পার্শ্বচরের সঙ্গে কর্নেল নিকিতিন তাড়াতাড়ি ফিসফিস করে আলোচনা করলেন। তারপর বললেন, বিশেষ আর নতুন খবর নেই। আমাদের বিশ্বাস হীরে নিয়ে চোরা কারবারের কোন-একটা ব্যাপারে সে জড়িত ছিল। সেটা গত বছরের কথা। ব্যাপারটা আফ্রিকা আর আমেরিকার মধ্যে। ফাইলে হয়তো আরো খবর আছে আমি আর খবর জানি না।
G মাথা নাড়লেন। সবচেয়ে কাছের টেলিফোনের রিসিভারটা তুলে, সেন্ট্রাল ইনডেক্সঃ জেনারেল বোজাবয়শ্চিকভ কথা বলছি। ইংরেজ গুপ্তচর বন্ডের ফাইল। বিশেষ জরুরি। রিসিভারটা নামিয়ে সবাইর দিকে কর্তৃত্বের দৃষ্টিতে তাকিয়ে বললেন, কমরেডস, নানা দিক দিয়ে মনে হচ্ছে টার্গেট হিসাবে এ লোকটাই সবচেয়ে উপযুক্ত। আমাদের রাষ্ট্রের বিপজ্জনক শক্ত, তাকে, খতম করলে আমাদের সব গুপ্তচর বিভাগ উপকৃত হবে। তাই না? কনফারেন্স থেকে একটা ঘড়ঘড় শব্দ হল।
লোকটা মরলে ইংল্যান্ডের গুপ্তচর বিভাগের খুব ক্ষতি হবে। তার চেয়ে বেশি কিছু কি হবে? তার সম্বন্ধে চলতি যে সব গল্প-গুজব সেটা কি ধ্বংস হবে লোকটা কি তার দেশ আর প্রতিষ্ঠানে হিরো?
জেনারেল ভজদভিশেনস্কি বুঝলেন প্রশ্নটা তার উদ্দেশ্যে, তিনি বললেন, ফুটবল বা ক্রিকেট খেলোয়াড় কিংবা জকি না হলে ইংরেজরা কাউকে হিরো বলে স্বীকার করে না। গুপ্তচর বিভাগের মধ্যে হিরো হতে হলে, নির্ভর করে তার চেহারা আর ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্যের ওপর। লোকটা দেখতে যদি মোটা তেল চুকচুকে আর কদাকার হয় তাহলে কেউ তাকে হিরো বলে মনে করে না, তা সে যতই কাজের ক্ষেত্রে সফল হোক না কেন।
বাধা দিয়ে নিকিতিন বললেন, যে সব ইংরেজ গুপ্তচরদের আমরা ধরেছি তারা এই লোকটার প্রসংশায় পঞ্চমুখ। তাদের গুপ্তচর বিভাগের সবাই তাকে শ্রদ্ধা করে। সবাই বলে, মানুষটা খুব ধূর্ত, একলা কাজ করে, চেহারাটাও খুব সুন্দর।
অফিসের নিজস্ব টেলিফোন বাজলে G সেটা তুলে বললেন, নিয়ে এস। দরজায় টোকা দিয়ে তার পার্শ্বচর একটা ফাইল নিয়ে এল। G-র সামনে ডেস্কের ওপর ফাইলটা রেখে দরজা বন্ধ করে চলে গেল।
ফাইলের মলাটটা চকচকে কালো। ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত কোণাকুণি সাদা ডোরাকাটা। ওপরের বাঁ দিকে দুটো সাদা অক্ষর s s –অর্থাৎ অত্যন্ত গোপনীয়। মাঝখানে সাদা অক্ষরে লেখা : জেমস বন্ড। তার নিচে লেখা? ANGLISK SPION অর্থাৎ ইংরেজ গুপ্তচর।
G ফাইল খুলে ফটোগ্রাফ ভরা বড় একটা খাম বের করলেন। ডেস্কের ওপরকার কাঁচের ওপর সেগুলো ঢাললেন। তারপর একটা একটা করে খুটিয়ে দেখলেন, মাঝে মাঝে একটা ম্যাগ্নিফাইং গ্লাস দিয়ে। নিজের দেখা হলে ছবিগুলো নিকিতিনকে দিলেন। নিকিতিন তার পাশের জনকে, এভাবে ছবিগুলো সবার হাত ঘুরে চলল।
