প্লেনের একটানা মৃদু গুঞ্জন। নিচে সাদা মেঘের অনন্ত সমুদ্র। দূরে মেঘের ফাটলের মধ্যে ঝাপসা নীল রঙ প্যারিস। ঘন্টা খানেক ধরে তারা ফ্রান্সের পোড়া ক্ষেতের ওপর দিয়ে উড়ে চলল।
লাঞ্চ এল। বইটা বন্ধ করল বন্ড। সেই সঙ্গে তার ভাবনাগুলোকেও। খেতে খেতে সে নিচে তাকিয়ে দেখল আয়নার মত জেনিভার হ্রদ। সুন্দর আল্পস্-এর পাইনের অরণ্য বরফ ছুঁয়েছে। তার মনে পড়ল অতীতে ছুটির দিনে স্কি করার কথা। ম ব্লা পাহাড়ের চুড়ো ঘুরে প্লেনটা ছুটছে। মনে পড়ল কৈশোরের কোমরে দড়ি জড়িয়ে পাহাড়ে ওঠার কথা।
আর এখন? প্লেনের জানালার শার্শিতে নিজের ছায়ার দিকে তাকিয়ে বন্ড মৃদু হাসল। সেই তরুণ জেমস বন্ড এখন যদি পথে এসে তার সঙ্গে কথা বলে–সেকি সেই সতের বছরের ছেলেটির নিষ্পাপ মুখটি চিনতে পারবে? সেই কিশোর কি চিনতে পারবে এই গুপ্তচরকে, বয়স্ক জেমস বন্ডকে বহু বছরের প্রতারণা, নিষ্ঠুরতা আর আতঙ্ককে বর্তমান লোকটির জীবন কলুষিত। তার চোখের দৃষ্টি ঠাণ্ডা আর উদ্ধত। ডান গালে ক্ষতচিহ্ন। বাঁ বগলের নিচে একটা গুপ্ত অস্ত্র।–যে দুর্দান্ত গুপ্তচর পৃথিবীর ওপর দিয়ে এখন ছুটে চলেছে একটা নতুন আর অত্যন্ত রোমান্টিক ভূমিকা নিয়ে, ইংল্যান্ডের অবৈধ প্রণয়ের দালাল সেজেতার সম্বন্ধে সেই কিশোর ছেলেটি কি ভাববে?
বন্ড তার মৃত যৌবনের চিন্তা মন থেকে সরিয়ে দিল। কখনো পেছন দিকে তাকাতে নেই। কি হতে পারত চিন্তা করা সময়ের অপব্যবহার। নিজের নিয়তির অনুসরণ কর। তাই নিয়ে তৃপ্ত হও।
রৌদ্রোজ্জ্বল জেনোয়া আর ভূমধ্যসাগরের শান্ত নীল পানির দিকে তাকিয়ে মন থেকে অতীতের চিন্তা মুছে আসল ভবিষ্যতের কথা ভাবতে লাগল বন্ড। ভাবতে লাগল সেই কাজটার কথা, মনে মনে তিক্তভাবে যেটার সে নাম দিয়েছিল, ইংল্যান্ডের অবৈধ প্রণয়ের দালালি।
একটি মেয়েকে খুব তাড়াতাড়ি ফুসলিয়ে নিয়ে আসতে হবে যাকে কখনো সে দেখেনি, যার নাম মাত্র গতকাল প্রথম শুনেছে। T-এর প্রধান বলেছে মেয়েটি ভারি রূপসী। কিন্তু যত রূপসীই সে হোক না কেন-বন্ডের মাথায় একটা মাত্রই চিন্তা ও সে দেখতে কেমন সেটা বড় কথা নয়, বড় কথা বিয়ের যৌতুক হিসেবে কি সে আনবে। কাজটা অনেকটা অর্থের জন্য কোন ধনী মেয়েকে বিয়ে করার মত। গোপন চিন্তা বাদ দিয়ে তার মন কি নিজের দেহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পারবে নিখুঁতভাবে প্রেম করতে বিছানায় কেমন ভাবে তোক প্রেম করে, যখন সমস্ত মনটা পড়ে থাকে ব্যাংকে মেয়েটির কত টাকা আছে তার হিসেবের ওপর? হয়ত একটা সোনার থলিকে ধর্ষণ করার মধ্যে একটা যৌন উত্তেজনা আছে। কিন্তু এক সাইফার মিশনকে।
