.
ভারী মিষ্টি কাজ
ঘটনাচক্রে কিন্তু চূড়ান্ত রিপোর্টে বন্ডকে সই করতে হল না।
তার সেক্রেটারীকে গ্রীষ্মের নুতন ফ্রকটার জন্য অভিনন্দন জানিয়ে রাতে যে সব সাংকেতিক বার্তা এসেছিল সেই ফাইলের অর্ধেকটা যখন সে শেষ করেছে এমন সময় লাল টেলিফোনটা ঝনঝন করে উঠল। তার অর্থ হয় M, নয় বড়সাহেব ফোন করেছেন।
রিসিভার তুলে বন্ড বলল। 007
আসতে পারবে? বড়সাহেবের স্বর।
M?
হ্যাঁ। মনে হচ্ছে অনেকক্ষণ ধরে আলোচনা চলবে। ট্রুপকে বলে দিয়েছি কমিটির মিটিং-এ তুমি যেতে পারবে না।
ব্যাপার কি কিছু আঁচ করতে পেরেছেন?
চিফ অফ স্টাফের মৃদু হাসি শোনা গেল, সত্যি বলতে কি, পেরেছি। কিন্তু তার কাছ থেকেই শোনা ভাল। শুনলে খাড়া হয়ে বসবে।
কোটপরে করিডোরে যাবার সময় বন্ড সজোরে দরজাটা বন্ধ করল। কেন জানে না। তার নিশ্চিত ধারণা হল । স্টার্টারের বন্দুক থেকে গুলি ছুটছে–শেষ হয়েছে একঘেয়েমির দিনগুলো। M-এর প্রাইভেট সেক্রেটারি মিস মানিপেনির চোখে সেই পুরানো উত্তেজনা আর গোপন রহস্যের আভাস। মৃদু হেসে সে ইন্টার কমের সুইচ টিপল।
007 এসেছেন স্যার।
তাকে পাঠিয়ে দাও, একটা ধাতব স্বর শোনা গেল। তার দরজার ওপরে লাল বাতি জ্বলল, যার অর্থ আর কেউ যেন ভেতরে না আসে।
দরজা দিয়ে ভিতরে এসে বন্ড ধীরে ধীরে সেটা বন্ধ করল।
M তার লাল চামড়ায় ঢাকা ডেস্কের উলটোদিকের একটা চেয়ারের দিকে ইঙ্গিত করল। বসে বন্ড তাকালো সেই প্রশান্ত নাবিকের মুখের মত রেখাবহুল মুখের দিকে। যেটিকে সে ভালবাসত ও শ্রদ্ধা করত, যার আদেশ সে পালন করত।
একটা ব্যক্তিগত প্রশ্ন করলে কিছু মনে করবে, জেমস
অধীনস্থ কর্মচারিদের M কখনো ব্যক্তিগত প্রশ্ন করতেন না। তাই বন্ড ভাবল ব্যক্তিগত প্রশ্নটা কি হতে পারে?
না, স্যার।
তামার বড় ছাইদান থেকে পাইপটা নিয়ে চিন্তিতভাবে M তামাক ভরতে ভরতে নীরস গলায় বলে চললেন, জান, কথাটা তোমার বন্ধু মিস কেস সম্বন্ধে। তুমি জান এ ধরনের ব্যাপার নিয়ে আমি বড় একটা মাথা ঘামাই না। কিন্তু শুনেছি সেই হীরে সংক্রান্ত ঘটনার পর তোমরা খুব ঘন-ঘন দেখা করছ। শোনা যাচ্ছে হয়ত তোমরা বিয়েও করবে। বন্ডের দিকে তাকিয়ে M আবার চোখ নামালেন। তামাক-ঠাসা পাইপটা মুখে তুলে আগুন ধরিয়ে তিনি বললেন, আপত্তি না থাকলে ব্যাপারটা কি বলবে?
