দোস্ত মেয়েদের অদ্ভুত মনস্তত্ত্ব কে বুঝবে? মেয়েটাকে নিয়ে মা যখন ব্যস্ত আর জিপসি ভাষায় গালি শুনছিলেন– আমি তখন বাবার সঙ্গে দেখা করতে যাই। মেয়েটার কথা আমার মা কখনো জানাননি। বাবার কাছে তখন আরেকজন লোক ছিলেন। লম্বা ও শান্ত চেহারার এক ইংরেজ। তার একটা চোখে কালো ঠুলি। রুশীদের সম্বন্ধে তারা আলোচনা করছিলেন। ট্রেবিজোন্ড থেকে মাত্র পঞ্চাশ মাইল দূরে, বাটুমে, তাদের বিরাট তেল কারখানা আর নৌঘাটিতে কি সব ব্যাপার চলছে। বললেন, খবরের জন্য ভাল টাকা দেবেন। ইংরেজি আর রুশী দুটো ভাষাই জানতাম। বাবা স্থির করেছিলেন সেই ইংরেজ ভদ্রলোকের হয়ে আমাকে কাজ করতে হবে। দোস্ত, সেই ইংরেজ ভদ্রলোকটির নাম মেজর ড্যানসে। আমার আগে এই স্টেশনের কর্তা ছিলেন তিনি। বাকিটা তুমি অনুমান করে নিতে পারবে।
কিন্তু তোমার পেশাদার পালোয়ান হবার কি হল?
করিম বললেন, সেটা শুধু লোককে ভাওতা দেবার ব্যাপার। সীমান্তের মধ্য দিয়ে ভ্রাম্যমান সার্কাস দলের তুর্কীদের শুধু যেতে দেওয়া হত। সার্কাস দেখে রুশীরা বাঁচতে পারে না। আমি শেকল ভাঙতুম। দড়ি কামড়ে দাঁত দিয়ে ভারি ভারি ওজন তুলতাম। রাশিয়ার গ্রামে গ্রামে পালোয়ানদের সঙ্গে কুস্তি লড়ে জিততাম। তারপর মদ খাবার সময় অনেক গল্পগুজব করতাম। আমি বোকার ভান করে থাকতাম আবার বোকার মত প্রশ্ন করতাম, তারা হাসত।
লাঞ্চের দ্বিতীয় কোর্স এল, তার সঙ্গে এক বোতল মদ, সুস্বাদু কাবাব। করিম খেলেন ডিমের কুসুম দিয়ে মাখা লঙ্কা কুচি দেওয়া কাঁচা মাংস। সেটার এক চামচ বন্ডকে খাওয়ালেন। বন্ড জানাল সেটা ভারি সুস্বাদু।
সাগ্রহে করিম বললেন, রোজ এটা তোমার খাওয়া উচিত। যারা প্রেমিক তাদের পক্ষে ভারি উপকারী। আর তোমার কতকগুলি বিশেষ ব্যায়াম করা দরকার। বাবার মতই আমিও প্রচুর নারীদেহ ভোগ করি। কিন্তু তিনি মদ খেতেন না, ধূমপান করতেন না–যেগুলো আমি বেশি করি। কিন্তু এই অভ্যেসগুলো ভাল নয়। তাতে রক্ত মাথায় চড়ে যায়। কিন্তু জীবনের ওপর আমার বড় লোভ। সব সময় সব কিছু আমি খুব বেশি করে থাকি। বাবার মত আমিও একদিন হার্টফেল করব। আমার কবরের ওপরকার স্মৃতিপাথরে হয়ত লেখা থাকবে–খুব বেশি রকম বেঁচে এই মানুষটা মরেছে।
বন্ড হেসে বলল, খুব চটপট মরো না ডার্কো, M অসন্তুষ্ট হবেন। তোমার সম্বন্ধে তার উঁচু ধারণা।
তাই নাকি? তাহলে এখন মরব না। খাওয়া যাক, জেমস। আমার ডিউটির কথা মনে করিয়ে ভাল হয়েছে। নষ্ট করার মত সময় নেই। প্রতিদিন দুপুর আড়াইটের সময় রুশীদের যুদ্ধমন্ত্রণা সভা বসে। আজ তুমি আর আমি হাজির থাকব।
.
