কিন্তু শোনা যায় ক্কচিৎ কখনো লোক SMERSH-এর যন্ত্রণা বেশিক্ষণ সহ্য করতে পারত, শেষ পর্যন্ত সহ্য করার তো কথাই ওঠে না। তার সেই মিষ্টি স্বর যখন শান্তির প্রতিশ্রুতি দিত প্রায় সময়ই সেটা হত সফল। কারণ, কিভাবে যেন রোজা ক্লেব মায়ের প্রতিমূর্তি হয়ে উঠে, মিষ্টি কথা বলে তাদের মন গলাত।
তারপর সেই সন্দেহজনক লোকের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করে টুলটা হাতে নিয়ে অফিসে ফিরে রোজা ক্লেব তাজা রক্তে ভেজা গাউন খুলে নিজের কাজে বসত। ব্যাপারটা চুকে গেছে খবর এলে আমার স্বাভাবিক কাজকর্ম শুরু হত।
নিজের চিন্তায় ভয়ে সিটিয়ে তাতিয়ানা আবার ঘড়িটা দেখল। আর মাত্র চার মিনিট বাকি। ইউনিফর্মের ওপর হাত বুলিয়ে আর একবার আয়নায় তাকাল। তার প্রিয় পরিচিত ছোট্ট ঘরের কাছে মনে মনে বিদায় নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল।
লম্বা করিডোর দিয়ে সোজা হেঁটে গিয়ে সে লিফটে ঢুকল। কাঁধ ঝাঁকিয়ে মুখ তুলে এমনভাবে সে ঢুকল যেন সেটা গিলোটিনের তক্তা।
মেয়ে অপারেটরকে সে বলল, আটতলা। শৈশবের পর থেকে সে যা করেনি তাই করল। মনে মনে বারবার বলতে লাগল। হে আল্লাহ–হে আল্লাহ্।
.
মৃত্যু প্রণয়
দরজাটা ক্রিম রঙের। তার ওপর কোন নাম লেখা নেই। ঘরের ভেতরকার গন্ধ তাতিয়ানার নাকে এল। নীরস গলায় কে যেন তাকে ভেতরে আসতে বলল। দরজাটা সে খুলল। আবার সেই গন্ধ। ঘরের মাঝখানে আলোর নিচে একটা টেবিল। তার পেছনে এক মহিলা বসে। তাতিয়ানার দিকে এক জোড়া হলুদ রংয়ের চোখ, যে চোখ শুধু অপরকে দেখে, যাচাই করে। কিন্তু নিজের কথা কিছু জানায় না। ক্যামেরার লেন্সের মত চোখদুটো তার ওপর ঘুরতে লাগল।
ক্লেব বলল, কমরেড কর্পোরাল, তুমি ভারি সুন্দরী। ঘরের মধ্যে কয়েকবার পায়চারি কর। এই মিষ্টি-মিষ্টি কথাগুলোর অর্থ কি? এই মহিলার কুখ্যাত রুচির কথা তাতিয়ানার জানা আছে। তাতিয়ানা পায়চারি করতে শুরু করল।
জ্যাকেটটা খোলো। চেয়ার রাখো। মাথার ওপরে হাত তোলো। আরো ওপরে। এবার নিচু হয়ে বসে পায়ের বুড়ো আঙুল ছোঁও। খাড়া হয়ে দাঁড়াও। চমৎকার। বস ডাক্তারের মত কথা বলছিল ক্লেব। তার টেবিলের সামনের চেয়ারটা দেখিয়ে তারপর সে ফাইলে ঝুঁকে পড়ল।
এটা নিশ্চয়ই আমার ব্যক্তিগত ফাইল, তাতিয়ানা ভাবল। নিজের সম্বন্ধে কি সব সেখানে লেখা জানবার কৌতূহল হলে অবাক চোখে খোলা ফাইলটার দিকে তাকাল।
ফাইলের পাতাগুলো ফরফর করে উলটে ক্লেব মলাট বন্ধ করল, কমরেড কর্পোরাল রোমানোভা, তোমার কাজের আমি ভাল রিপোর্ট পেয়েছি। রেকর্ড তোমার খুবই ভাল ডিউটিতেও। খেলাধুলোতেও। আমাদের রাষ্ট্র তোমার ওপর খুব খুশি।
নিজের কানকে তাতিয়ানা বিশ্বাস করতে পারল না। এই অপ্রত্যাশিত কথা শুনে তার মাথা ঘুরে উঠল। তারপরে ধরা-ধরা কাটা কাটা স্বরে বলল। ক-কমরেড কর্নেল, আ-আমি ভারি কৃতজ্ঞ।
তোমার কাজ খুবই ভাল তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটা কাজের জন্য তোমাকে বাছাই করা হয়েছে। তোমার পক্ষে এটা ভারি সম্মানের ব্যাপার। বুঝলে?