এরপর M কি বলবেন বন্ড ভেবে পেল না। অফিসের গুজবের নিকুচি করেছে। সংক্ষিপ্তভাবে সে বলে চলল, হ্যাঁ স্যার আমাদের মধ্যে বোঝাঁপড়া মোটামুটি ভালই ছিল। বিয়ের কথাও আমরা ভেবেছিলাম। কিন্তু তারপর আমেরিকান। দূতাবাসে মিস কেসের সঙ্গে একজনের আলাপ হয়। মিলিটারি অ্যাটাশের কর্মচারি। নৌ-বাহিনীর মেজর। শুনেছি তাকেই সে বিয়ে করবে। তারা দুজনেই আমেরিকায় ফিরে গেছে। হয়ত ভালই হয়েছে মিশ্রিত বিয়ে প্রায়ই সফল হয় না। শুনেছি লোকটা নাকি ভাল। সম্ভবত লন্ডনে থাকার চেয়ে সেটাই বেশি পছন্দ। বাস্তবিকই এখানে সে স্থায়ীভাবে বসবাস করতে পারত না। মেয়েটি চমৎকার, সামান্য পাগলাটে। আমাদের খুব ঝগড়া হত। হয়ত আমারই দোষ। থাকগে, সব চুকেবুকে গেছে।
M এমন সংক্ষিপ্তভাবে হাসলেন যে তার মুখের চেয়ে চোখেই সেটা ধরা পড়ল। বললেন, তোমাদের মধ্যে বোঝাঁপড়ার ভুল হয়ে থাকলে আমি দুঃখিত, জেমস। M-এর স্বরে কিন্তু কোনরকম সান্ত্বনার আভাস ছিল না। মেয়েদের সঙ্গে বন্ডের অতিরিক্ত মেলামেশা তিনি অপছন্দ করতেন। কিন্তু বন্ডের কর্তা হিসেবে কখনই তিনি চাইতেন।
বন্ড চিরকালের জন্য কোন মেয়ের আঁচলে বাঁধা পড় ক। হয়ত এটাই সবচেয়ে ভাল। এই কাজে কোন পাগলাটে মেয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার অনেক অসুবিধে। যে-হাতে গুলি চালাও সেই হাত ধরে তারা ঝুলে থাকে। জানি না কথাটা বুঝলে কিনা। তোমাকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করার জন্য ক্ষমা করো। হাতে যে কাজ এসেছে সেটা বলার আগে তোমার উত্তরটা জানা দরকার ছিল। ব্যাপারটা ভারি গোলমেলে। তুমি বিয়ে করলে–এ-ব্যাপারে তোমাকে জড়িয়ে ফেলা কঠিন।
মাথা নাড়িয়ে ব্যাপারটা শোনার জন্য বন্ড অপেক্ষা করতে লাগল।
চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে পাইপে দ্রুত কয়েকটা টান দিয়ে M বলতে লাগলেন, ঘটনাটা এই–গতকাল ইস্তাম্বুল থেকে একটা দীর্ঘ খবর এসেছে। মনে হয় মঙ্গলবার আমাদের তুরস্কৃস্থিত গুপ্তচর কেন্দ্র, অর্থাৎ T স্টেশনের প্রধান নাম ঠিকানাহীন টাইপ করা একটা উড়োচিঠি পান। তাতে তাকে বলা হয়েছে। সন্ধে আটটার ফেরি স্টিমারে গালাটা ব্রিজ থেকে বসফরাসের মুখ পর্যন্ত একটা টিকিট কাটতে। আর কোন কথা ছিল না। T-এর প্রধান দুঃসাহসী প্রকৃতির লোক। স্টিমারটায় চড়ে ডেকের রেলিং ধরে তিনি দাঁড়িয়ে থাকেন। মিনিট পনের পর একটা মেয়ে এসে তার পাশে দাঁড়ায়। মেয়েটি রুশী। পরমা সুন্দরী। প্রাকৃতিক দৃশ্য ইত্যাদি টুকিটাকি ব্যাপার নিয়ে খানিক আলোচনার পর, তাঁকে মেয়েটি এক ভারি আশ্চর্য কাহিনী বলে।
পাইপটা আবার ধরাবার জন্য M থামলেন। বন্ড বলে উঠল, T-এর প্রধান কে, স্যার? তুরস্কে আমি কখনো কাজ করিনি।
তার নাম করিম, ডার্কোম করিম। তুর্কি বাবা, ইংরেজ মা। অসাধারণ মানুষ। লড়াই-এর আগে থেকেই T-এর প্রধান। আমাদের সবচেয়ে দক্ষ লোকদের একজন। অদ্ভুত ভাল কাজ করেন। কাজটা তিনি ভালবাসেন। খুব বুদ্ধিমান। নিজের হাতের উটো পিঠের মত পৃথিবীর সব জায়গা জানেন। পাইপটা নাড়িয়ে করিমের প্রসঙ্গ M বাদ দিলেন। মেয়েটির কাহিনী এই–সে MGB-র কর্পোরাল ছিল। স্কুল ছাড়ার পর থেকে সেখানে সে কাজ করছে। সম্প্রতি সংকেত বিভাগের অফিসার হিসাবে ইস্তাম্বুলে বদলি হয়েছে। নানা বুদ্ধি করে এই বদলির চাকরিটা সে জোগাড় করেছে। কারণ সে রাশিয়া থেকে পালাতে চেয়েছিল। সে এখানে আসতে চায়।
