১৯৪৯ এবং ৫০ সালে রুশের নানান বন্ধুদেশে ছোটখাটো কাজে গ্রান্টকে যেতে হত। Mobile Group-এর (সচল দল) সঙ্গে, রুশ ভাষায় যাকে Avampost বলে। যে সব রুশী গুপ্তচর এবং গোয়েন্দা বিভাগের কর্মচারি বিশ্বাসঘাতকতা করেছে বলে সন্দেহ হয়, তাদের মারধর করা এবং হত্যা করা ছিল তার কাজ। এসব ডিউটি গ্রান্ট করত নিখুঁতভাবে। তার কাছে যেরকম উঁচুদরের কাজ আশা করা হয়েছিল, তার একচুলও এদিক ওদিক হয়নি। পূর্ণিমার সময় তাকে বাগ মানানো যাবে না। তার নিজের ওপরেও শাসন থাকবে না। তাই পূর্ণিমার সময়টা নির্দিষ্ট থাকত তার হাজতে জল্লাদগিরির জন্য।
১৯৫১ ও ৫২ সালে আরো সরকারি ও পরিপূর্ণভাবে গ্রান্টের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার হয়। বিশেষ করে বার্লিনে খুব ভাল কাজের জন্য তাকে সোভিয়েত নাগরিকত্ব দেওয়া হয়। ১৯৫৩ সালে তার বেতন বেড়ে পরিমাণ দাঁড়ায় মাসে পাঁচ হাজার রুবল এবং মেজরের পদ তাকে দেওয়া হয়। কর্নেল বোরিদের সঙ্গে যোগাযোগ হলে তাকে পেনশন দেওয়া হবে স্থির হয়। ক্রিমিয়ার বাগানবাড়িটাও তাকে দেওয়া হয়। তার রক্ষণাবেক্ষণের জন্য দুজন দেহরক্ষী তাকে দেওয়া হয়। MGB-র ভাষায় এই প্রাইভেট হওয়া মানে বিদ্রোহ ঘোেষণা করা। মাসে একবার পূর্ণিমার রাতে নিকটতম জেলে গিয়ে যতগুলো মানুষ মেলে তাদের হত্যা করার সুযোগ দেওয়া হত তাকে।
স্বভাবতঃই গ্রান্টের কোন বন্ধু ছিল না। তার শুধু তাদের ওপরেই কৌতূহল ছিল যাদের সে হত্যা করত। তার বাকি জীবনটা ঠাসা ছিল তার নানা উত্তেজনাপূর্ণ চিন্তা নিয়ে।
তাছাড়া তার অবশ্য ছিল SMERSH। এই SMERSH যার পক্ষে, সোভিয়েত ইউনিয়নে সে রকম কারোরই বন্ধুর জন্য মাথা ব্যথা নেই। তার একমাত্র দুর্ভাবনা–যাতে এই SMERSH-এর কালো ডানা তার ওপর চেপে না বসে।
গ্রান্ট ভাবছিল তার নিয়োগকর্তারা তাকে কি চোখে দেখে। এমন সময় প্লেনটা নিচে নামতে শুরু করল। দক্ষিণে লাল আলোর ঝলক মস্কো। গ্রান্ট এখন তার যশের তুঙ্গে। SMERSH-এর সে এখন প্রধান জল্লাদ। অতএব এখন তার কি কাম্য? আরো উচ্চ পদ? আরো অর্থ? আরো টুকিটাকি সোনার জিনিসপত্র? আরো ভাল হত্যাকৌশল?
মনে হল সত্যিই তার আর কোন কাম্য নেই। নাকি কোন এক দেশে এমন কোন ব্যক্তি আছে যাকে হত্যা করতে পারলে সে পৃথিবীর অদ্বিতীয় জল্লাদ হতে পারবে।
.
