কাস্টমস-এর বাইরে ছায়ার ভিতর থেকে একটি লোক বেরিয়ে এল। কৃশ, দীর্ঘ চেহারা। কালো ঝোলা গোফ। পরনে ছিমছাম ওয়েস্ট কোট, মাথায় সোফারের টুপি। সে স্যালুট করল। তারপর বন্ডের নাম না জেনেই তার সুটকেসটা নিয়ে চলল একটা দারুণ সম্ভ্রান্ত পুরনো মডেলের কালো রোলস রয়েসের দিকে। গাড়িটা নিশ্চয়ই বিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয় দশকে কোন কোটিপতির জন্য বানানো হয়েছিল–বণ্ড ভাবল। বিমানবন্দর থেকে বেরুবার পর। ড্রাইভার ঘাড় ফিরিয়ে ভাবে বিশুদ্ধ ইংরেজিতে বন্ডকে বলল, করিম বে-র ধারণা আজ রাতে আপনি বিশ্রাম করবেন। কাল সকাল নটায় আপনার কাছে আমাকে আসতে হবে। কোন হোটেলে আপনি থাকবেন, স্যার?
ক্রিস্টাল প্যালেস।
ঠিক আছে, স্যার। গাড়িটা হু-হুঁ করে ছুটল।
পেছনে, বিমানবন্দরের ছায়ায় ঢাকা পার্কিং প্লেসে বন্ড অস্পষ্ট শুনল একটা মোেটর স্কুটারের স্টার্ট দেবার ঘড়ঘড় শব্দ। হেলান দিয়ে বসে সে এই মোটর ভ্রমণ উপভোগ করতে লাগল।
.
ডার্কো করিম
ক্রিস্টাল প্যালেসের খুপরি ঘরে খুব ভোরে তার ঘুম ভাঙল।
বিছানা ছেড়ে উঠে জানালার পর্দা সরিয়ে পৃথিবী বিখ্যাত অন্যতম সুন্দর প্রাকৃতিক দৃশ্য দেখতে লাগল সেডান দিকে গোল্ডেন হর্নের শান্ত পানি, বাঁ দিকে বসফরাসের নৃত্যময় ঊর্মিমালা।
ঘরে ফিরে বন্ড টেলিফোনে ইংরেজিতে তার ব্রেকফাস্ট পাঠাবার অনুরোধ করল। হোটেলের লোক বুঝল না। ফরাসিতে বলতে বুঝল। ঠাণ্ডা পানিতে দাড়ি কামাতে কামাতে সে ভাবল যে খাবারগুলো যেন অখাদ্য না হয়। খাবার দেখে সে হতাশ হল না। নীল চীনেমাটির বাটিতে ঘন দই, তার সঙ্গে ক্রিম। পাকা রসাল ডুমুর। কুচকুচে কালো। টার্কিশ কফি অত্যন্ত তৃপ্তির সঙ্গে বন্ড খেল।
কাঁটায় কাঁটায় নটার সময় এসে সেই রোলস রয়েস তাকে নিয়ে এল বিরাট একটা সরকারি বাড়িতে। দারোয়ান দরজা খুলে ইঙ্গিতে বন্ডকে অনুসরণ করতে বলল। তাকে এক কেরানির কাছে নিয়ে গেল। তারপর কেরানি তাকে নিয়ে একটা ঘরের দরজায় টোকা দিল। তারপরেই দরজা খুলে বন্ডকে ঘরে ঢুকিয়ে দরজা বন্ধ করল।
আসুন দোস্ত,–আসুন, আসুন, ক্রিম রঙের তসরের সুন্দর ছাটের স্যুট পরা বিরাট চেহারার একটি লোক মেহগনি ডেস্কের পেছন থেকে এসে তার দিকে হাত বাড়াল।
তার স্বরের কর্তৃত্ব আভাস শুনেই বন্ড বুঝল ইনিই হচ্ছেন T-স্টেশনের প্রধান। এবং সে এখন এই এলাকায় এই মানুষটির অধীনে।
ডার্কো করিমের করমর্দন আন্তরিকতায় ভরা। আর এমন জোরাল যে, অতি সহজেই অনুমান করা যায়, যার সঙ্গে করমর্দন করছেন তার আঙ্গুলের হাড় অনায়াসে তিনি গুঁড়িয়ে দিতে পারেন।
বন্ড লম্বায় ছ ফুট। এ মানুষটি তার চেয়েও অন্তত দু ইঞ্চি লম্বা। চেহারায় বন্ডের দ্বিগুণ। মুখ তামাটে। নাকটা ভাঙা। চোখ দুটো হাসি হাসি, টলটলে, নীল–সেখানে লালচে শিরা। সেই চোখ দেখেই বন্ড বুঝল নানা অত্যাচারে অনাচারে তিনি জীবনটা অপচয় করে চলেছেন। মুখটা বেদেদের মত। ডান কানে সোনার রিং। বন্ডের মনে হল এ রকম প্রাণবন্ত মুখ সে আগে দেখেনি।
বন্ড বলল, গত রাতে আপনি গাড়ি পাঠিয়েছিলেন বলে ধন্যবাদ।
হো-হো করে হেসে করিম বলল, আপনি-টাপনি ছাড়। আমাদের বন্ধুদেরও তোমার ধন্যবাদ জানান উচিত। দু পক্ষই তোমাকে আনতে গিয়েছিল। আমার গাড়ি বিমানবন্দরে গেলেই তারা অনুসরণ করে।
সেটা কি ভেস্পা না লাম্ব্রেটা?
