করিমের উপদেশের কথা স্মরণ করে বন্ডের ঠোঁটে মৃদু হাসি ফুটে উঠল। এমন সময় আবার টেলিফোনটা বাজল। বন্ড রিসিভার তুলল। না, অন্য কোন খবর নয়–শুধু গাড়িটা পৌঁছাবার খবর। সিঁড়ি দিয়ে নেমে রোলস্-এ করিমের কাছে পৌঁছাবার সময় বন্ডকে মনে মনে স্বীকার করতে হল–সে হতাশ হয়েছে। গোল্ডেন হর্নের দরিদ্র পল্লী পেরিয়ে গাড়িটা যখন সামনের পাহাড়ে উঠছে, শোফার মুখ ফিরিয়ে সংক্ষেপে কি একটা বলল।
করিমও সংক্ষেপে উত্তর দিলেন, শোফার বলছে, একটা ল্যামব্রেটা আমাদের পিছু নিয়েছে। সেটা চালাচ্ছে সেই মুখহীন লোকদের একজন। এটা কোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার নয়। ইচ্ছে করলেই তাদের চোখে ধুলা দিয়ে আমি ঘোরাঘুরি করতে পারি। বহুবার মাইলের পর মাইল এই গাড়িটাকে তারা অনুসরণ করেছে। পেছনের সিটে তখন থাকত শুধু একটা বড়সড় পুতুল। আঁকাল গাড়ির নানা সুবিধে। তারা জানে এই জিপসি আমার বন্ধু। কিন্তু কেন, মনে হয় না সে কথা তারা জানে। আজ রাতে আমরা ফুর্তি করতে বেরিয়েছি বলে তারা জানতে পারলে কোন ক্ষতি নেই। শনিবার রাতে ইংল্যান্ডের এক বন্ধুর সঙ্গে ফুর্তি করতে না-বেরোনোটা অস্বাভাবিক।
পেছনদিককার জানালা দিয়ে জনাকীর্ণ পথের দিকে তাকাল বন্ড। একটা ট্রাম থেমে ছিল। তার পেছনে মিনিটখানেকের জন্য দেখা গেল একটা মোটর স্কুটার। তারপর একটা ট্যাক্সি সেটাকে আড়াল করে দিল। বন্ড মুখ ফেরাল। তার মনে পড়ল রাশি রাশি টাকা আর সাজ-সরঞ্জাম দিয়ে রুশীরা তাদের চরচক্র চালায়। কিন্তু ইংল্যান্ডের গুপ্তচর দপ্তর তাদের বিরুদ্ধে খাড়া করেছে খুব অল্পসংখ্যক দুঃসাহসী মানুষ, বেতন যাদের কম–এই করিমের মত লোককে, যার আছে একটা সেকেন্ড হ্যান্ড রোলস্ আর সাহায্যের জন্য তার সন্তানরা। তা সত্ত্বেও তুরস্কে করিমের অগাধ প্রতিপত্তি। সম্ভবত সঠিক মেশিনের চেয়ে সঠিক মানুষের প্রয়োজনীয়তা বেশি।
সাড়ে আটটায় ইস্তাম্বুলের বাইরের দীর্ঘ পাহাড়ের মাঝপথে একটা ম্যাড়মেড়ে গাছের খোলামেলা কাফের সামনে তারা থামল। সেই ল্যামব্রেটার জন্য তারা অপেক্ষা করতে লাগল। কিন্তু সেটার মৃদু গুনগুনানি তখন থেকে গেছে। সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে পাহাড়টার নিচের দিকে নামতে শুরু করল। মুহূর্তের জন্য ড্রাইভারটা তাদের নজরে পড়ল–বেঁটে হোল্কা চেহারায় একটা লোক চোখে গগলস্।
কাফের মধ্যে করিম পথ দেখিয়ে চললেন। প্রথমে মনে হয়েছিল জায়গাটা ফাঁকা। কিন্তু হঠাৎ কাউন্টার সংলগ্ন টাকা পয়সা রাখার দেরাজের পেছন থেকে একটা লোক আচমকা উঠে দাঁড়াল। একটা হাত তার কাউন্টারের নিচে। করিমকে দেখে লোকটা নার্ভাসভাবে মৃদু হাসল। কাউন্টারের পেছন থেকে বেরিয়ে বিছানো পথ ধরে তাদের সে নিয়ে এল উঁচু দেওয়ালটার একটা দরজার সামনে। একবার টোকা দিয়ে দরজাটা সে খুলল, তারপর ইঙ্গিতে বলল ভেতরে যেতে।