গুপ্তচরদের মৃত্যুদণ্ড
SMERSH হচ্ছে সোভিয়েত ইউনিয়নের সরকারী হত্যা প্রতিষ্ঠানের নাম। দেশে ও বিদেশে এই প্রতিষ্ঠান কাজ করে। ১৯৫৫ সালে এই প্রতিষ্ঠানে কাজ করত ৪০,০০০ নরনারী। SMIERT SPIONEM -এর সংক্ষিপ্ত নাম SMERSH, যার অর্থ গুপ্তচরদের মৃত্যুদণ্ড। এই নামটা ব্যবহার করত শুধু এই প্রতিষ্ঠানের কর্মচারি ও সোভিয়েত অফিসাররা।
SMERSH-এর সদর দপ্তর হচ্ছে স্ট্রেতেংকা উনিৎসার এক বিরাট কুৎসিত আধুনিক আকৃতির বাড়িতে। এই চওড়া, নিরানন্দ পথে বাড়িটার নম্বর ১৩। বাড়িটার প্রশস্ত সিঁড়ি লোহার দরজায় পৌঁছেছে। সাব মেশিনগান হাত সেই সিঁড়ির দু পাশে দু জন প্রহরী দাঁড়িয়ে। তাদের পাশ দিয়ে যাবার সময় পথচারীরা মাটির দিকে চোখ নামিয়ে চলত। বাড়ির তিনতলা থেকে SMERSH এর যাবতীয় নির্দেশ জারি করা হত। দোতলার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘরটা বিরাট। দরজাটা শব্দরোধী। তার উল্টো দিকে দুটো প্রশস্ত জানালা, মেঝেতে সবচেয়ে ভাল জাতের কার্পেট। ঘরের বাঁ দিকের কোণে বিরাট এক ডেস্ক।
ডেস্কের মাঝখানে আড়াআড়িভাবে একটা কনফারেন্স টেবিল। দুটোকে মিলিয়ে T-এর মত দেখতে। এই টেবিলের কাছে আটখানা চেয়ার।
দেওয়ালে সোনালী ফ্রেমে বাঁধানো বিরাট চারটে ছবি। ১৯৫৫ সালে দরজার ওপরকার ছবিটা ছিল স্তালিনের, দুটো জানালার মাঝে ছিল লেনিনের এবং অন্য দুটো দেওয়ালে মুখোমুখি ছিল বুলগানিন এবং আর্মি জেনারেল ইভান আলেকসান্দ্রোভিচ সেরভের। ১৯৫৪ সালের ১৩ই জানুয়ারি পর্যন্ত সেরভের জায়গায় ছিল বেরিয়ারের ছবি।
জেনারেল সেরভের ছবির নিচে ছিল একটা বুককেস। বুককেসটার পাশের দেয়াল ঘেষে সরু আর লম্বা একটা টেবিল। তার ওপর রয়েছে এক ডজন চামড়া বাঁধানো অ্যালবাম। সেগুলোর ওপর সোনালি অক্ষরে তারিখ স্ট্যাম্প করা। যে সব সোভিয়েত নাগিরক ও বিদেশীদের SMERSH হত্যা করেছে তাদের ছবি এই সব অ্যালবামে আছে।
রাত ১১-৩০-এর খানিক আগে গ্রান্ড টুশিলনা বিমান বন্দরে ল্যান্ড করল। এই টেবিলটার সামনে দাঁড়িয়ে ১৯৫৪ সালের অ্যালবামের পাতা ওলটাচ্ছিলেন পঞ্চাশ বছরের এক শক্তসমর্থ গাট্টাগোট্টা লোক।
SMERSH-এর কর্তার নাম জেনারেল বোজোবোয়সূচিখোভ। এই বাড়িতে তার নাম G। তার পরনে একটা খাকি টিউনিক, কলারটা উঁচু। গাঢ় নীলরঙের ট্রাউজারের নিচে নরম চকচকে কালো চামড়ার রাইডিং বুট। টিউনিকের বুকে রিবন দিয়ে তিন সারি মেডেল ঝুলছে। তার ওপরে ঝুলছে হিরো অফ দি সোভিয়েত ইউনিয়নের স্বর্ণ-তারকা।
মুখটা চওড়া ও হিংস্র। মুখশ্রী কঠোর আর একরোখা। তার মধ্যে ফুটে উঠেছে এক কর্তৃত্বের ছাপ।
ডেস্কের একটা টেলিফোন বেজে উঠল। তিনি ধীরে পদে গিয়ে যে সাদা রিসিভারে vch লেখা সেটা তুললেন।
কে?
ডেরভ বলছি। আজ সকালে প্রেসিডিয়ামের মিটিং এরপর কি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
