কমরেড জেনারেল, কয়েক মিনিটের মধ্যে এখানে মিটিং ডাকছি–তাতে যোগ দিচ্ছে RUMID, GRU এবং MGB। তারপর সবাই একমত হলে আমি আমার হেড অফ অপারেশন এবং হেড অফ প্ল্যান -এর সঙ্গে মিটিং এ বসব। খতম করার অনুমানে আমি আগে থেকেই মস্কোতে উপযুক্ত অপারেটিভকে এনেছি। একেবারে চাই না–শয়তানও সে কথা জানে। প্রথম মিটিং এরপর আমাকে টেলিফোন করবেন।
নিশ্চয়ই ফোন করব, কমরেড জেনারেল।
রিসিভার নামিয়ে G তার ডেস্কের তলায় একটা বোতাম টিপলেন। সেই সঙ্গে টেপ রেকর্ডারের সুইচ টিপলেন। তার পার্শ্বচর ঘরে এল। MGB-এর সে একজন ক্যাপটেন।
সবাই পৌঁছেছে।
হ্যাঁ, কমরেড জেনারেল।
তাদের নিয়ে এস।
কয়েক মিনিটের মধ্যে ছ জন ঘরে ঢুকে কনফারেন্স টেবিলের সামনে যে যার নিজের জায়গায় বসল। তাদের পাঁচজনের পরনে ইউনিফর্ম। তাদের মধ্যে তিনজন সিনিয়র অফিসার, তাদের প্রত্যেকের সঙ্গে একজন করে পার্শ্বচর।
টেবিলের একপাশে বসেছিল লেফটেন্যান্ট জেনারেল স্নাভিন। GRU-এর সে বড়কর্তা। তার পাশে এক কর্নেল পদস্থ ব্যক্তি। টেবিলের শেষ প্রান্তে বসেছিল RUMID-এর লেফটেন্যান্ট। জেনারেল ভজদভিশেনস্কি। এটা হচ্ছে পররাষ্ট্র মন্ত্রকের গুপ্তচর বিভাগ। তার পাশে সাদা পোশাকে একজন মাঝবয়েসী লোক। দরজার দিকে পেছন করে বসেছিল রাষ্ট্র নিরাপত্তার কর্নেল নিকিতিন–MGB-র রাশিয়ার সর্বোচ্চ গুপ্তচর সংস্থার বড়কর্তা। তার পাশে একজন মেজর।
গুড ইভনিং, কমরেডস্।
তিনজন সিনিয়র অফিসারের মুখ থেকে মৃদু সতর্ক অস্ফুট শব্দ বের হল। তারা প্রত্যেকেই জানত শব্দ ধরার জন্য : ঘরে তারের জাল আছে এবং প্রত্যেকই ভাবতো সেই একা কথাটা জানে।
ধূমপান করা যাক। জেনারেল এক প্যাকেট মাকে ভোলগা সিগারেট বার করলেন আর আমেরিকার জিপো লাইটারে ধরালেন। তারপর জেনারেল G কাটাকাটাভাবে বললেন ।
কমরেডস! আমরা এখানে মিলিত হয়েছি কমরেড জেনারেল সেরভের নির্দেশে। প্রেসিডিয়ামের তরফ থেকে জেনারেল সেরভ আমাকে আদেশ দিয়েছেন আপনাদেরকে রাষ্ট্রনীতির কতকগুলো বিষয় জানাতে। আমাদের পরামর্শ করে এমন একটা সিদ্ধান্ত নিতে হবে যা রাষ্ট্রের পক্ষে অত্যন্ত গুরুতুপূর্ণ।
এবার G থামলেন তাদের ভাববার জন্য। যে তিনজন সিনিয়র অফিসার ছিল তারা ঘাবড়ে গেল। তারা রাষ্ট্রের গোপনীয় কথা জানতে চলেছে। এই জানাটা একদিন হয়ত তাদের চরম সর্বনাশ ডেকে আনবে।
জেনারেল G বললেন, তিন মাসের মধ্যে শক্ত এলাকায় একটা প্রচণ্ড রকম সন্ত্রাসমূলক কাজ করা সম্বন্ধে আমাদের সিদ্ধান্তে নিতে হবে। চেয়ারে হেলান দিয়ে G বলে চললেন, কমরেডস, রাশিয়ার পররাষ্ট্রনীতি এক নূতন পর্যায়ে পৌঁছেছে। আগে সেটা ছিল কঠোর নীতি। নীতিটা কাজের হলেও পাশ্চাত্যে একটা চাপা উত্তেজনা সৃষ্টি করছিল। বিশেষ করে আমেরিকায়। আমাদের গোয়েন্দা বিভাগের রিপোর্ট, রাশিয়ার ওপর অঘোষিত এক পারমাণবিক আক্রমণের কিনারে তাদের আমরা ঠেলে এনেছি। লড়াই যদি করতেই হয় তবে আমরাই স্থির করব কখন করত হবে।
