বন্ড বলল, ভাল কথা। তাদের গোপন সংকেত জানা মেয়ে কর্মচারি আমাদের কাজে লাগতে পারে। কিন্তু এখানে আসতে চায় কেন?
টেবিলের ওপাশ থেকে বন্ডের দিকে তাকালেন M। কারণ সে প্রেমে পড়েছে, M সামান্য থেমে মৃদু স্বরে বললেন, মেয়েটি বলছে তোমার প্রেমে পড়েছে সে।
আমার প্রেমে পড়েছে?
হ্যাঁ, তোমার প্রেমে। তাই তো সে বলছে। তার নাম তাতিয়ানা রোমানাভো। নামটা শুনেছ?
জীবনে শুনিনি, স্যার। বভের মুখে বিহ্বল ভাব দেখে M মৃদু হাসলেন। কিন্তু মেয়েটির কথার মানে কি? আমার সঙ্গে কখনো তার দেখা হয়েছিল। আমার কথা কি করে সে জানলে?
M বললেন, সমস্ত ব্যাপারটাই হাস্যকর। কিন্তু ব্যাপারটা এমন ধরনের পাগলামো যে সত্যি হতে পারে। মেয়েটির বয়েস চব্বিশ। MGB-তে যোগ দেবার পর থেকে Central Index-এ সে কাজ করছে যেটা আমাদের তথ্য বিভাগের অনুরূপ। সেখানকার ইংরেজি বিভাগে সে ছ বছর ধরে কাজ করছে। তাকে যে ফাইলগুলো নিয়ে কাজ করতে হয়। তার মধ্যে একটা হচ্ছে তোমার।
আমি মেয়েটিকে দেখতে চাই, বন্ড মন্তব্য করল।
তার গল্পটা এই–তোমার ফটোগুলো তাদের কাছে আছে। প্রথমে সেগুলো দেখে সে মুগ্ধ হয়। তোমার চেহারাটা তার মনে ধরে, ইত্যাদি ইত্যাদি। তোমার সব কীর্তিকাহিনী সে পড়েছে। তার ধারণা হয়েছে তোমার মত মানুষ হয় না।
বন্ড চোখ নামাল। M–এর মুখ নির্বিকার।
এ ধরনের উদ্ভট গল্প আমি কখনো শুনিনি, স্যার। নিশ্চয়ই T-এর প্রধান এটা বিশ্বাস করেননি।
এক মুহূর্ত সবুর কর, M-এর স্বর খিটখিটে হয়ে উঠল। আগে কখনো যেটা ঘটেনি সেটা ঘটেছে বলে চটপট কোন সিদ্ধান্তে পৌঁছিও না। ধর, এই কাজে না থেকে যদি তুমি কোন ফিল্ম স্টার হতে? পৃথিবীর সব জায়গায় মেয়েদের কাছ থেকে নানা পাগলাটে ধরনের চিঠি পেতে, যাতে থাকত তোমাকে ছাড়া তারা বাঁচতে পারবে না ধরনের হাবিজাবি কত কি কথা–সৃষ্টিকর্তাই জানেন। এই বোকা মেয়েটি মস্কোতে সেক্রেটারির কাজ করে। সম্ভবত তাদের ডিপার্টমেন্টে সবাই মেয়ে–আমাদের মত। তাকাবার মত ঘরে একটা পুরুষও নেই। তার কাছে ক্রমাগত পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য একটা ফাইল আসছে যাতে, কি বলে, তোমার তেজস্বী চেহারার ছবি। তাতে, যাকে বলে, তার মুণ্ডু ঘুরে যায়, পৃথিবীর সর্বত্র যেমন পত্রিকার ছবি দেখে সেক্রেটারিদের মাথা ঘোরে, এ ধরনের ভয়াবহ মেয়েলী স্বভাবের কথা তিনি কিছুই জানেন না, বোঝাবার জন্য M পাইপটা নাড়ালেন। সৃষ্টিকর্তা জানেন, এ ধরনের ব্যাপার সম্বন্ধে আমার জ্ঞান সামান্যই। কিন্তু তোমাকে স্বীকার করতেই হবে যে, এ-ধরনের ঘটনা ঘটে।
বন্ড মৃদু হাসল, এখন স্যার বুঝতে পারছি, রুশী মেয়েদের ইংরেজ মেয়েদের মত বোকা না হবার কোন কারণ নেই। কিন্তু মেয়েটি যা করেছে তাতে স্বীকার করতে হয় তার বুকের পাটা আছে। T-এর প্রধান কি জানিয়েছেন, মেয়েটি জানে ধরা পড়লে তার ফলাফল কি হবে?