প্রথম ছবিটা ১৯৪৬ সালের। ছবিটা এক যুবকের। একটা কাফের বাইরের টেবিলের সামনে রোদে সে বসে রয়েছে। টেবিলে একটা লম্বা কাঁচের গ্লাস আর সোডার পানির সাইফন। ডান হাত টেবিলের ওপর আর আঙুলের ফাঁকে একটা সিগারেট। পা দুটো এমন ভঙ্গীতে ভাঁজ করা যা ইংরেজরাই করে থাকে। বাঁ হাত দিয়ে ডান পায়ের গাঁটটা সে চেপে ধরেছে, ভঙ্গীটা অমনযোগীর। লোকটা টের পায়নি যে তার ফটো তোলা হচ্ছে।
পরের ছবির তারিখ ১৯৫০। ছবিটায় দেখা যাচ্ছে শুধু মুখ আর কাঁধ, কিন্তু ছবিটা একই লোকের। ছবিটা ক্লোজ আপ। চোখ কুঁচকে সতর্কভাবে বন্ড কিছু একটা দেখছে।
তৃতীয়টার তারিখ ১৯৫১। খুব কাছে বাঁ দিক থেকে তোলা। সেই একই লোক। পরনে কালচে স্যুট, একটা চওড়া পথ দিয়ে হেঁটে চলেছে। ওপাশে একটা বন্ধ দোকান। লোকটার খুব তাড়া, ভাবভঙ্গি বিপজ্জনক। G ভাবলেন ছবিটা কোন গাড়ি থেকে তোলা।
চতুর্থ এবং শেষ ছবিটা তোলা ১৯৫৩-তে। ছবিটা এনলার্জ করা। কোন সীমান্তে বা কোন হোটেলের দ্বাররক্ষীর কাছে বন্ড যখন তার পাসপোর্ট দাখিল করছে তখন তোলা। ৫ ম্যাগনিফাইং গ্লাস দিয়ে ছবিটা খুব খুটিয়ে দেখলেন।
লোকটার মুখ সুগঠিত। তার ডান গালের রোদে-পোড়া চামড়ার ওপর তিন ইঞ্চি পরিমাণ একটা সাদা ক্ষতের দাগ। সোজা কালো দীর্ঘ ভুরুর নিচে চোখ দুটো স্থির। তার ঘন কালো চুল বাঁ-দিকে সিথি করে এলোমেলোভাবে বুরুশ। করা। নাকটা টিকলো। ওপরকার ঠোঁট চাপা। দুটো ঠোঁটই সুন্দর, কিন্তু নিষ্ঠুর ধরনের। তার চোয়ালের গড়ন দৃঢ়।
G ছবিটা দেখে বুঝলেন দৃঢ় সংঙ্কল্প, কর্তৃত্ব আর নিষ্ঠুরতার ছাপ। লোকটার চরিত্রের আর কোন বৈশিষ্ট্য নিয়ে তিনি মাথা ঘামালেন না। টেবিলের অন্যদিকের কাছে ছবিটা এগিয়ে দিয়ে ফাইলের পাতাগুলো দ্রুতহাতে উলটে চললেন।
ফাইলের এক জায়গায় আঙুল রেখে গম্ভীরস্বরে তিনি বললেন, দেখে মনে হচ্ছে লোকটা দুর্দান্ত। তার সম্বন্ধে ফাইলের কয়েকটা অংশ পড়ে শোনাচ্ছি, তারপর কি কর্তব্য আমাদের স্থির করতে হবে। প্রথম পাতাটা খুলে তিনি পড়লেন?
প্রথম নাম জেমস্। লম্বা ও ১৮৩ সেন্টিমিটার। ওজন : ৭৬ কিঃ গ্রাম। চেহারা ছিপছিপে। চোখ ও নীল। চুল কালো। ডান গাল আর বা কাঁধে ক্ষত-চিহ্ন। ডান হাতের পেছনে প্লাস্টিক সার্জারীর চিহ্ন (পরিশিষ্ট A দ্রষ্টব্য); সবরকম অ্যাথলেটিক্স নিপুণ। পিস্তল চালানো, বক্সিং আর ছুরি ছোড়বার ব্যাপারে অত্যন্ত দক্ষ। ছদ্মবেশ গ্রহণ করে না। ফরাসী আর জার্মানী ভাষা জানে, খুব সিগারেট খায় (বিশেষ দ্রষ্টব্য ও বিশেষ করে খায় সোনালি তিন-ফিতে-লাগানো সিগারেট); দোষ মদ্যপান, কিন্তু অতিরিক্ত নয় এবং মেয়ে মানুষ। ঘুষ নেয় বলে শোনা যায়নি।
