করিম বললেন, একদিন এই ইঁদুরগুলো মরতে শুরু করবে তখন ইস্তাম্বুলে আবার প্লেগ দেখা দেবে। এ সুড়ঙ্গটার
কথা কর্তৃপক্ষ জানলে তারা পরিষ্কার করতেন। কিন্তু যতদিন রুশীরা এখানে আছে ততদিন জানাতে পারব না।
ছাদের দিকে, তারপর নিজের ঘড়ির দিকে তাকালেন, আর পাঁচ মিনিট। এবার চেয়ার টেনে নিজেদের কাগজপত্র। পরীক্ষা করতে শুরু করবে ওরা। MGB-র তিনজন স্থায়ী প্রতিনিধি সেখানে থাকবে। তাদের মধ্যে হয়ত-বা একজন। GRU অর্থাৎ সামরিক গোয়েন্দা দফতরের একজন। হয়ত আরো তিনজন থাকবে। দিন পনের আগে একজন গ্রীস, অপরজন ফরাসি এসেছে। আর একজন এসেছে সোমবারে। মাঝে মাঝে তাতিয়ানা নামে মেয়েটা এখানে সাংকেতিক বার্তা নিয়ে আসে। তাকে দেখলে তুমি মুগ্ধ হবে।
চোর কুঠরির ছাদ থেকে ঝুলন্ত ত্রিপলে ঢাকা সাবমেরিনের ঝকঝকে পেরিস্কোপের একটা অংশ করিম টেনে নামালেন।
মৃদু হেসে বন্ড বলল, ডার্কো, এটা কোথা থেকে জোগাড় করলে?
টার্কিশ নেভি। লড়াইয়ের বাড়তি মাল। লন্ডনের ব্রাঞ্চ এখন চেষ্টা করছে এটার সঙ্গে তার লাগিয়ে কথা শোনার জন্য। এটার ওপরের লেন্সটা সিগারেট-লাইটারের চেয়ে বড় নয়। তুললে এটা তাদের ঘরের মেঝে পর্যন্ত উঠে উঁকি মারে। ঘরের কোণে ওঠে এটা। সেখানে আমরা একটা ইঁদুরের গর্ত করেছি। একবার দেখতে গিয়ে নজরে পড়ে এক। টুকরো পনীর আটকানো বড়সড় ইঁদুর ধরার একটা কল। কিন্তু লেন্সটা পাশে শব্দ ধরার সূক্ষ্ম কোন যন্ত্র বসাবার জায়গা। নেই। পাবলিক ওয়ার্কস মিনিস্ট্রিতে আমার কয়েকজন বন্ধু আছে। তাদের সাহায্যে কয়েকদিনের জন্য রুশীদের সরিয়ে যন্ত্রটা আমি বসিয়েছিলাম। তাদের বলা হয়েছিল, পাহাড়টার ওপরে ওঠার সময় ট্রামগুলো নানা বাড়ির ভীকে বড় বেশি নাড়া দেয়। তাই একটা জরিপ করা দরকার। তার জন্য কয়েকশ পাউন্ড ঘুষ দিতে হয়। পাবলিক ওয়াকর্স -এর লোকেরা দু পাশের বাড়ি পরীক্ষা করে জানায়, জায়গাটা নিরাপদ। ততদিনে আমি নির্মাণের কাজ শেষ করে ফেলি। রুশীরা ফিরে এসে কোন মাইক্রোফোন বা বোমা লুকানো আছে কিনা খুঁজেছিল। ০ ব্রাঞ্চ নতুন কোন মতলব না করতে পারলে রুশীদের ওপর নজর রাখা ছাড়া আর কিছুই করতে পারব না। হয়ত এমন কাউকে তারা জিজ্ঞাসাবাদ করবে যার সম্বন্ধে আমরা কৌতূহলী।
এই চোর কুঠরির ছাদে পেরিস্কোপের পাশে ফুটবলের দ্বিগুণ আকৃতির ধাতুনির্মিত গোলাকার একটা জিনিস ছিল। বন্ড বলল, ওটা কি?