কয়েকজন শক্তিশালী আমেরিকান আমাদের হার্ড পলিসির সাফল্য দেখে পারমাণবিক আক্রমণের পরিকল্পনা করছিল। তাই নতুন এক কূটনীতি স্থির করা হয়েছে যার নাম কঠিন-কোমল নীতি। জেনিভায় এই নীতির শুরু। কয়েকটি দেশকে আবার চীন ভয় দেখাচ্ছে। দেখালে আমরা কঠোর বহু সাংবাদিক, অভিনেতা ও শিল্পীদের কাছে আমরা আমাদের সীমান্ত খুলে দিয়েছি, যদিও তাদের মধ্যে অনেকেই গুপ্তচর। কমরেড বুলগানিন ও ক্রুশ্চেভ এবং কমরেড জেনারেল সেরভ ভারত প্রাচ্য সফরে গিয়ে ইংরেজদের মুণ্ডপাত করে। ফিরে এসে লন্ডনে আগামী শুভেচ্ছা। মূলক সফর সম্বন্ধে ব্রিটিশ রাষ্ট্রদূতের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপ আলোচনা করে। এইভাবেই চলে গরম ও নরমের পালা। পাশ্চাত্যের কাছে সবকিছু গুলিয়ে যায়। উত্তেজনা বাড়বার আগেই শিথিল হয়ে আসে, আমাদের শত্রুদের মধ্যে এলোমেলোভাবে প্রতিক্রিয়া হয়।
টেবিলের সবাইকার মুখে মৃদু মৃদু হাসি ফোটে। কি চমৎকার কৌশল। পাশ্চাত্যের লোকেদের আমরা কি বোকাই না বানাচ্ছি।
অন্যদের আনন্দ দিতে পেরে জেনারেল G-র মুখেও হাসি ফুটল। সেই সঙ্গে চুপিচুপি সবকিছু আমরা এগিয়ে নিয়ে চলেছি-মরক্কোতে বিপ্লব, ইজিপ্টকে অস্ত্র সাহায্য, যুগোস্লাভিয়ায় বন্ধুত্ব, সাইপ্রাসে গণ্ডগোল, তুরস্কে দাঙ্গা, ইংল্যান্ডে স্ট্রাইক, ফ্রান্সে বিরাট রাজনৈতিক জয়লাভ।
জেনারেল G দেখলেন যে এবার তাদের বুঝিয়ে দেবার সময় হয়েছে নতুন পলিসির দায় দায়িত্ব। মৃদুস্বরে বললেন, কিন্তু কমরেড, রাশিয়ার রাষ্ট্রনীতি কোথায় ব্যর্থ হয়েছে। আমরা যখন গরম হতে চেয়েছিলাম তখন কারা নরম হয়েছিল? রাষ্ট্রের অন্যবিভাগের যখন জয় জয়কার তখন কোন বিভাগের হার হয়েছে। কারা বোকার মত ভুল করেছে। কারা বিশ্বের কাছে সোভিয়েত ইউনিয়নের মুখ পড়িয়েছে। কারা?
তিনি প্রায় চিৎকার করে উঠলেন। কনফারেন্স টেবিলের সবাই-র মুখ ফ্যাকাশে দেখে ডেস্কের ওপর সজোরে ঘুষি মারলেন G।
কমরেডস্! সেটা সোভিয়েত ইউনিয়নের সমস্ত গুপ্তচর বিভাগ। তার স্বর উত্তেজনায় ফেটে পড়ে। আমরাই হচ্ছি কুঁড়ে। আমরাই অন্তর্ঘাতক। আমরাই বিশ্বাসঘাতক! সোভিয়েত ইউনিয়নের মহান ও গৌরবময় সংগ্রামে আমরা আমাদের কর্তব্য করতে পারিনি। আমরা! আমরা! ঘরের সবার দিকে তিনি হাত ঘোরালেন। আমরা সবাই! আবার তার স্বর স্বাভাবিক হল, কমরেডস্! রেকর্ডটা দেখুন। হতভাগা সুনিশি তার রেকর্ড দেখুন! প্রথমে আমরা হারাই গুঁজেঙ্কোকে আর সেই কানাডায় আমাদের পুরো গুপ্তচর চক্র বরবাদ হয়ে যায়। তারপর টোকায়েভের মত লোককে আমরা হারাই। তারপর খোকনভের লজ্জাজনক ঘটনা, যার জন্য আমাদের দেশের দারুণ ক্ষতি হয়। তারপর অস্ট্রেলিয়ার পেত্ৰভ আর তার স্ত্রী–সবকিছু বিশ্রী ভুলে ভরা। এই তালিকার শেষ নেই-পরাজয়ের পর পরাজয়।
