি চটপটে।
ভাঙরার কথা শেষ হতে-না-হতেই বড়-সড় চেহারার মেয়েটি অন্য মেয়েটির পেটে সজোরে একটা লাথি মেরে প্রায় সঙ্গে সঙ্গে তার রগে মারল প্রচন্ড এক ঘুষি। অন্য মেয়েটি মেঝেতে চিৎপাত হয়ে পড়ল।
ভীড়ের ভিতর থেকে একটি মেয়ে কাতরে উঠল, হায় ভিদা। বন্ড কিন্তু বুঝল মেঝের ওপর শুয়ে ভিদা অজ্ঞান। হবার অভিনয় করছে। জোরার পা বিদ্যুৎবেগে তার পাজরার দিকে আসার সময় ভিদার চোখ ঝলসে উঠল। মোচড় খেয়ে জোরা যন্ত্রণায় চিৎকার করে তার পা-টা ছাড়াবার চেষ্টা করল। ততক্ষণে ভিদা খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে সজোরে ঠেলা মেরে জোরাকে মেঝেতে ফেলে দিল।
