করিম বললেন, দোস্ত। এই প্রশ্নটা তো আমরাও। কিন্তু মেয়েদের মনের কথা কে বলতে পারে? তার চোখ দুটো জ্বলজ্বলে, ভারি সুন্দর নিষ্পাপ চোখ। তার স্বরের মধ্যে ছিল আকুলতা আর আতঙ্ক। স্টিমারের রেলিং খুব জোরে চেপে ধরায় আঙুলের গাঁটগুলো ফ্যাকাশে হয়েছিল। কিন্তু তার মনে কি ছিল? সে কথা সৃষ্টিকর্তাই জানেন। বন্ডের দিকে তাকিয়ে, কোন মেয়ে তোমাকে সত্যিই ভালবাসে কিনা সেটা অভিজ্ঞ না হলে কেউ বুঝতে পারবে না। দ্বিধাগ্রস্ত স্বরে বন্ড বলল, তা ঠিক। কি বলতে চাইছ বুঝেছি। সেটা একমাত্র জানা যায়–বিছানায়।
.
গুপ্তচরের পরিবেশ
আবার কফি এল। তারা দু জন চুলচেরা আলোচনা করার সময় ঘরের মধ্যে সিগারেটের ধোঁয়া ঘন হল। এক ঘণ্টা আলোচনার পরও তারা কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারল না। এই মেয়েটির সমস্যা বন্ডকেই সমাধান করতে হবে। তার কথা বিশ্বাস হলে মেশিন সমেত মেয়েটিকে বের করতে হবে এদেশ থেকে।
যাবতীয় ব্যবস্থার ভার নিলেন করিম। টেলিফোনে তিনি তার ট্রাভল এজেন্টকে আগামী সপ্তাহের জন্য দৈনিক সমস্ত প্লেনে দুটো করে সিট রিজার্ভ করে রাখতে বললেন–BEA, এয়ার ফ্রান্স, SAS এবং টার্কেয়ার-এ।
এবার তোমার পাসপোর্টের ব্যবস্থা করতে হয়। একটা হলেই চলবে। মেয়েটি তোমার স্ত্রী হিসাবে যেতে পারবে। আমার একজন কর্মচারি তোমার ফটো তুলবে আর মেয়েটির ফটো অন্য কোনভাবে জোগাড় করবে। আসলে গার্বোর কোন পুরানো ছবি দিয়েই চলবে এদের দুজনের চেহারায় মিল আছে। ফাইল থেকে সেরকম একটা ছবি জোগাড় করা যাবে। কনসাল জেনারেলের সঙ্গে আমি কথা বলব। খাসা মানুষ। রোমাঞ্চকর স্পট তার ভারি পছন্দ। আজ সন্ধ্যের মধ্যেই পাসপোর্টটা রেডি হবে। কি নাম নিতে চাও?
যে কোন একটা নাম বালাও না।
সমারসেট। আমার মায়ের দেশ। তোমার নাম হবে ডেভিড সমারসেট। পেশা–কোম্পানি ডিরেক্টর। আর মেয়েটির নাম হবে ক্যারোলিন। ছিমছাম ইংরেজ দম্পতি। দেশ ভ্রমণের শখ। ফিনান্স কন্ট্রোল ফর্ম? সে দায়িত্ব আমার। তাতে লেখা থাকবে ট্রাভলার্স চেকে আশি পাউন্ড। আর ব্যাংকের একটা রসিদ–তাতে উল্লেখ থাকবে তুরস্কে থাকার সময় পঞ্চাশ পাউন্ড তুমি ভাঙিয়েছিলে। কাস্টমস? তারা কিছুই পরীক্ষা করে দেখে না। এ দেশে কেউ কিছু কিনলেই তারা খুশি। যদি খুব চটপট এদেশ ছাড়তে চাও তা হলে তোমার হোটেলের বিল আর মালপত্র আমার জিম্মায় দিও। প্যালেস হোটেলের লোকেরা আমাকে খুব ভালভালো চেনে। আর কিছু আছে?
