হাত মুছতে মুছতে ওয়াশট্যান্ডের ওপরকার বড় আয়নার নিজেকে দেখলেন।
তার প্রথম জীবনে এক ছেলে বন্ধু বলেছিল তাকে দেখতে তরুণী গ্রেটা গার্বোর মত। এবার সে খাবার খেতে বসল। আসলে কর্পোরাল তাতিয়ানা রোমানোভা ভারি সুন্দরী মেয়ে। তিনি দীর্ঘাঙ্গী, মজবুত শরীর, হাঁটার ভঙ্গী অত্যন্ত লালিত্যপূর্ণ। লেনিনগ্রাদের স্কুলে তিনি নাচ শিখেছিলেন। সেখানেই তিনি সাবলীলভাবে হাঁটতে ও দাঁড়াতে শিখেছিলেন। ফিগারস্কেটিং-এ তার ভারি ঝোঁক। ডিনামোর বরফ স্টেডিয়ামে বার বছর তিনি অনুশীলন করেন। তাই দেখলে মনে হয় তার সর্বাঙ্গ দিয়ে যেন স্বাস্থ্য উপছে পড়ছে। ব্যায়াম করার দরুণ তার নিতম্বের পেশীগুলোর একটু বেশি কঠিন পুরুষালি ভাব।
মহিলাটি একটি ছোট চীনেমাটির বাটিতে ঘন সুপ ঢেলে তার মধ্যে খানিকটা কালো রুটি ফেলে জানালার পাশে বসে চকচকে একটা সুন্দর চামচ দিয়ে খেতে লাগলেন। কয়েক সপ্তাহ আগে এক সন্ধ্যেয় মসক হোটেলে এক উৎসব মুখর পার্টিতে গিয়ে চামচেটা তার ব্যাগের মধ্যে হাতিয়ে এনেছিল।
খাওয়া শেষ হলে নিজের চেয়ারে ফিরে এসে তিনি সিগারেট ধরালেন। এমন সময়ে টেলিফোন বেজে উঠল। তিনি রিসিভারটা তুলে নিলেন।
কর্পোরাল রোমানোতা?
স্বরটা তার প্রিয় প্রফেসর ডিনিকিনের। কিন্তু তিনি তো অফিসের বাইরে সর্বদাই তাকে তাতিয়ানা বা তানিয়া বলে ডাকেন। এর মানে কি?
মেয়েটি চাপা উত্তেজনায় বলল, হ্যাঁ, কমরেড প্রফেসর।
লাইনের ওপাশের স্বরটা অস্বাভাবিক। পনের মিনিটের মধ্যে, ঠিক সাড়ে আটটায়, ২ নং বিভাগের কমরেড কর্নেল ক্লেবের সঙ্গে তোমাকে দেখা করতে হবে। তোমার বাড়ির আটতলায় তার অ্যাপার্টমেন্ট নং ১৮৭৫-এ যাবে। বুঝলে?
কিন্তু, কমরেড, কেন? কি ব্যাপার?
তার প্রিয় প্রফেসর অস্বাভাবিক আড়ষ্ট স্বরে বলল, কমরেড কর্পোরাল, ব্যস। আর কোন খবর নেই।
মেয়েটি অত্যধিক জোরে উত্তেজিতভাবে রিসিভার চেপে ধরল, হ্যালো! হ্যালো! কিন্তু কিছু না…ধীরে ধীরে নিচু হয়ে রিসিভারটা নামিয়ে রাখল।
ভয়ে মেয়েটি ফাঁকা দৃষ্টিতে কালো যন্ত্রটার দিকে তাকিয়ে রইল। মেয়েটি জানে যে সব ফোন বাড়িতে কিংবা বাড়ির বাইরে যাচ্ছে তার প্রতিটি শব্দ হয় কেউ শুনছে নয় রের্কড করে নেওয়া হয়। তাই কেউ প্রয়োজনের অতিরিক্ত কথা বলে না। এটাই রাষ্ট্রের ব্যাপার। এ ধরনের খবর লোকে যত তাড়াতাড়ি পারে আর যত কম কথায় সম্ভব সেটা পাঠিয়ে হাত ধুয়ে ফেলে।
মেয়েটি ভাবনার জগতে পড়ে গেল। কিসের জন্য তার ডাক পড়েছে কি সে করেছে। কাজে কি দারুণ ভুল করেছে হাল ছেড়ে কাঁধ ঝাঁকিয়ে সে সবচেয়ে ভাল ইউনিফর্মটা বের করার জন্য আলমারির কাছে গেল। এ ধরনের ব্যাপারে SMERSH কাউকে ডাকে না। নিশ্চয়ই ব্যাপারটা অনেক বেশি গুরুতর।
সে ভিজে চোখে ঘড়ির দিকে তাকাল। আর মাত্র সাত মিনিট বাকি। নতুন একটা আতঙ্কে সে সিঁটিয়ে উঠল। তাড়াতাড়ি প্যারেডের ইউনিফর্মটা বার করল। এর ওপর যদি আবার যেতে দেরি হয়?