M বললেন, মেয়েটি দারুণ ঘাবড়ে আছে। স্টিমারে সর্বক্ষণ এদিক-ওদিক তাকাচ্ছিল তাকে কেউ লক্ষ্য করছে কিনা দেখার জন্য। কিন্তু এক মিনিট সবুর কর। গল্পের অর্ধেকটাও এখনো শোননি। M তার পাইপে টান দিয়ে একমুখ ধোঁয়া ছাড়লেন।
মেয়েটি করিমকে বলেছে তোমার প্রতি তার আকর্ষণ ক্রমশ বিতৃষ্ণা ধরায় রুশীদের ওপর। ক্রমশ সেই ঘৃণা গিয়ে পড়ে রুশ সরকারের ওপর। তাদের জন্য যে কাজ সে করেছিল, সে কাজটা তোমার বিরুদ্ধে। তাই সে বিদেশে বদলির জন্য দরখাস্ত করে। ভাষার জ্ঞান তার খুব ভাল বিশেষ করে ইংরেজি আর ফরাসি। যথাসময়ে ইস্তাম্বুলে সংকেত বিভাগে একটা চাকরির প্রস্তাব তার কাছে আসে। সে-চাকরির বেতন কম।
তারপর যা ঘটে সংক্ষেপে সেটা এই : ছমাস ট্রেনিং-এর পর তিন সপ্তাহ আগে সে ইস্তাম্বুলে আসে। তারপর খোঁজ করে করিমের খবর সে পায়। করিম সেখানে বহুকাল আছেন। তাই তুরস্কে সবাই এখন জানে তার কাজটা কি।
তাই মেয়েটি করিমের কাছে টাইপ করা নোটটা পাঠিয়েছিল। এখন মেয়েটি জানতে চায় করিম তাকে সাহায্য করতে পারবে কিনা। থেমে চিন্তিতভাবে পাইপে কয়েক টান দিয়ে M বলে চললেন, তোমার মতই করিম প্রথমে সন্দিগ্ধ হয়ে ওঠেন। এর পেছনে কোন একটা চক্রান্ত আছে কিনা তিনি খুব ভাল করে বিবেচনা করে দেখেন। কিন্তু আমাদের কাছে এই মেয়েটিকে পাঠিয়ে কি লাভ কিছুতেই তিনি ভেবে পান না। এই আলাপ-আলোচনার সময় স্টিমারটা বসফরাসের দিকে যাচ্ছিল, খানিক পরেই ইস্তাম্বুলের দিকে ফেরার কথা। করিম যত জেরা করতে থাকেন, মেয়েটি তত মরিয়া হয়ে ওঠে। তারপর, বন্ডের দিকে তাকিয়ে M-র চোখ চকচক করে উঠল, মোক্ষম কথাটা তাতিয়ানা বলে।
M-এর ধূসর ঠাণ্ডা চোখ চকচক করে উঠলে বন্ড তাঁর উত্তেজনা টের পায়।
মেয়েটি তার হাতের শেষ তাসটা খেলে। সে জানত তাসটা তুরুপের টেক্কা। সে বলে–আমাদের কাছে আসতে পারলে সে তার সাইফার মেশিনটা নিয়ে আসবে। সেই মেশিনটার জন্য আমরা যে কোন চড়া দাম দিতে রাজি।
হে আল্লাহ, মৃদু স্বরে বলল বন্ড। এ রকম অসাধারণ ব্যাপার কল্পনার বাইরে। SPEKTOR মেশিন, সব দেশের সবচেয়ে গোপনীয় সাংকেতিক বার্তা যে-যন্ত্রটা বলে দিতে পারে। সেটা খোয়া গেছে জানলে রুশীরা নিশ্চয়ই পৃথিবীর সর্বত্র তাদের এমব্যাসি এবং গুপ্তচর কেন্দ্র থেকে মেশিনটাকে বাতিল করে দেবে। তবু সেটা হাতাতে পারলে দারুণ একটা জিৎ। নিরাপত্তার জন্য বন্ড সাংকেতিক লিপি সম্বন্ধে বিশেষ কিছু জানত না–যাতে ধরা পড়লে সে সম্বন্ধে কোন কথা তার কাছ থেকে বের করে নেওয়া না যায়। তবু এটুকু জানত SPEKTOR মেশিন হারানো রুশী গুপ্তচর বিভাগের পক্ষে একটা চরম সর্বনাশ।
