কিন্তু আমার এই আসবার খবর সবাইকে জানানোর কি দরকার ছিল? মৃদু স্বরে বন্ড বলল। তোমাকে এ ব্যাপারের সঙ্গে মোটেই আমি জড়াতে চাই না। এয়ারপোর্টে রোলটা কেন পাঠিয়েছিলে? তাতে স্পষ্ট বোঝা যায় আমার সঙ্গে তুমিও আছ।
হো-হো করে হেসে করিম বললেন, কতগুলো কথা তোমাকে বলি। সেগুলো তোমার জন্য দরকার। সব হোটেলেই আমাদের রুশীদের আর আমেরিকানদের ভাড়াটে লোক আছে। এখানকার গোয়েন্দা পুলিশের সদর দপ্তরের এক অফিসারকে আমরা সবাই ঘুষ দিই। প্লেনে, ট্রেনে বা জাহাজে প্রত্যহ যে সব বিদেশী এখানে পৌঁছাচ্ছে তাদের নামের লিস্ট একটা কার্বন কপি করে আমাদের সবাইকে সে পাঠায়। আর কয়েকটা দিন হাতে পেলে আমি তোমাকে গ্রীক সীমান্ত দিয়ে লুকিয়ে আনতে পারতাম। কিন্তু তাতে লাভ হত কি? তুমি যে এসেছ সেটা অন্যপক্ষের জানা দরকার; যাতে আমাদের বান্ধবী তোমার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারে। তোমার সঙ্গে দেখা করিয়ে দেওয়ার শর্ত করিয়ে নিয়েছে। হয়ত আমাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থার ওপর তার বিশ্বাস নেই। তার মনের কথা কে বুঝবে? কিন্তু একটা ব্যাপারে মেয়েটি নিশ্চিত। আমাকে বলেছিল তুমি পৌঁছবার সঙ্গে সঙ্গে তাদের দপ্তর খবরটা জানতে পারবে।–কথাটা আমি যেন জানি না। করিম তার কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলে, তাই মেয়েটির কাজ কঠিন করে তোলবার দরকার কি? আমি শুধু চাই তুমি যতদিন এখানে আছ ততদিন অন্তত যেন আরামে থাক।
বন্ড হেসে বলল, ব্যাপারটা জানা ছিল না। জানলে প্রশ্ন করতাম না। এখানে আমি তোমার অধীনে, তোমার কথামত আমাকে চলতে হবে। যা বলবে তাই করব।
করিম অন্য বিষয়ে কথা পাড়লেন। তোমার কথায় আসা যাক। তোমার হোটেলটা কেমন? প্যালেস হোটেল ঠিক করেছ জেনে আমি অবাক হয়েছিলাম। জায়গাটা ভারি নোংরা। তাছাড়া রুশীদের আড্ডা। অবশ্য তাতে কিছু আসে যায় না।
হোটেলটা খুব একটা খারাপ নয়। ইস্তাম্বুল হিলটন কিংবা ঐ জাতের কোন শৌখিন হোটেলে থাকতে আমি চাইনি।
টাকার দরকার। একটা ড্রয়ার খুলে করিম এক তাড়া নতুন নোট বার করলেন। এই নাও এক হাজার টার্কিশ পাউন্ড। এগুলোর আসল কালো বাজারী রেট এক পাউন্ডে কুড়ি। সরকারি রেট সাত। এগুলো শেষ হলে বলবে। যত চাও দেব। খেলাটা শেষ হলে হিসেবপত্র করা যাবে। আর কি দরকার? সিগারেট। শুধু এই সিগারেটগুলো খেয়ো। তোমার হোটেলে কয়েক শ প্যাকেট পাঠিয়ে দেব। কাজের কথা পাড়ার আগে আর কোন কথা আছে? তোমার খাবার। আর অবসর সময় কাটানোর চিন্তা কর না। এ দুটো ব্যাপারেই আমি দেখাশোনা করব। আর একটা কথা–কিছু মনে করো না–যতদিন এখানে আছ ততদিন আমি তোমার কাছাকাছি থাকব।
বন্ড বলল, আর কিছু চাই না। একদিন শুধু লন্ডনে এস।