পোশাক পরতে পরতে, মুখ ধুতে ধুতে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে এই অশুভ রহস্যটার কথা সে ভেবেই চলল।
তার অপরাধ যাই হোক না কেন, SMERSH-এর ক্লেদাক্ত সংস্পর্শে আসার কথা চিন্তাই করা যায় না। এই ভয়ঙ্কর প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যেটা জঘন্যতম তার নাম ২ নং বিভাগ যন্ত্রণা ও মৃত্যুর বিভাগ। তার প্রধান যে মহিলা, রোজা ক্লেব, তার সম্বন্ধে লোকে ফিসফিস করে বলাবলি করে। সেগুলো তাতিয়ানা দুঃস্বপ্ন। দিনের বেলায় ভুলে যায় কিন্তু এখন সেগুলো মনে পড়ল।
জনরব, তার অবর্তমানে স্বীকারোক্তি আদায়ের জন্য লোকের ওপর নিষ্ঠুর উৎপীড়ন চালাতে রোজা দিত না। তার অফিসে ছিল রক্তের দাগধরা একটা গাউন আর নিচু একটা টুলে। বাড়ির ভূগর্ভস্থ পথে সেই গাউনটা পরে টুল হাতে নিয়ে তাকে দ্রুতপায়ে যেতে দেখলে কথাটা মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়ত। এমন কি SMERSH এর কর্মচারিরাও গলা নামিয়ে ঝুঁকে পড়ত তাদের কাগজপত্রের ওপর। যতক্ষণ না সে ফিরে আসত ততক্ষণ ইষ্টনাম জপত।
লোকে ফিসফিস করে বলত, জেরার টেবিল থেকে ঝুঁকে পড়া পুরুষ বা নারীর মুখের নিচে টুলটা রেখে তার ওপর ধপ করে বসে সেই মুখের দিকে তাকিয়ে ক্লেব শান্তগলায় বলত ১ নং অথবা ১৫ নং বা ২৫ নং । জেরাকারীরা বুঝত তার কথার মানে। তারা সেই মত কয়েক ইঞ্চি দূরে থেকে ক্লেব লক্ষ্য করত তাদের চোখ, তাদের আর্তনাদ ভরা শ্বাস-প্রশ্বাসের ঘ্রাণ এমনভাবে সে নিত যেন সৌরভ নিচ্ছে। চোখগুলোর ভাবান্তর দেখে সে বলত–এখন ৩৬ নং অথবা এখন ৬৪ নং । জেরাকারীরা তখন শুরু করত অন্য ধরনের মার। চোখের সাহস আর সহ্যশক্তির চাউনি মিলিয়ে গেলে, লোকেরা দুর্বল গলায় কাকুতি মিনতি শুরু করলে সে মধুর স্বরে বলত, সোনা মানিক আমার, আমাকে কথাগুলো বল। তাহলেই এটা থামবে। আমি জানি মানিক, খুব কষ্ট হচ্ছে। মা তোমার পাশে রয়েছে যন্ত্রণাটা থামার অপেক্ষায়। তোমার জন্য ভারি সুন্দর নরম বিছানা পেতে রেখেছে। তাতে তুমি ঘুমোবে আর সবকিছু ভুলে যাবে। কথাগুলো বল। তারপর ফিসফিস করে স্নেহমাখানো গলায় বলত, কথাগুলো বললেই তুমি শান্তি পাবে, আর কোন যন্ত্রণা থাকবে না। মানিক, তুমি কিন্তু ভারি বোকামি করছ। সোনা আমার, কথাটা বিশ্বাস হচ্ছে না? তাহলে তোমার মাকে আর একটু ৮৭ নং চেষ্টা করতে হবে। জেরাকারীরা কথাগুলো শুনে তাদের যন্ত্রপাতি আর লক্ষ্যস্থল বদলাতো।
