ইরমার চোখে কিছু বোঝা গেল না। না, ওতে কিছু যায় আসবে না। তবে ভবিষ্যতে যদি কিছু জিনিসের দরকার। লাগে বোতাম টিপে বেয়ারাকে বললেই আপনি পেয়ে যাবেন। কাউন্টের আদেশ আছে আপনি যেন সব সুবিধাই পেয়ে যান। আচ্ছা আপনি টেরাসে যান, সেখানেই এবার খাওয়ার জায়গা হয়েছে। আপনার টেবিল ওরাই দেখিয়ে দেবে। এখুনি এসে পড়ব আমি।
বন্ড দরজা ঠেলে রেস্তোরাঁতে ঢুকে পড়ল কয়েকটি টেবিলে লোক বসে থাকতে দেখা গেল। ফ্রিঞ্জ তাকে দেখেই এগিয়ে এল সামনে। ঠাণ্ডা চোখে তারদিকে তাকিয়ে বলে উঠল, আমার পেছনে আসুন। সে রেলিং-এর পাশে তার নির্দিষ্ট টেবিলে গিয়ে বসল। রুবি ও ভায়োলেট বসে আছে। তার পাশের টেবিলে বন্ড ওদের দেখে স্বস্তি পেল। সৃষ্টিকর্তা! সত্যি তাকে আরো সাবধান হতে হবে। এবার সে কোন রকমে বেঁচে গেছে। প্ল্যাসটিক সম্পর্কে সে যা বলল তা কি সত্যি নির্দোষ শুনিয়েছে? সে কি বোকার মত পরিচয় দিল? বন্ড বসল, ডবল ভদকা-মাটিনির অর্ডার দিল। চেয়ার সরিয়ে টেবিলের নিচে রুবির পায়ের সাথে পা ঠেকাল। রুবি পাটা সরিয়ে না নিয়ে হাসল, সবাই আবার এক সাথে কথা বলতে শুরু করে দিল। হঠাৎ বন্ডের মনে হল দিনটি খুব ভাল।
ইরমা বান্ট এসে পড়ল, চেয়ারে বসে পড়ল আর সে ও খুব শান্ত হয়ে বলল, শুনে কি যে ভাল লাগছে স্যার হিলারী। আপনি আরো একসপ্তাহ থাকছেন। আপনার কাউন্টকে কেমন লাগল। বেশ ভাল লোক তাই না?
হ্যাঁ, খুবই চমৎকার লোক। কিন্তু আমার অতি দুর্ভাগ্য যে ওনার সাথে বেশিক্ষণ কথা হয়নি। শুধু কাজের কথাটাই হল। কাউন্টের গবেষণার বিষয়ে জানার ইচ্ছে আমার খুবই হয়েছিল। আমাকে খুব বেশি অভদ্র বলে কাউন্ট মনে করেননি তো?
না, অবশ্যই না। তবে কাউন্ট সাধারণতঃ তাঁর কাজ নিয়ে কারো সাথে আলোচনা করতে চান না। এইসব সূক্ষ্ম পরীক্ষা-নিরীক্ষার গোপন তথ্য প্রকাশ হয়ে যাবার সম্ভাবনা থাকে। অবশ্য এই জন্য আপনি আবার ভাববেন যে আমি। কটাক্ষ করে বলছি। লোকালয়ের বাইরে পাহাড়ের নিস্তব্ধতায় আমরা একান্তভাবে আমাদের এই গবেষণা করে থাকি। এমন কি পুলিশও আমাদের সাথে সহযোগিতা করে চলেছে, বাইরের লোককে এখানে ঢুকতে দেওয়া হয় না। কেউ যেন কাউন্টের কাজের গুরুত্ব বুঝতে না পারে।
বিশেষ ভাবে অ্যালার্জি নিয়েই তো তোমাদের এই গবেষণার বিষয়?
হ্যাঁ, তাই।
একটি লোক মেনু হাতে করে তাদের জন্য অপেক্ষা করছে। বন্ডের পানীয় এল, মেনু দেখে খাবারের অর্ডার দিয়ে দিল সে। রুবি ও ভায়োলেট চিকেন, অয়োলেটের জন্য আলু প্রচুর পরিমাণে থাকবে। ইরমার জন্য সেই চীজ ও স্যালাড।
তোমরা কি চিকেন আর আলু ছাড়া আর কিছু খাও না? বন্ড মেয়েদের আবার জিজ্ঞেস করল, অ্যালার্জির ব্যাপারে কিছু আছে না কি?
