যে লোকটা জুন মাস থেকে বার বার এসে জ্বালাচ্ছে। ঐ জঘন্য জিনিসটা দেখে প্রথমে যা বলেছিলাম, ভেবেছিলাম সে আর টেলিভিশনটা আমাদের কাছে বিক্রি করবে না। এখন বলে কিনা কিস্তিতে কিনতে।
সেলসম্যানেরা ভারি নাছোড়বান্দা, বন্ড কাগজটা নামিয়ে কফির পাত্র নিল।
গত রাতে তাকে খুব কড়কে দিয়েছি। খাবার সময় মানুষকে বিরক্ত করা। জিজ্ঞেস করেছিলাম তার সঙ্গে কোন পরিচয় পত্র আছে কিনা।
মনে হয় তাতেই কাজ হয়েছিল। বন্ড তার বড় কফির পেয়ালায় কানায় কানায় কালো কফি ঢালল।
মোটেই না। বুক ফুলিয়ে তার ইউনিয়নের কার্ডটা আমাকে দেখাল। ইলেকট্রিশিয়ানদের ইউনিয়ন। ওরা কমিউনিস্ট, তাই না, স্যার?
হ্যাঁ, অন্যমনস্কভাবে বন্ড বলল। মনে মনে অত্যন্ত সজাগ সে। ওরা কি তার ওপর নজর রাখছে বন্ড বলল, সে, লোকটা ঠিকঠিক কি বলেছিল?
বলেছিল অবসর সময়ে সে টেলিভিশন সেট বিক্রি করে। প্রশ্ন করেছিল, সত্যিই কি আমরা কিনতে চাই না? সে বলেছিল এই চকের বাসিন্দাদের মধ্যে একমাত্র আমাদের টেলিভিশন নেই। সবসময়েই প্রশ্ন করে আপনি বাড়ি আছেন কিনা। থাকলে আপনার সঙ্গে এ বিষয়ে আলোচনা করবে। লোকটা আস্পর্ধা দেখুন। আপনার গতিবিধির কোন কথাই অবশ্য বলিনি। লোকটা অমন যদি নাছোড়বান্দা না হত তাহলে তাকে নম্র, ভদ্র বলা যেত।
বন্ড ভাবল, হয়ত তার ওপর নজর রাখা হচ্ছে। মনে হয় এবার তোমার ধমকে কাজ হবে। লোকটা আর আসবে না।
হয়তো হবে, স্যার, সন্দিগ্ধস্বরে সে বলল।
বন্ড খেতে লাগল। অন্য সময় হলে যে লোকটা কমিউনিস্ট ইউনিয়ন থেকে বার বার তার বাড়িতে আসছে তার রহস্য না জানা পর্যন্ত সে স্বস্তি পেত না। কিন্তু অনেক মাসের আলস্যে বন্ডের মানসিক সতর্কতা ঢিলে হয়েছে।
দিনের মধ্যে ব্রেকফাস্টই তার সবচেয়ে প্রিয়। লন্ডনে থাকার সময়ে ব্রেকফাস্ট খেত চিনি না দিয়ে দু পেয়ালা কালো কড়া কফি আর সাড়ে তিন মিনিট ধরে একটা সিদ্ধ ডিম।
মধু দিয়ে ব্রেকফাস্ট শেষ করে সে তার বর্তমান জড়িমা আর মনমরা ভাবের কারণ খুঁজল বন্ড। প্রথমে সেই তিফানির ব্যাপারটা। অনেক দিন একসঙ্গে মহানন্দে কাটাবার পর প্রেমিকা তাকে ছেড়ে চলে যায় আমেরিকায়। তার জন্য এখন মন কেমন করে। একঘেয়ে রুটিন মাফিক কাজ করে নিজের সেক্রেটারি আর সহকর্মীদের সঙ্গে তিক্ত আর নীরস গলায় কথা বলে তার সময় কাটছে।
এমন কি M-ও তার অধীনস্থ বদ মেজাজী খাঁচায় বন্দী বাঘের ওপর অসহিষ্ণু হয়ে উঠছেন। সেই সপ্তাহের সোমবার একটা কড়া নোটে বন্ডকে তিনি জানালেন পে-মাস্টার ক্যাপ্টেন ট্রপের অধীনে এক তদন্ত কমিটিতে তাকে নিয়োগ করা হয়েছে। নোটে তিনি জানালেন, গুপ্তচর বিভাগের একজন সিনিয়র অফিসার হিসাবে গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সমস্যার দিকে মন দেবার সময় বন্ডের হয়েছে। সদর দপ্তরে কাজের লোকের অভাব এবং ০০ সেকশনের হাতে এখন কোন কাজ নেই। সেদিন দুপুরে আড়াইটেতে ৪১২ নম্বর ঘরে বন্ডকে হাজির হতে হবে।