ভেতরে একটা ফল-বাগান। গাছের তলায় এখানে-ওখানে কাঠের টেবিল। মাঝখানে গোল একটা নাচের জায়গা। সেটার চারদিকে বাঁশের আগায় ঝুলছে নানা রঙের লণ্ঠন। এখন সেগুলো নেভানো। দূরে লম্বা একটা টেবিলে নানা বয়সের মানুষ খাচ্ছিল। ছুরি নামিয়ে তারা দরজার দিকে তাকাল। টেবিলের পেছনে ঘাসের ওপর কয়েকটি বাচ্চা ছেলে মেয়ে খেলা করছিল। তারাও খেলা থামিয়ে চুপচাপ দেখতে লাগল। প্রায় পরিপূর্ণ চাঁদের আলোয় সবকিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
করিম আর বন্ড এগিয়ে গেল। টেবিলের শীর্ষ স্থানের যে লোকটি বসেছিল অন্যদের কি-একটা বলে তার কাছে সে এগিয়ে এল। বাকি সবাই আবার ডিনার খেতে শুরু করলে, বাচ্চারাও শুরু করল খেলতে।
করিমকে গম্ভীরভাবে অভিবাদন জানিয়ে সে অনেকক্ষণ ধরে কি সব বলল। মন দিয়ে শুনতে শুনতে মাঝে-মাঝে করিম প্রশ্ন করতে লাগলেন।
এই জিপসির চেহারাটা বিরাট। কালো লম্বা ঝুলন্ত গোঁফ জোড়া লাল ঠোঁট দুটিকে প্রায় ঢেকে ফেলেছে। চোখ দুটো হিংস্র আর নিষ্ঠুর। নাকে সিফিলিসের ছাপ। ডান হাতের বুড়ো আঙ্গুলে সোনার আংটি।
জিপসির কথা শেষ হল। বন্ড সম্বন্ধে করিম তাকে কিছু বললেন, স্পষ্টতই সেগুলো প্রশংসার কথা। হঠাৎ সে ঝুঁকে পড়ে করিম ও বন্ডকে অভিবাদন জানান। হেসে উঠে বন্ডের দিকে ফিরে করিম বললেন, কখনো যদি বেকার হয়ে পড়, এর কাছে গেলে কাজ দেবে–তার মেয়েদের পোষ মানাবার আর তার হয়ে মানুষ খুন করার কাজ। বিদেশীদের পক্ষে এটা মস্ত প্রশংসা।
বল, এসব ব্যাপারে ওর কোন রকম সাহায্যের দরকার আছে বলে আমি ভাবি না।
করিম অনুবাদ করে দিলেন। সবিনয়ে জিপসি দাঁত বের করে হাসল। কি-একটা বলে সজোরে তালি বাজাল। উঠে দুজন মেয়ে তার কাছে এল। ধমকের সুরে কি বলতে তারা টেবিলের কাছে গিয়ে বড় একটা মাটির প্লেট তুলে গাছগুলোর মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল।
নিয়ে গেলেন বন্ডের হাত ধরে, করিম তাকে এক পাশে নিলেন। বললেন, একটা ঝামেলার রাতে আমরা এসেছি এদের মধ্যে। এমন একটা পারিবারিক গণ্ডগোল বেধেছে যেটার নিষ্পত্তি করা হবে নির্মম এবং গোপনীয়ভাবে। আমি এদের পুরানো বন্ধু। তাই এদের সঙ্গে খেতে হবে। বাজে খাবার বলে আমি রাকি আনতে বলছি। আশা করি, দোস্ত ব্যাপারটা বুঝতে পেরেছ। বন্ডের হাতে করিম আরো একটু জোরে চাপ দিলেন। যাই দেখ না কেন–তুমি লড়বে না। কোন মন্তব্য করবে না। খানিক আগে ন্যায়বিচারের আদালত বসেছিল। এরা প্রেম আর ঈর্ষার ব্যাপারকে ন্যায়বিচার বলে। এই উপজাতির দুটি মেয়ে লোকটার এক ছেলের প্রেমে পড়েছে। বাতাসে যেন মৃত্যুর আভাস পাচ্ছি। ছেলেটাকে পাবার জন্য দুটো মেয়েই পরস্পরকে খুন করার চেষ্টা করছে। এই নিয়ে এই উপজাতির মধ্যে বহু তর্কাতর্কি হয়েছে। তাই ছেলেটাকে পাহাড়ে পাঠানো হয়েছে। আজ রাতে মেয়ে দুটো একটা ফয়সালা করবে। যে জিতবে ছেলেটা তাকে গ্রহণ করবে বলে কথা দিয়েছে। আমাদের উপস্থিত থাকতে দিয়ে এরা আমাদের গভীর সম্মান দেখিয়েছে। বুঝলে তো? আমরা বিদেশী। কক্ষনো কিছুতে বাধা দেবে না। বাধা দিলেই এরা তোমাকে খুন করবে, সম্ভবত আমাকেও।