রুবি বলে ফেলল, যা, তা কিছুটা বটে, তবে–।
ইরমা কড়া গলায় বলল, না চিকিৎসা সম্বন্ধে কোন আলোচনা নয়, মনে আছে তো? এমন কি আমাদের বন্ধু স্যার। হিলারীর সাথেও নয়। সে একটু হাসার চেষ্টা করল মাত্র। এখানে নানা ধরনের লোক দেখতে পাবেন স্যার হিলারী। আর সবাই হল সমাজের উচ্চশ্রেণীর লোক। ঐ যে কোণায় একটা টেবিল দেখছেন? ডিউক অব মার্লবরো। পাশে বসে মিস্টার হুইটনী আর লেডী ডাফনী স্ট্রেইট। ওরা খুব সুন্দর দেখতে না? দুজনেই সুন্দরী স্কী করতে পারেন। আর ঐ যে দেখছেন যার লম্বা চুল, খুব সুন্দরী, ওর নাম হল উরসুলা আসে, ফিল্ম স্টার। কি অপূর্ব ট্যান-করা চামড়া, দেখছেন। তো? এদের পাশে আছে স্যার জর্জ ডানবার। শুধু বাকি আছেন আগা খা আর হয়ত আপনাদের ডিউক অফ কেস্ট। খুব একটা চাঞ্চল্যকর ব্যাপার, তাই না বলুন?
হ্যাঁ, সত্যিই তো।
লাঞ্চ চলে এল। খাওয়া শুরু করল তারা। বন্ড মনে মনে রান্নার প্রশংসা করল। চমৎকার তৈরি হয়েছে সব রান্না। ইরমা বান্টের কাছেও রান্নার প্রশংসা করে গেল সে।
ধন্যবাদ, ইরমা বলল, রান্না করে তিনজন ফরাসী, ভারী পাকা তাদের হাত। আসলে পুরুষরা রান্না করে খুবই ভাল, তাই না? বন্ড উত্তর দেবার পূর্বেই একটি লোক তাদের টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। বন্ডের মতই তার বয়স হবে। মিলিটারির মত হাবভাব। মেয়েদের উদ্দেশ্যে একটু মাথাটা নিচু করল, তারপর বন্ডকে বলল, ক্ষমা করবেন, ভিজিটরস বইতে আপনার নামটা হঠাৎ চোখে পড়ে গেল হিলারী ব্রে, নয় কি?
বন্ড একটু মুচড়ে পড়ল, অবশ্য এমন অবস্থা যে হতে পারে সেটা সে আগেই আন্দাজ করে নিয়েছিল। তবু, একটু মস্কিলে সে পড়ে গেল। আর স্ত্রী লোকটির হলুদ চোখ জোড়া তার দিকে একেবারে স্থির হয়ে আছে।
হ্যাঁ, কেন বলুন তো? প্রফুল্ল স্বরে বন্ড বলল।
স্যার হিলারী ব্রে? একজন অপরিচিত লোকের মুখে রীতিমত বিস্ময় লাগল। বন্ড উঠে দাঁড়াল, টেবিলের দিকে পিছন ফিরে এমনভাবে দাঁড়াল যাতে ইরমা বান্ট তার মুখটা দেখতে না পারে। হ্যাঁ, ঠিকই বলেছেন, পকেট থেকে একটা রুমাল বার করে সে তার নাকটা ঝেড়ে নিল। তার পরের প্রশ্নটার জন্য তৈরি হল। যুদ্ধের সময় লোভাট স্কাউটের দলে তুমিই ছিলে না?
আরে, সে আপনি আমার আপন চাচাতো ভাইয়ের কথা বলছেন তো? সে গলার স্বরটা একটু নিচু করল। বেচারা ছয় মাস আগে মারা গেছে। আমিই তো তার উপাধিটা পেয়ে গেছি।
ইশ! কি দুঃখের কথা, তার বিস্ময়টা কেটে গিয়ে দেখা গেল বেদনা। আমরা এক সাথে পাশাপাশি যুদ্ধ করেছি, আমার খুবই বন্ধুত্ব হয়েছিল। টাইমস পত্রিকার খবরটা কিনা আমার চোখে পড়ল না। আমি জন্ম, মৃত্যু ও বিবাহের খবরগুলি তো বিশেষভাবে দেখে থাকি।
