মেয়েটির কথাগুলো দারুণ পাগলাটে ধরনের। তা সত্ত্বেও M বিশ্বাস করেছেন। কোন রুশী তাদের জন্য এই উপহার আনছে, তার জন্য চরম সর্বনাশকেও সে পরোয়া করে না–এর মানে কি? মেয়েটির কথা সত্যি হতে পারে, মিথ্যেও হতে পারে। কিন্তু এই জুয়াখেলার বাজিটা এমনি চড়া দরের, যে সেটাকে উপেক্ষা করা যায় না।
বন্ডের চোখের দিকে তাকিয়ে তার উত্তেজনা খুব স্পষ্ট করেই বুঝতে পারলেন। মৃদু স্বরে বললেন 007,–কথাটা বুঝলে?
বন্ড প্রশ্ন করল, কি করে কাজটা হাসিল করবে সে সম্বন্ধে মেয়েটি কিছু বলেছে?
সোজাসুজি কিছু বলেনি। কিন্তু করিম জানিয়েছেন, কাজটা হাসিল করা সম্বন্ধে মেয়েটির মনে কোন রকম সংশয় নেই। সপ্তাহে কয়েক রাত সে একা থাকে। অফিসে ক্যাম্পখাটে ঘুমায়। মেয়েটি জানে তার প্ল্যানের কথা ঘুণাক্ষরে জানা গেলে সঙ্গে সঙ্গে তাকে গুলি করে মেরে ফেলা হবে। আমার কাছে করিম তার কথা জানাবে বলেও সে উদ্বিগ্ন। করিমকে দিয়ে সে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছে লিখে তাকে পাঠাতে হবে এবং সেই খবরের কোন প্রতিলিপি তিনি রাখবেন না। স্বভাবতঃই করিম তা করবেন বলে কথা দেন। SPEKTOR-এর কথা শোনামাত্র করিম বুঝতে পেরেছিলেন যুদ্ধের পর এটাই সবচেয়ে বড় গুপ্ত খবর।
তারপর কি হল, স্যার?
ওটাকোয় নামে একটা জায়গার কাছে স্টিমারটা তখন আসছিল। মেয়েটি বলে সেখানে সে নামবে। করিম কথা দেয় সেই রাতেই সাংকেতিক ভাষায় খবরটা আমাদের জানাবে। মেয়েটি তার সঙ্গে একেবারেই কোন যোগাযোগ রাখবে না বলে জানায়। শুধু জানায় আমরা আমাদের কথা রাখলে, সে-ও তার কথা রাখবে। গুডনাইট বলে জেটির ভীড়ে সে মিলিয়ে যায়।
হঠাৎ সামনে ঝুঁকে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে বন্ডের দিকে তাকিয়ে M বললেন, কিন্তু আমরা যে তার কথামত কাজ করব সে সম্বন্ধে মেয়েটিকে কোন গ্যারান্টি করিম দেননি।
বন্ড চুপ করে রইল। সে জানে এর পর M কি বললেন।
M-এর চোখের তারা সঙ্কুচিত হয়ে উঠল, মেয়েটি একটিমাত্র শর্তে এ-কাজটা করবে বলেছে। শর্তটা এই : তোমাকে ইস্তাম্বুলে গিয়ে মেশিন সমেত তাকে ইংল্যান্ডে নিয়ে আসতে হবে।
বন্ড কাঁধ ঝাঁকাল। কাজটা ভারি সহজ। কিন্তু…M-এর দিকে সরল দৃষ্টিতে সে তাকাল। এটা তো ভারি মিষ্টি সহজ কাজ। শুধু একটা খটকা লাগছে। মেয়েটি শুধু আমার ফটো দেখেছে, আমার সম্বন্ধে অনেক উত্তেজনাপূর্ণ কাহিনী শুনেছে। কিন্তু, ধরুন আমাকে সশরীরে দেখলে তার স্বপ্নটা যদি ভেঙ্গে যায়?
গভীর সুরে M বললেন, সেটাই তোমার কাজ–তার স্বপ্নটা যেন না ভাঙ্গে। তাই মিস্ সে সম্বন্ধে তোমাকে প্রশ্ন করছিলাম।
.
