রবারের আই পীসে করিম চোখ রাখলেন। তারপর উত্তেজিত হয়ে বললেন, দরজা খুলছে। শিগ্গির এস, এখানে চোখ রাখ। মেয়েটি আসছে।
ফ্রম রাশিয়া উইথ লাভ (পার্ট ২)
সময় কাটানো
সেই দিন সন্ধ্যে সাতটা। জেমস বন্ড তার হোটেলে ফিরে প্রথমে গরম, তারপর ঠাণ্ডা পানি দিয়ে গোসল করে নিল।
তার পরনে শর্টন। গা খালি। ঘরের একটা জানালার পাশে বসে টনিক মেশানো ভদকা একটু একটু করে চুমুক দিয়ে খেতে খেতে, গোল্ডেন হর্নের পেছনকার সূর্যাস্তের দিকে সে তাকিয়ে ছিল।
সে ভাবছিল সেই দীর্ঘাঙ্গী সুন্দরী মেয়েটির কথা, যার চলার মধ্যে নর্তকীর ছন্দ। হাতে এক টুকরো কাগজ নিয়ে মেটে রঙের দরজা দিয়ে ঢুকে তার কর্তার হাতে সেটা দিয়েছিল। ঘরের সবাই তার দিকে তাকাতে লজ্জায় তার মুখ লাল হয়ে ওঠে। সেই মানুষগুলোর চাহনির অর্থ কি? সুন্দরী মেয়ের দিকে সবাই যেভাবে তাকায় সেটা ছাড়াও তাদের চাহনির মধ্যে ছিল কৌতূহল। সেটা বোঝা যায়। তারা জানতে চেয়েছিল সাংকেতিক বার্তায় কি খবর আছে, কেন তাদের আলোচনায় বাধা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু আর কি ছিল? আর ছিল একটু ধূর্ত ঘৃণার ভাবলোক, যেভাবে তাকায় গনিকার দিকে।
দৃশ্যটা কেমন যেন খাপছাড়া আর হেঁয়ালিময় ধরনের। সেটা ছিল একটা অত্যন্ত সুশৃঙ্খল আধা-সামরিক সংগঠনের একাংশ। এই মানুষগুলো সেই সংগঠনের অফিসার। প্রত্যেকেই অন্যের সম্পর্কে সতর্ক। মেয়েটি সেখানকার এক কর্মচারি মাত্র, যার পদ কর্পোরালের। কেন তারা খোলাখুলি ওরকম ঘৃণার দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে ছিল–যেন সে একজন ধরা-পড়া গুপ্তচর, যাকে হত্যা করা হবে? মেয়েটিকে কি তারা সন্দেহ করে? হাবে-ভাবে তার মনের কথা কি তারা টের পেয়েছে। কিন্তু পরের ঘটনা থেকে সেটা মনে হয় না। রেসিডেন্ট ডিরেক্টর সাংকেতিক বার্তাটা যখন পড়তে থাকে, তারপর ডিরেক্টর কি যেন প্রশ্ন করে। মেয়েটির মুখ টকটকে লাল হয়ে ওঠে। সে ঘাড় নেড়ে চোখ নামায়। অন্য লোকেরা মৃদু হেসে তাকে উৎসাহ দেয়। সেই হাসির মধ্যে কোন সন্দেহ, কোন দোষারোপ ছিল না। শেষটায় ডিরেক্টর কয়েকটা কথা বলে। তার উত্তরে মেয়েটি যেন বলে, ইয়েস, স্যার। তারপর সে ঘর থেকে বেরিয়ে যায়। মেয়েটি চলে যেতে ডিরেক্টর আবার কি যেন বলে। লোকগুলো সেটা শুনে প্রাণ খুলে হাসে। তারপর তারা আবার শুরু করে নিজেদের কাজ।
ক্রমাগত এই মৌন দৃশ্যের অর্থ খোঁজার চেষ্টা করেছে বন্ড। অস্তোমুখ সূর্যের দিকে যখন সে তাকাল তখন সে কোন অর্থ খুঁজে পায়নি। বন্ড প্লাস শেষ করে আর একটা সিগারেট ধরাল। সমস্যাটার কথা ছেড়ে সে ভাবতে শুরু করল মেয়েটির কথা।
তাতিয়ানা রোমানোভা! বাস্তবিকই তাকে রুশ সম্রাজ্ঞীর মত দেখতে। তার দীর্ঘ শরীর, ঘন চুল, গার্বোর মত মুখ, দীর্ঘ গভীর নীল চোখ–সবকিছুই সম্রাজ্ঞীর মত। সে কি কুমারী? বন্ডের মনে হল না। তার উদ্ধত স্তন, তার ছন্দময় নিত দেখে স্পষ্ট বোঝা যায় নিজের শরীর সম্পর্কে সে পূর্ণ সচেতন, সেই শরীরের সার্থকতা তার জানা।
বন্ড যা দেখেছিল তা থেকে কি সে বিশ্বাস করতে পারে, ফটো আর ফাইল দেখে কারোর প্রেমে পড়ার মত এই মেয়ে? কে বলতে পারে! এ-ধরনের মেয়েরা ভারি রোমান্টিক প্রকৃতির হয়। তাতিয়ানার চোখে ছিল স্বপ্ন, মুখে ছিল স্বপ্ন। বয়েস তার চব্বিশ। এখনো সোভিয়েত যন্ত্র তার ভেতর থেকে নিশ্চয়ই সব প্রবণতাকে নিংড়ে বের করে দিতে পারেনি। তাকে দেখে মনে হয় না তার কাহিনীটা মিথ্যে। বন্ড আন্তরিকভাবে চাইল সেটা যেন মিথ্যে না হয়।
টেলিফোন বেজে উঠল। করিমের কণ্ঠস্বর, নতুন কোন খবর আছে?