আর তো কিছু মনে পড়ছে না।
করিম ঘড়ি দেখলেন, বারোটা, গাড়িতে হোটেলে ফেরার সময় হয়েছে। সেখানে তোমার কোন সংবাদ থাকতে পারে। তোমার জিনিসপত্রগুলো পরীক্ষা করে দেখ কেউ হাতড়েছে কিনা।
ঘণ্টা বাজিয়ে করিম তার হেড ক্লার্ককে কি সব নির্দেশ দিলেন, তারপর বন্ডের সঙ্গে দরজার কাছে এগিয়ে এলেন। আবার সেই আন্তরিক করমর্দন। গাড়িটা তোমাকে লাঞ্চের জন্য নিয়ে আসবে। স্পাইস বাজারে ছোট্ট একটা জায়গা। তোমার সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করতে আমার ভাল লাগছে।
করিমের হেডক্লার্ক বন্ডকে একটা সর্বাধুনিক ধরনের ডার্ক-রুম আর ল্যাবরেটরির মধ্যে নিয়ে এল। দশ মিনিট পরে বন্ড বেরিয়ে এল পথে। রোলসটা এগিয়ে এল।
ক্রিস্টাল প্যালেসে এখন নতুন দ্বাররক্ষী। দু হাত প্রসারিত করে সে বলল, ক্ষমা করবেন, স্যার। আমার সহকর্মী আপনাকে একটা খুব বাজে ঘর দিয়েছে। সে জানত না আপনি করিম-বের বন্ধু। ১২ নম্বর ঘরে আপনার জিনিসপত্র রাখা হয়েছে। এ ঘরটা হোটেলের সবচেয়ে ভাল ঘর। এ ত্রুটির জন্য ক্ষমা করবেন, স্যার।
বন্ড বলল, চল, এই নতুন ঘরটা দেখি। যে ঘরে ছিলাম সেটা তো বেশ ভালই।
নিশ্চয়ই দেখবেন, মাথা নিচু করে সে বন্ডকে লিফটের কাছে নিয়ে এল। দ্বাররক্ষী দরজা খুলে সরে দাঁড়াল।
বন্ডকে মানতেই হল ঘরটা খুবই ভাল। বড় বড় দুটো জানালা, ওপাশে একটা ঝুল বারান্দা। মেঝেতে চমৎকার বোখারো কার্পেট, ঝাড় লণ্ঠন ঝুলছে। বিরাট খাট। ঘরটা বন্ড নেবে বললে দ্বাররক্ষী সকৃতজ্ঞভাবে মাথা নিচু করে অভিবাদন জানিয়ে বেরিয়ে গেল।
বন্ড ঘরটা খুটিয়ে দেখল। ঘরটা সে নেবে না কেন? সেখানে মাইক্রোফোন আর গুপ্ত দরজা রেখে কি লাভ?
ছোট আলমারির ওপর তার স্যুটকেসটার তলায় কোন আঁচড়াবার দাগ নেই। হাতলটার ওপর সামান্য তুলোর রোয়া সে লাগিয়েছিল সেটাও ঠিক আছে। সুটকেস খুলে ছোট অ্যাটাচিকেসটা দেখে বুঝল কেউ সুটকেস ঘটেনি।
এবার সে মুখ হাত ধুয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামল। তার কোন খবর আসেনি জানিয়ে দ্বাররক্ষী তাকে অভিবাদন জানিয়ে রোলস-এর দরজাটা খুলল। লোকটার চোখে কি যেন একটা ষড়যন্ত্রের আভাস। খেলা যে জাতেরই হোক না কেন খেলে যেতেই হবে। এই ঘর বদলে নিয়ে খেলাটা শুরু হয়েছে।
গাড়ি ছুটছে আর বন্ড ভাবল ডার্কো করিমের কথা। স্টেশন T-র প্রধান হিসেবে মানুষটা কেমন যেন বেমানান। নিজের বিপুল প্রাণশক্তি তার কাছে অন্যদের টেনে আনে। সবার বন্ধু হয় সে। কোথা থেকে লোকটা এসেছে? গোয়েন্দা দপ্তরে কি করে ঢুকল?
সরু গলিপথ দিয়ে সোফার তাকে নিয়ে এল পাথর বাঁধানো একটা সিঁড়ির সামনে। বলল, স্যার, বাঁ দিকের শেষের ঘরটায় করিম বে আছেন। তার নাম করলেই যে কেউ তার কাছে আপনাকে নিয়ে যাবে।