একটা বড় বোমার তলার অর্ধেক অংশ। আমার কোন বিপদ ঘটলে কিংবা রাশিয়ার সঙ্গে যদি লড়াই বাঁধে তাহলে অফিস থেকে রেডিও কন্ট্রোলে ঐ বোমাটা ফাটানো হবে। তাতে বহু নিরীহ লোক মারা পড়বে। কিন্তু রক্ত গরম হলে মানুষ প্রকৃতির মতই নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে। পেরিস্কোপের হ্যাঁন্ডেলের পাশে চোখ লাগানোর আই পীস জোড়া পরিষ্কার করে করিম তাকিয়ে ইশারায় বন্ডকে ডেকে বললেন, ওখানে সেই ছ জনই রয়েছে।
বন্ড সরে এসে হ্যান্ডেল ধরল।
করিম বললেন, ওদের ভাল করে চিনে রাখ। টেবিলের শেষপ্রান্তে রেসিডেন্ট ডিরেক্টর। বাঁ দিকে তার দু জন। কর্মচারি। তাদের উল্টো দিকে তিনজন নবাগত। সবচেয়ে শেষে যে এসেছে সে ডিরেক্টরের ডানদিকে বসে। নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা ছাড়া আর কিছু করলে আমাকে বোলো।
আই পীসের মধ্য দিয়ে প্রথমে বন্ডের নজরে পড়ল অনেকগুলো পা। তারপর সেই পায়ের মালিকদের মাথাগুলো। ডিরেক্টর আর দুজন সহকর্মীকে স্পষ্ট দেখা গেল–গম্ভীর রুশীমুখ।
কিন্তু নবাগত তিনজন পিঠ ফিরিয়ে বসেছিল বলে তাদের দেখতে পেল না। সবচেয়ে যে কাছে ছিল তার চুলগুলো কদম ছাঁট, বয়সে সবচেয়ে ছোট। তার পাশের লোকের মাংসল মসৃণ কাঁধে একটা দগদগে ফোঁড়া। রেসিডেন্ট ডিরেক্টরের ডান পাশের নবাগত লোকটি কথা বলতে শুরু করল। ঘরের মধ্যে একজন সিগারেট টানছিল, বন্ডের মনে হল মস্কো থেকে তাকে পাঠানো হয়েছে। ক্লান্ত হয়ে বন্ড আই পীস থেকে সরে চোখ রগড়াতে লাগল।
বিষণ্ণভাবে মাথা নাড়িয়ে করিম বললেন, ওদের কথাগুলো হীরের মত দামী, যদি শুনতে পেতাম।
বন্ড বলল, শুনতে পেলে অবশ্য বহু সমস্যার সমাধান হত। কিন্তু ডার্কো, এই সুড়ঙ্গটা কি করে আবিষ্কার করলে? কেনই-বা এটা বানানো হয়েছিল?
করিম বললেন, হল অফ পিলার্সের এটা একটা লুপ্ত নালা। সেখানে এখন টুরিস্টরা শুধু যায়। সেটা আমাদের মাথার ওপরে সেন্ট সেফিয়ার কাছে। হাজার বছর আগে এই জলাশয় বানানো হয়েছিল, যাতে দশ লক্ষ গ্যালন পানি ধরে। চারশ বছর আগে গিলিয়াস নামে একজন আবার সেটা আবিষ্কার করে। একদিন আমি তার আবিষ্কারের কাহিনীটা পড়েছিলাম। সে বলেছিল, শীতকালে জলাশয়টা ভরা হত বিরাট একটা পাইপ দিয়ে। আমার ধারণা শহরটা শত্রুর কবলে পড়লে চটপট জলাশয়টা খালি করার জন্য নিশ্চয় আরেকটা বিরাট পাইপ কোথাও আছে। হল অফ পিলার্সে গিয়ে সেখানকার প্রহরীকে ঘুষ দিই, তারপর সারারাত ধরে আমরা এক ছেলের সঙ্গে রবারের নৌকায় থামগুলোর মধ্যে ঘুরে বেড়াই। দেওয়ালগুলোতে আমরা হাতুড়ি ঠুকে দেখি। এক জায়গায় ফাঁপা একটা শব্দ ভেসে আসে। পাবলিক ওয়ার্কসের মন্ত্রীকে আমি আরো ঘুষ দিই। পরিষ্কার করার জন্য এক সপ্তাহের জন্য জায়গাটা সে বন্ধ রাখে।
আমার দলবল কাজ শুরু করে দেয়। পানির ওপরে সেই ফাপা দেয়ালটা খুঁড়ে আমরা একটা খিলানের ওপর পৌঁছাই। সেই খিলানটা ছিল একটা সুড়ঙ্গের মুখ। সেই সুড়ঙ্গে ঢুকে আমরা নিচের দিকে নেমে যাই। সুড়ঙ্গটা সোজা চলে গিয়েছিল পাহাড়ের নিচে স্ট্রিট অফ বু -এর তলায়, যেখানে রুশীরা থাকে। তারপর বেরিয়েছিল গালাটা ব্রিজের পাশে, গোল্ডেন হর্নে জায়গাটা আমাদের গুদামের কয়েক গজ দূরে। তাই হল অফ পিলার্সে গর্তটা বুজিয়ে আমার দিক দিয়ে খুঁড়তে শুরু করি। রুশীদের অফিসের নিচে পৌঁছতে আমাদের প্রচুর জরিপের কাজ করতে হয়। এক বছর সময় লাগে। করিম হেসে বললেন, হয়ত কিছুদিনের মধ্যে রুশীরা তাদের অফিস বদলাবে। আশা করি, তখন T-র প্রধান অন্য কেউ হবে।