না।
আমি না হয় তোমাকে সন্ধ্যা আটটায় তুলে নেব।
আমি তৈরি থাকব।
সেই সন্ধ্যায় বন্ডকে বাইরে নিয়ে যাবার ব্যাপারে করিম দৃঢ় প্রতিজ্ঞ ছিলেন। বন্ড চেয়েছিল হোটেল থেকে প্রথমে যোগাযোগের জন্য অপেক্ষা করতে কোন চিঠি, টেলিফোন, যাই হোক না কেন। কিন্তু করিম বলেছিলেন না। মেয়েটি দৃঢ়স্বরে জানিয়েছিল–দেখা করার সময় এবং জায়গা নিজে সে বেছে নেবে। মেয়েটির সময় ও সুযোগের জন্য বন্ড যে সাগ্রহে অপেক্ষা করছে সেটা দেখানো ভুল হবে। করিম জোর দিয়ে বলেছিলেন, দোস্ত, মনঃস্তত্ত্বের দিক দিয়ে সেটা খারাপ। কোন মেয়ে চায় না তু-তু করে ডাকলে লোকে তার পেছন-পেছন ছোটে। নিজেকে খেলো করলে তাতিয়ানা তোমাকে ঘৃণা করবে। তোমার ফাইল আর ফটো দেখে নিশ্চয়ই তার মনের ধারণা হয়েছে তুমি খুব-একটা কৌতূহল প্রকাশ করবে না–এমন কি তোমার ব্যবহারের মধ্যে হয়ত খানিকটা ঔদ্ধত্য দেখা দেবে। সেটাই সে আশা করে। চোখ মটকে করিম বলে চললেন, কাকুতি-মিনতি করে তোমার নিষ্ঠুর মুখ থেকে একটা চুমু সে কিনতে চায়। কল্পলোকের একটি মানুষের প্রেমে সে পড়েছে। সেই কল্পলোকের মানুষের মতই হাবভাব দেখাও। সেই ভূমিকায় অভিনয় করে চল।
কাঁধ ঝাঁকিয়ে বন্ড বলছিল, বেশ, তাই করব, ডার্কো। মনে হয় তোমার কথাই ঠিক। কি করা উচিত বলে মনে হয়?
স্বাভাবিক অবস্থায় যা করতে তাই কোরো। এখন হোটেলে ফিরে গোসল করে সামান্য ড্রিঙ্ক কোরো। টনিক পানি মিশিয়ে খেলে এখানকার ভদ্কা খারাপ লাগবে না। যদি কিছু না ঘটে তাহলে সন্ধ্যা আটটায় তোমাকে আমি তুলে নেব। এক জিপসি বন্ধুর বাড়িতে আমরা ডিনার খাব। লোকটার নাম ভা। সে একটা উপজাতির সর্দার। তার সঙ্গে আজ রাতে আমাকে দেখা করতেই হবে। যারা তোমাকে গোপন খবর সরবরাহ করে সে তাদের একজন। কে আমার অফিস বোমা দিয়ে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করেছিল তার খোঁজ করছে সে। তার দলের কয়েজন মেয়ে তোমাকে নাচ দেখাবে। আমি চাই না তার চেয়ে ঘনিষ্টভাবে তারা তোমার মনোরঞ্জন করে। তোমার তলোয়ারকে শানিয়ে রেখো।