তুমি লক্ষ্য করেছিল? সেটা লামব্রেটা। ক্ষুদে ক্ষুদে লোকগুলোর জন্য ও ধরনের বহু গাড়ি তাদের আছে। লোকগুলোকে আমি বলি, মুখহীন মানুষ। তাদের সবাইকে দেখতে হুবহু এক। এখনো আমি তাদের চিনে উঠতে পারিনি। ক্ষুদে ডাকাতের দল। অধিকাংশই বুলগানিন। শত্রুপক্ষের জঘন্য কাজগুলো এরাই করে। কিন্তু লোকটা অনেক পেছনে ছিল। একবার আমার শোফার হঠাৎ ব্রেক কষে খুব জোরে ব্যাক করে। গাড়িটার রঙ চটে যায়, চাকায়। আর কলকজায় রক্তের দাগ ধরে। তারপর থেকে তারা রোলস্টার থেকে দূরে থাকে। উচিত শিক্ষা হয়েছে।
করিম নিজের চেয়ারে গিয়ে বসে আর একটা চেয়ারে বন্ডকে ইঙ্গিতে বসতে বললেন। তারপর এগিয়ে দিলেন। চ্যাপটা সাদা এক বাক্স সিগারেট। চেয়ারে বসে বন্ড একটা সিগারেট নিয়ে ধরাল। সিগারেটটা অদ্ভুত ভালভারি কোমল আর মিষ্টি, তুর্কি তামাক দিয়ে তৈরি।
নিকোটিনের দাগ-ধরা হাতির দাঁতের হোলডারে করিম একটা সিগারেট ভরলেন। সেই অবসরে বন্ড ঘরটাকে ভাল করে দেখে নিল। রঙ আর বার্নিশের তীব্র গন্ধ–যেন সম্প্রতি নতুন করে সাজানো হয়েছে। ঘরটা চৌকো আর বড়। ঝকঝকে মেহগনি কাঠের প্যানেল বসানো। করিমের চেয়ারের পেছনে ছাদ থেকে একটা প্রাচ্যদেশের নশা পর্দা ঝুলছে।
করিম সিগারেট ধরিয়ে পর্দাটার দিকে তাকিয়ে সহজভাবে বললেন, আমাদের বন্ধুরা গতকাল এসে দেয়ালের বাইরে একটা টাইম-বম্ব বসিয়েছিল। ফিউজটা এমনভাবে ঠিক করেছিল যাতে ডেস্কে বসার সময় আমি মারা পড়ি। সৌভাগ্যবশত আমি তখন এক রুমানিয়ান তরুণীর সঙ্গে আরাম করি। মেয়েটার এখনো বিশ্বাস প্রেম করার বিনিময়ে লোকে তাকে গোপন খবর জানাবে। চরম মুহূর্তে বোমাটা ফাটে। আমি তাতে একটুও উত্তেজিত হইনি। কিন্তু মেয়েটা দারুণ ঘাবড়ে যায়। তাকে যখন ছেড়ে দিই, সে হিস্টিরিক হয়ে পড়ে। মনে হয় তার ধারণা আমার প্রেম করার ধরনটা প্রচণ্ড রকমের। তারপর ক্ষমা চাওয়ার সুরে বললেন, তোমার অভ্যর্থনার জন্য ঘরটাকে খুব তাড়াহুড়োর মধ্যে মেরামত করতে হয়েছে। এই হঠাৎ শান্তিভঙ্গের কারণটা কিন্তু কিছুই বুঝতে পারছি না। ইস্তাম্বুলে আমাদের সবাইকার মধ্যে খুব সদ্ভাব। আমার সহকর্মীদের হঠাৎ এভাবে যুদ্ধ ঘোষণার কথা আগে শোনা যায়নি। ব্যাপারটা খুবই উদ্বেগজনক। এতে ফ্যাসাদে পড়বে আমাদের রুশী বন্ধুরা। যে এ কাজ করেছে তার নামটা জানলে তাকে আমি ধমকাতে বাধ্য হব। ব্যাপারটার মাথামুণ্ড কিছু বুঝছি না। আশা করি আমাদের কেসের সঙ্গে এর কোন সম্পর্ক নেই।