ইঁদুরের সুড়ঙ্গ
ঠাণ্ডা অফিস ঘরে ফিরে তারা কফির জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। করিম একটা দেওয়াল আলমারি খুলে ইঞ্জিনিয়ারদের নীল ওভারঅলের দুটো সেট বের করলেন। করিম ও বন্ড দুজনেই পোশাক বদলাল।
কফির সঙ্গে একজোড়া জোরাল টর্চ এনে হেড ক্লার্ক টেবিলে রাখল। ক্লার্ক চলে গেলে করিম বললেন, ও আমার বড় ছেলে। সোফার আর দারোয়ান আমার খুড়ো। অফিসের সব কেরানিরাই আমার ছেলে। একই বংশের লোকেরা অফিসের নানা কাজে থাকাটা নিরাপত্তার দিকে ভাল। মশলার কারবারটা আমাদের একটা মুখোশ। M এটা আমাকে জুটিয়ে দেন। এখন তুরস্কে আমিই প্রধান মশলা ব্যবসাদার । M যে টাকা আমাকে ধার দেন অনেকদিন আগেই আমি তা শোধ করে দিয়েছি। এই ব্যবসায় আমার সন্তানেরা শেয়ার হোল্ডার। যখন কোন গুপ্তচরের কাজের জন্য দরকার হয় তখন সবচেয়ে উপযুক্ত ছেলেকে আমি বেছে নিই। তাদের সবাইকেই আমি তৈরি করে নিয়েছি। তারা আমার আর M-এর জন্য প্রাণ দিতে প্রস্তুত। ছেলেদের বলেছি সৃষ্টিকর্তার ঠিক পরেই M-এর স্থান। এবার তুমি নিশ্চয়ই বুঝেছ যে তোমার ভার উপযুক্ত আর ভাল লোকের হাতে রয়েছে।
সে কথা আমি জানি।
একটা টর্চ বন্ডের হাতে দিয়ে করিম বললেন, এবার কাজ শুরু করা যাক।
কাঁচ লাগানো বই-এর আলমারির পেছনে করিম হাত দিয়ে খুট করে একটা শব্দ করলেন। আলমারিটা বাঁ দিকে সরে একটা দরজা বেরিয়ে গেল। একপাশে চাপ দিতেই সেটা ভেতর থেকে খুলে গেল। অন্ধকার সুড়ঙ্গ আর পাথরের সিঁড়ি, আর সঁাৎসঁাত অস্পষ্ট একটা দুর্গন্ধ।
করিম বললেন, আগে তুমি যাও। সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে অপেক্ষা কর, আমি দরজাটা বন্ধ করে আসি।
টর্চ জ্বালিয়ে বন্ড সিঁড়ি দিয়ে নিচে নামল। টর্চের আলোয় বন্ড দেখল রাজমিস্ত্রীর সাম্প্রতিক কাজ আর কুড়ি ফুট নিচেকার চকচেক পানি। নিচে নেমে বন্ড দেখল এক প্রাচীন পাথরের সুড়ঙ্গের মাঝখানের নর্দমা ভেতর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে। বন্ড অনুমান করল সেটা গোল্ডেন হর্নের নিচে বেরিয়েছে।
বন্ডের আলোর বাইরে শোনা গেল চাপা খুটখুট শব্দ। অন্ধকারে দেখা যাচ্ছে অসংখ্য বিন্দুর মত লাল আলোর স্ফুলিঙ্গ। বন্ডের দু পাশে কুড়ি গজের মধ্যে হাজার হাজার ইঁদুর বন্ডের গন্ধ শুকছিল।
হঠাৎ করিম তার পাশে এসে দাঁড়িয়ে বললেন, অনেকটা চড়াই পথ। যেতে পনের মিনিট লাগবে। আশা করি, জন্তু-জানোয়ার তুমি ভালবাস। সুড়ঙ্গের মধ্যে করিমের বিকট হাসির শব্দে ইঁদুরগুলো ছুটতে লাগল।
খাড়া চড়াই পথ ধরে তারা উঠতে লাগল। ইঁদুর আর বাদুড়ের বোটকা গন্ধ। ছাদ থেকে বাদুড় ঝুলছে। তাদের মাথার সংস্পর্শে তারা কিচকিচ্ শব্দ করে চেঁচিয়ে উঠল। মাঝে মাঝে করিম টর্চ ফেলতে লাগলেন। আলো দেখে তারা ভয় পায়। তারা দুজনেই টর্চের আলো বন্দুকের গুলির মত পেছন দিকে ফেলতে লাগল। পনের মিনিটে তারা গন্তব্যস্থলে পৌঁছল–একটা চোরা কুঠরি। ছাদ থেকে ত্রিপল জড়ানো কি-একটা ঝুলছে।