হ্যাঁ, কমরেড কর্নেল, বুঝেছি।
এই কাজের অনেক দায়িত্ব। এর পদমর্যাদাও উঁচু। কমরেড কর্পোরাল, কাজটা হাসিল করার পর তুমি রাষ্ট্র নিরাপত্তার ক্যাপ্টেন পদে প্রমোশন পাবে। তোমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছি।
চব্বিশ বছরের মেয়ের পক্ষে এটা অভাবনীর ঘটনা। তাতিয়ানা যেন একটা বিপদের আঁচ পেল। মাংসের টুকরোর তলায় ইস্পাতের ফাঁদ দেখলে জন্তুরা যে রকম সিঁটিয়ে ওঠে সেই রকমই সিঁটিয়ে উঠল সে, কমরেড কর্নেল, নিজেকে আমি অত্যন্ত সম্মানিত বোধ করছি। তার স্বর অত্যন্ত সতর্ক।
রোজা ক্লেবের গলা থেকে একটা অর্থহীন ঘড়ঘড় স্বর বেরুল। এই জরুরি তলব শুনে মেয়েটির মনোভাব যে কি হয়েছিল। তারপরেই সদাশয় অভ্যর্থনা, সুসংবাদে মানসিক নিশ্চিতা, তারপরেই আবার ভয় পাওয়া। এখন তাকে স্বাভাবিক করার জন্য ক্লেব মধুর স্বরে বলল, দেখেছ কি রকম আমার ভুলো মন! তোমার পদোন্নতির সম্মানে নিশ্চয়ই এক গ্লাস মদ খাওয়া দরকার। তুমি কক্ষনো ভেবো না, আমরা, যারা সিনিয়র অফিসার তারা অমানুষ। একসঙ্গে আমরা ড্রিঙ্ক করব। এক বোতল ফরাসী শ্যামপেন খোলার এটা খুব ভাল অজুহাত।
রোজা ক্লেব আলমারির কাছে গেল, এই একটা চকোলেট চেখে দেখ। ততক্ষণ আমি বোতলের ছিপিটা খুলি। শ্যাম্পেনের ছিপি খোলার কাজে আমাদের পুরুষের সাহায্যের দরকার–তাই না?
তাতিয়ানার সামনে এক বাক্স চকোলেট রেখে রোজা ক্লেব বকবক করতে লাগল। চকোলেটগুলো সুইটজল্যান্ড থেকে এসেছে। সেখানকার সবচেয়ে ভাল চকোলেট। তাতিয়ানা একটা গোল চকোলেট তুলে নিল। শ্যামপেন দিয়ে চকোলেট গেলা আরও সহজ।
রোজা ক্লেব পাশে এসে খুশি মনে মুখে তুলে ধরল তার গ্লাসটা, বলল, আন্তরিক ধন্যবাদ কমরেড তাতিয়ানা।
রোজা ক্লেব সাথে সাথে তার গ্লাসটা ভরল। কমরেড, এবার তোমার নতুন ডিপার্টমেন্টের শুভ কামনা করছি। SMERSH-এর শুভ হোক।
গ্লাস ভরা-শ্যামপেন তুলে তাতিয়ানা বলল, SMERSH-রে শুভ কামনা করছি। শ্যামপেনটা গিলতে গিয়ে সে বিষম খেল।
ক্লেব তাকে মোটেই সময় দিল না। তার সামনে টেবিলে হাত রাখল সে, কমরেড, এবার কাজের কথা পাড়ি। সামনে অনেক কাজ। কমরেড, বিদেশ যাবার কথা কখনো ভেবেছ সেখানে যাবার, থাকবার কথা?