দৃঢ়স্বরে করিম বললেন, কখনো না। সেখানকার আবহাওয়া আর মেয়েরা ভারি ঠাণ্ডা। যাকগে, তুমি এখানে এসেছ বলে আমি গর্বিত। লড়াইয়ের সময়কার কথা আমার মনে পড়ছে। ডেস্কের উপরকার ঘন্টা বাজিয়ে প্রশ্ন করল, কি রকম কফি পছন্দ কর–চিনি দেওয়া, না না-দেওয়া? কফি কিংবা রাকি না হলে তুরস্কে আমরা কাজের কথা বলতে পারি না। এখনো রাকির সময় হয়নি।
চিনি না দেওয়া।
বন্ডের পেছনের দরজাটা খুলল। করিম হুঙ্কার ছেড়ে অর্ডার দিলেন। করিম ডেস্কের ড্রয়ার থেকে একটা ফাইল বের করে বললেন, দোস্ত, এই কেসটা সম্বন্ধে কি বলব তোমাকে ভেবে পাচ্ছি না। আমাদের কাজটা ফিল্ম স্যুটিং-এর মত। বহুবার সবাইকে লোকেশনে নিয়ে ক্যামেরা চালাতে শুরু করার ঠিক আগে নানা বাধা। হয় খারাপ আবহাওয়া নয় অভিনেতার গণ্ডগোল, নয় অ্যাকসিডেন্ট। আর একটা জিনিস যেটা দুজন স্টারের প্রেমে পড়া। এই কেসে আমার কাছে সেটাই বেশি গোলমেলে ব্যাপার। কল্পনায় তোমার কথা ভেবে এই মেয়েটি কি সত্যই তোমার প্রেমে পড়েছে? তুমিও কি তাকে এমন ভালবাসতে পারবে যাতে সে তোমার সঙ্গে ইংল্যান্ডে পালাতে রাজি হবে?
বন্ড কোন মন্তব্য করল না। দরজায় টোকা দিয়ে হেড ক্লার্ক সোনালি কাজ করা চীনেমাটির পেয়ালায় তাদের কফি দিয়ে গেল। এক চুমুক দিয়ে বন্ড দেখল সেটা ভাল কফি। এক ঢোকে নিজের পেয়ালা শেষ করে হোল্ডারে একটা সিগারেট ভরে করিম সেটা ধরালেন। তারপর তিনি বললেন, এই প্রেমের ব্যাপার নিয়ে আমাদের অপেক্ষা করা ছাড়া আর কিছু করার নেই। কিন্তু ইতিমধ্যে আরো নানা ঘটনা ঘটেছে।
হঠাৎ তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ আর ধূর্ত হল, দোস্ত, আমাদের শত্রু শিবিরে নানান তৎপরতা দেখা যাচ্ছে। সেখানে চলছে। নানা লোকের আসা যাওয়া। দারুন একটা ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছি। নিজের নাকে হাত বুলিয়ে, এই নাকটা আমার খুব ভাল বন্ধু। এটাকে আমি বিশ্বাস করি। বাজিটা যদি খুব চড়া দরের না হয় তা হলে বলব, দোস্ত দেশে ফিরে যাও। এখানকার আবহাওয়া এখন ভাল না, কেটে পড়াই ভাল।
করিম তার উত্তেজনা কাটিয়ে হো-হো করে হাসলেন, কিন্তু আমরা বুড়ি মেয়ে মানুষ নই। এটা আমাদের ডিউটি। প্রথমতঃ এমন কি খবর দিতে পারি যেটা তুমি জান না? আমি খবর পাঠাবার পর থেকে মেয়েটির কোন হদিশ নেই। কিন্তু আমাদের দেখা হওয়া সে সম্বন্ধে হয়ত তোমার কিছু প্রশ্ন আছে।
বন্ড বলল, আমার প্রশ্ন, মেয়েটির সম্বন্ধে তোমার কি ধারণা? তোমার কি বিশ্বাস হয় আমার সম্বন্ধে ওর কথাগুলো? আমার সম্বন্ধে তার খেপাটে ধরনের মোহজন্মে না থাকে তাহলে বুঝতে হবে সমস্ত ব্যাপারটাই বুজরুকি–MGB-র এমন একটা জটিল প্লট, যেটা আমরা বুঝতে পারছি না। এখন বল–মেয়েটির কথাগুলো কি বিশ্বাসযোগ্য?