প্রাচ্যদেশের যাত্রী
লন্ডন এয়ারপোর্ট ছেড়ে, সাড়ে দশটায় BEA ফ্লাইট নম্বর ১৩০ তীর বেগে ছুটল রোম, এথেন্স, ইস্তাম্বুলের দিকে। দশ মিনিটের মধ্যে প্লেনটা উঠল কুড়ি হাজার ফুট উঁচুতে। বন্ড তার সিট বেল্ট খুলে একটা সিগারেট ধরাল। অ্যাটাচিকেসটা তুলে তার ভেতর থেকে একটা বই বের করে আবার সেটা নামিয়ে রাখল বন্ড। হোট দেখতে হলে কি হবে দারুণ ভারি সেটা। বন্ড ভাবল, লন্ডন এয়ারপোর্টের টিকিট ক্লার্ক ওভারনাইট ব্যাগ হিসেবে সেটাকে ছেড়ে না দিয়ে যদি ওজন করত তা হলে কি অবাকটাই না হত।
Qব্রাঞ্চ এই সুন্দর দেখতে ছোট্ট ব্যাগটার চামড়া আর লাইনিং-এর মধ্যে পঞ্চাশটা 3.25 পিস্তলের গুলি আর দুটো ধারাল ছোরা ভরে দিয়েছিল। বন্ড ঠাট্টা করে উড়িয়ে দেবার চেষ্টা করা সত্তেও Q-এর কারিগররা কেসটার হ্যাঁন্ডেলের মধ্যে সায়ানাইডের একটা মৃত্যু বড়ি ভরে দিয়েছিল, বিশেষ একটা জায়গায় চাপ দিলেই যেটা বন্ডের হাতের তালুর মধ্যে বেরিয়ে আসবে (কেসটা নেবার পরেই বন্ড বাথরুমে গিয়ে বড়িটা কমোডে ফেলে ফ্লাশ টেনে দিয়েছিল)। নিরীহ চেহারার স্পঞ্জ-ব্যাগে পামঅলিভ শেভিং ক্রিমের মোটা টিউবটা আরো বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সেটার মধ্যে তুলোয়-মোড়া ছিল বন্ডের বেরেটা পিস্তলের সাইলেন্সর। প্রয়োজনমত নগদ টাকার জন্য কেসটার ডালায় ছিল পঞ্চাশটা সোনার মোহর।
প্লেনে বারজন যাত্রী ছিল। তাকে নিয়ে তের। কথাটা জানলে তার সেক্রেটারি ললায়েলিয়া পনুসনবির আতংকের কথা ভেবে বন্ড মৃদু হাসল। গতকাল M-এর ঘর থেকে বেরিয়ে সে তার অফিসে গিয়েছিল ফ্লাইটের খুঁটিনাটি ব্যবস্থা পাকা করতে। শুক্রবার তের তারিখে যাবে শুনে তার সেক্রেটারি ঘোরর প্রতিবাদ জানিয়েছিল।
বন্ড বলেছিল, যাত্রার পক্ষে তের তারিখটাই সবচেয়ে ভাল। যাত্রীর সংখ্যা তখন খুব কম থাকে, আরামে যাওয়া যায়। পারলে সব সময়েই তের তারিখ আমি বেছে নিই।
হাল ছেড়ে দিয়ে পসনৃবি বলেছিল, তোমার সর্বনাশ কে ঠেকাতে পারবে? আমি কিন্তু সেদিনটা ভারি দুশ্চিন্তায় কাটাব, আর দোহাই তোমার, আজ বিকেলে মই-এর তলা-টলা দিয়ে হেঁটো না। ভেবো না সব সময় বরাত-জোরে বেঁচে যাবে। কেন তুরস্কে যাচ্ছ জানি না। জানতেও চাই না। আমি হাড়ে হাড়ে সেটা খানিক আঁচ করেছি।
তাকে খেপিয়ে বন্ড বলেছিল, কি কাণ্ড! তোমার ঐ সুন্দর হাড়গুলোর মধ্যে যে রাতে ফিরব সে রাতেই ঐ সুন্দর হাড়গুলোকে নিয়ে যাব।
পনসনবি ঠাণ্ডা গলায় বলেছিল, মোটেই না। তারপর হঠাৎ আবেগভরে তাকে চুমু খেয়েছিল। আর বহুবার যে কথাটা ভেবেছে আবার সেই কথাটা ভেবেছিল বন্ড–তার সেক্রেটারির মত মেয়ে হয় না। তবে কেন সে অন্য কোন মেয়েদের নিয়ে মাথা ঘামায়?