রোম এল আর গেল। ইটালির ওপর দিয়ে আবার ছুটে চলল প্লেনটা। যে সাক্ষাৎকারের ব্যাপার ঘণ্টা তিনশ মাইল বেগে এগিয়ে আসছে তার তুচ্ছতম খুঁটিনাটি কথা বন্ড ভাবতে লাগল।
এটা কি MGB-র এমন একটা জটিল প্ল্যান যার চাবিকাঠি তার হাতে? এমন একটা ফাঁদে সে পা দিতে চলেছে। যার কথা M-এর দুর্ধর্ষ মগজেও ধরা পড়েনি। এ রকম একটা ফাঁদের কথা ভেবে M নিশ্চয়ই দুশ্চিন্তায় পড়েছিলেন। প্রত্যেকটি প্রামাণ্য নজিরের স্বপক্ষে আর বিপক্ষে সবকিছু খুঁটিয়ে দেখেছেন M–শুধু একা তিনি নন, তার অফিসের সমস্ত বিভাগের বড়কর্তারা। কিন্তু রুশীদের মতলব কি হতে পারে কেউ তার হদিস করতে পারেনি। তারা কি বন্ডকে চুরি করে নিয়ে গিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করবে? প্রতিহিংসার জন্য বন্ডকে খুন করতে চায়। তাই যদি চায় তা হলে তো লন্ডনের পথে তাকে গুলি করে মারতে পারত। কিংবা তার ফ্লাটে বা তার গাড়িতে বোমা ফেলেও কাজ সমাধা করতে পারত।
বন্ড যখন চিন্তায় মগ্ন তখন স্টুয়ার্ডেস বলল, প্লিজ বেল্টটা বাঁধুন। সঙ্গে সঙ্গে তীরবেগে প্লেনটা নামতে শুরু করল। জানলায় তখন বৃষ্টি আছড়াচ্ছে। ভূম্যসাগরীয় বিদ্যুঝঞ্ঝা কোনমতে পেরিয়েছে প্লেনটা।
বন্ড যেন বিপদের গন্ধ পেল। আবার জানলায় বিদ্যুতের ঝলকানি। প্লেনটা কি মুখ থুবড়ে পড়বে নাকি তেরজন যাত্রী। শুক্রবারের তের তারিখ। লোয়েলিয়া পবি–র কথাগুলো বন্ডের মনে পড়ল। সে কি শেষ পর্যন্ত ইস্তাম্বুলে পৌঁছতে পারবে?
প্রায় সঙ্গে সঙ্গে কেবিনের বাতিগুলো জ্বলল। জানলায় বৃষ্টির শব্দ আর নেই। সে স্বস্তির একটা দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে একটা সিগারেট ধরাল।
প্লেনটা নামল।
সামান্য যে কটা যাত্রী তারা সবাই চুপচাপ, মুখ ফ্যাকাশে। বন্ড তাদের সঙ্গে নেমে ট্রানসিট লাউঞ্জ দিয়ে সোজা বারের দিকে গিয়ে Ouzu মদের অর্ডার দিল। মদে জ্বলে উঠল তার গলা আর পেট। তবু ভাল লাগল বলে আরেক গ্লাস মদের অর্ডার দিল সে।
লাউডস্পিকারে তার নাম যখন ঘোষণা হল তখন গোধূলী। আকাশের অনেক উঁচুতে ভারি পরিষ্কার আধখানা চাঁদ। বাতাসে ফুলের সুগন্ধ। ঝি ঝি ডাকছে। এখান থেকে ইস্তাম্বুল মাত্র নব্বই মিনিটের উড়ো পথ।
প্লেনটা অবশেষে পৌঁছল সুন্দর আধুনিক ইয়েসিনকায় বিমান বন্দরে। সেখান থেকে মোটরে এক ঘণ্টার পথ ইস্তাম্বুল। স্টুয়ার্ডের্সকে ধন্যবাদ জানিয়ে তার ছোট্ট ভারি অ্যাটাচিকেসটা নিয়ে পাসপোর্ট চেক পোস্টের ভেতর দিয়ে কাস্টমস অফিসে পৌঁছে সুইকেসটা ফ্রি করল বন্ড।
এরাই তা হলে আধুনিক তুর্কী ছিমছাম পোশাক পরা কালো কুৎসিত চেহারাগুলোর দিকে তাকিয়ে বন্ড ভাবল। লোকগুলোর চোখ উজ্জ্বল। কটমটে আর নিষ্ঠুর, অবিশ্বাসী আর সতর্ক।