সিগারেট ধরিয়ে বন্ড ভাবল তার বর্তমান অসন্তোষের কারণ টুপ নামে লোকটা, সবাইকে সে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে মারে।
প্রত্যেক বড় বড় প্রতিষ্ঠানে এমন একজন স্বেচ্ছাচারী শাসক থাকে যাকে সবাই জুজুর মত ভয় করে। মনে প্রাণে অপছন্দ করে। সাধারণত সেই লোকটা হয় জেনারেল ম্যানেজার, নয় শাসন বিভাগের প্রধান। তাকে বাদ দিয়ে অফিসের কাজ অচল।
প্রত্যেক সুপরিচালিত প্রতিষ্ঠানে এরকম একজন করে লোক থাকে। গুপ্তচর দপ্তরে সেই পদের অধিকারী হচ্ছে পে মাস্টার ক্যাপ্টেন টুপ। নৌবাহিনীর অবসর প্রাপ্ত অফিসার আপাতত প্রশাসন বিভাগের প্রধান। তার কাজ সবকিছু পরিপাটি রাখা।
ক্যাপটেন ট্রপের ডিউটি এমনি জাতের, যাতে এই প্রতিষ্ঠানের সবার সাথে তার সম্পর্কটা বিরোধের পর্যায়ে দাঁড়িয়েছে। এই কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে টুপ ছাড়া M-এর মাথায় যে আর কোন নাম আসেনি–সেটা বিশেষ দুঃখজনক।
গুপ্তচর বিভাগে বুদ্ধিজীবিদের নিয়োগ করা নিয়ে ট্রপের সঙ্গে বন্ডের খিটিমিটি লেগে গেল। বন্ড প্রস্তাব করল M 15 এবং গোয়েন্দা পারমাণবিক যুগের বুদ্ধিজীবি গুপ্তচরদের সঙ্গে সত্যিকারের লড়তে হলে সে কাজ ভারতীয় আর্মির অবসরপ্রাপ্ত অফিসারদের দিয়ে হবে না।
ট্রুপ অত্যন্ত ঠাণ্ডা গলায় বলল, আপনার প্রস্তাব তাহলে আমাদের প্রতিষ্ঠানে লম্বা চুলওলা বিকৃতকামদের নিয়োগ করা। নিঃসন্দেহে এটা একটা মৌলিক মত। আমার ধারণা ছিল এ বিষয়ে আমরা সবাই একমত যে নিরাপত্তার সবচেয়ে বড় শত্রু হচ্ছে সমকামী মানুষ। আমি কল্পনা করতে পারছি না সেন্টে ভেজা ঝাকড়া চুল এ ধরনের মেয়েলী পুরুষদের হাতে আমেরিকানরা ভুরি ভুরি পারমাণবিক গোপন তথ্য তুলে দেবে কি করে।
সব বুদ্ধিজীবীরাই সমকামী নয়। তাদের অনেকের মাথাতেই বড় বড় টাক। আমি শুধু বলতে চাই যে…এইভাবে তিনদিন ধরে তর্ক বিতর্ক চলছিল। কমিটি অন্যান্য সদস্যরা মোটামুটি ট্রপের স্বপক্ষে। আজ তাদের সুপারিশের রিপোর্ট লিখতে হবে। সংখ্যালঘুদের রিপোর্টে নাম স্বাক্ষর করে অধিকাংশ লোকের-বিরাগ ভাজন হবে কিনা বন্ড ভাবছিল।
সকাল নটায় তার ফ্ল্যাটের সিঁড়ি দিয়ে নেমে নিজের গাড়িতে উঠতে ভাবছিল–গোটা প্রশ্নটা নিয়ে তার সত্যিকারের মাথাব্যথা কতটুকু? একলা সে বিরোধিতা করবে? সেকি একঘেয়েমির দরুন এতই ক্লান্ত যার জন্য নিজের প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সবার বিরাগ ভাজন হবে? ভেতরে সে অস্থির হয়ে উঠল। তার বেনটলির সেলফ-স্টার্টারে চাপ দিল। সঙ্গে সঙ্গে গাড়িটার দুটো এগজস্ট গর্জে উঠল। আর সেই সঙ্গে বন্ডের মনে পড়ল অদ্ভুত সেই প্রচলিত লাইনটা–আল্লাহ যাকে ধ্বংস করতে চান প্রথমে তাকে তিনি ফেলেন মানসিক একঘেয়েমির মধ্যে।
