ঠাণ্ডা সিঁড়ি ভেঙে বন্ড ছোট ঘরে পৌঁছল। ওয়েটার তাকে করিমের কাছে নিয়ে গেল। করিম দরাজ গলায় বন্ডকে স্বাগত জানালেন। তার হাতে বরফ কুচি দেওয়া সাদা তরল পদার্থে ভরা একটা গ্লাস।
দোস্ত, এসে গেছ! এক্ষুনি এক গ্লাস রাকি খাও। ঘুরে বেড়িয়ে নিশ্চয়ই খুব ক্লান্ত হয়েছ।
চেয়ারে আরাম করে বসার পর ওয়েটার বন্ডের হাতে ছোট একটা গ্লাস দিল। করিমের দিকে গ্লাসটা তুলে শেষ করার সঙ্গে সঙ্গে বন্ডের গ্লাস ভরে দিল ওয়েটার।
এবার লাঞ্চের অর্ডার দেওয়া যাক। তুরস্কে দুর্গন্ধ জলপাই তেলে রাধা জন্তু জানোয়ারের নাড়িভুড়ি ছাড়া লোকে আর কিছু খায় না। কিন্তু রান্না ভাল।
মৃদু হেসে ওয়েটার কয়েকটা খাবারের নাম করল।
করিম বললেন, ছোকরা বলছে আজকের কাবাবটা খুব ভাল হতে পারে, যদিও ওর কথা বিশ্বাস হচ্ছে না। সুগন্ধী চাল দিয়ে কাঠ কয়লার আঁচে রান্না কচি ভেড়ার মাংস। তার মধ্যে প্রচুর পেঁয়াজ কুচি আছে। নাকি তোমার অন্য কিছু-ঝাল ঝাল পোলাও পছন্দ? প্রথমে সার্ডিন দিয়ে শুরু করা যাক। ওয়েটারকে খেঁকিয়ে অর্ডার দিলেন করিম। বন্ডের দিকে তাকিয়ে বললেন, এই হতভাগা লোকগুলোর সঙ্গে ঐভাবে কথা বলা দরকার। গণতন্ত্রের ভুয়া কথা শুনতে শুনতে এদের গলা কাঠ হয়ে গেছে। এরা চায় সুলতান আর লড়াই, নারী ধর্ষণ আর স্ফূর্তি। যাকগে, কোন খবর আছে?
বন্ড মাথা নাড়াল।
এক গ্লাস রাকি শেষ করে করিম বললেন, খেলাটা কোন জায়গা থেকে শুরু করা দরকার। আমি কয়েকটা চাল চেলেছি। লাঞ্চের পর শত্রু এলাকায় আমরা একটা ছোটখাটো হানা দেব। অবশ্যই আমাদের কেউ দেখতে পাবে না। মাটির তলা দিয়ে আমরা হানা দেব। এখন বল তুরস্ক তোমার কেমন লাগছে?
কাঁটায় বিধিয়ে এক টুকরো মাংস খেয়ে তারপর আধ গ্লাস রাকি। একটা সিগারেট ধরিয়ে মৃদু হেসে বললেন, আলোচনায় অন্য কোন বিষয় নেই তাহলে নিজের কথায় আসি। নিশ্চয়ই ভাবছ, এই তাগড়া পাগলা লোকটা কি করে গোয়েন্দা দপ্তরে এল। সংক্ষেপে বলি, একঘেয়ে লাগলে বলবে।
একটা ডিপ্লোমা সিগারেট ধরিয়ে বন্ড বলল, চমৎকার। শুরু করে দাও।
করিম বলে চললেন, আমি ট্রেবিজোন্ডের লোক। আমাদের ছিল বিরাট সংসার, অনেক জন মা। আর বাবা ছিলেন বিখ্যাত জেলে। কৃষ্ণসাগরে তার খ্যাতি ছিল। তিনি ধরতেন তরোয়াল মাছ। এই মাছ ধরা শক্ত, এই মাছের সঙ্গে লড়াই করা কঠিন। মানুষটা ছিলেন লম্বা চওড়া, রোমান্টিক ধরনের। তাই যে কোন মেয়েকে চাইতেন, পেতেন। স্বভাবতঃই তার ছিল বহু সন্তান। আমরা এক বিরাট পোভড়া বাড়িতে থাকতাম যেটাতে আমাদের সৎ-মা ভর্তি। আসলে এই সৎ-সার দল ছিলেন একটা হারেম–বাবার বিয়ে করা না করা বৌ। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন ইস্তাম্বুলের ইংরেজ গভর্নেস। একটা সার্কাস দেখতে গিয়ে বাবা তাকে দেখেন। দুজনেই দুজনকে পছন্দ করে। সেই সন্ধ্যেয় তাকে নিজের মাছ ধরার নৌকায় তুলে তিনি বসফোরাসে যান। ফেরেন ট্রেবিজোডে। বাবাকে ছাড়া সারা দুনিয়ার সব কথা নেই ইংরেজ গভর্নেস ভুলে যায়। লড়াই-এর ঠিক পরেই তিনি মারা যান। তখন তার বয়েস ষাট। আমার আগের যে সন্তান তার মা ছিলেন ইটালিয়ান। তার ছেলের নাম ছিল বিয়াঙ্কো, সে ছিল ফর্সা আর আমি ছিলাম কালো, তাই লোকে আমাকে ডার্কো বলে ডাকত। ছেলেবেলাটা আমরা পনেরজন ভাইবোন মিলে বেশ মজায় কাটাতাম। সম্মাদের মধ্যে প্রায়ই চুলোচুলি বাধত। জায়গাটা ছিল অনেকটা জিপসিদের শিবিরের মত। শিবিরের কর্তা ছিলেন আমরা বাবা। বেশি ঝামেলা বাধলে তিনি সবাইকে ঠেঙাতেন–ছেলেদেরও, সৎ মায়েদেরও। কিন্তু শান্তিতে থাকলে তার ব্যবহার খুব ভাল। এ ধরনের পরিবারের কথা বুঝতে পার?
যেভাবে বর্ণনা করছ তাতে পারি।
বাবার মতই লম্বা চওড়ায় আমি হই, শুধু তার চেয়ে বেশি শিক্ষিত। মা লেখাপড়া আর বাবা পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা শিখিয়েছেন। কুড়ি বছর বয়সে আমার নিজের নৌকোয় রোজগার করতে শিখলাম। কিন্তু আমি ছিলাম বেপরোয়া। আমি বাড়ি ছেড়ে সমুদ্র তীরে দুটো ঘর নিয়ে থাকতাম। এমন সব জায়গায় বান্ধবীদের সঙ্গে দেখা করতাম যাতে কেউ টের না পায়। হঠাৎ একবার বরাত খারাপ হল। আমি বান্ধবীদের মধ্যে এক বেসারবিয়ান মেয়ে–ভারি দজ্জাল, ইস্তাম্বুলের পাহাড়গুলোর পেছনে কতকগুলি জিপসির সঙ্গে মারপিট করে মেয়েটাকে জিতে নিই। তারা আমাকে ধাওয়া করে। মেয়েটিকে আমার নৌকায় তুলে নিই। আগে অবশ্য মাথায় বাড়ি দিয়ে তাকে অজ্ঞান করতে হয়।
ট্রেবিজোন্ডে যখন ফিরি তখনো সে আমাকে খুন করার চেষ্টা করছিল। তাই আমার ডেরায় নিয়ে সমস্ত জামা-কাপড় খুলে একেবারে উলঙ্গ করে টেবিলের নিচে শেকল দিয়ে তাকে বেঁধে রাখি। যখন খেতাম টেবিলের নিচে খাবারের টুকরো ছুঁড়ে দিতাম কুকুরকে যেমন দেয়। তার শেখা দরকার মনিব কে। আমার মা একদিন হঠাৎ আমার ডেরায় হাজির। তিনি বলতে এসেছিলেন বাবা আমার সঙ্গে দেখা করতে চান। মেয়েটাকে দেখে রেগে আগুন হয়ে আমাকে নানা গালাগালি দিলেন। বাড়ি থেকে নিজের কিছু জামা-কাপড় এনে মেয়েটাকে পরিয়ে দেন এবং বললেন মেয়েটাকে তার আত্মীয়দের কাছে ফিরিয়ে দিতে। কিন্তু যাবার সময় হলে মেয়েটা কিছুতেই যেতে চাইল না। হো-হো করে হেসে উঠলেন করিম।
