নির্দেশ অনুযায়ী ড্রাইভার টাৰ্মাক দিয়ে যখন গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে, আবার সেই শব্দ; থাম। সঙ্গে সঙ্গে ড্রাইভার ব্রেক কষল। মাথার ওপরে কানে তালা ধরানো কর্কশ শব্দ শুনে দুজনে মাথা গুজরে বসে পড়ল। সূর্যাস্তের দিক থেকে চার ঝাক MIG 17 যুদ্ধবিমান তাদের মাথার ওপর দিয়ে উড়ে গেল। একের পর এক বিরাট রানওয়ের ওপর প্লেনগুলো নিচে ধোয়া ছেড়ে নামল।
চলতে শুরু কর।
একশ গজ দূরে তারা একটা প্লেনের কাছে পৌঁছাল। তাতে লেখা : VBO। প্লেনটা দু ইঞ্জিনের ইলুশিন-১৩। কেবিনের দরজায় যে এলুমিনিয়ামের মই ঝুলছে তার পাশে গাড়িটা থামাল। একজন ক্রু এসে ড্রাইভারের পাশ আর গ্রান্টের পরিচয় পত্র দেখে গ্রান্টকে তার পেছনে পেছনে প্লেনে ওঠার নির্দেশ দিল। সুটকেসটা নিয়ে গ্রান্ট ওঠবার পর মইটা তুলে কু সশব্দে দরজা বন্ধ করে কপিটের দিকে এগিয়ে গেল।
কুড়িটা খালি সিট ছিল। দরজার সবচেয়ে কাছের একটা সিটে গ্রান্ট তার সিট বেল্ট আঁটল। কনট্রোল টাওয়ার থেকে কতকগুলো কর্কশ কথা শোনা গেল, তারপর ইঞ্জিন দুটো গর্জে উঠল।
সিট বেল্ট খুলে সোনালী মুখওয়ালা একটা ব্রয়কা সিগারেট ধরিয়ে আরাম করে অতীত আর ভবিষ্যতের কথা ভাবতে লাগল গ্রান্ট।
এক পেশাদার জার্মান ভারত্তোলনকারী এবং এক হোটেলের দক্ষিণ আইরিশ ওয়েট্রেসের অবৈধ সন্তান জেনোভান গ্রান্ট। বেলফাস্টের বাইরে এক সার্কাস তাঁবুর পেছনে ভিজে ঘাসের ওপর মিনিট পনেরোর জন্য তার পিতামাতার মিলন। তারপর তার বাবা তার মাকে আধ ক্রাউন দেয় এবং মা খুশি হয়ে রেলস্টেশনের কাছে একটা কাফের রান্নাঘরে তার বিছানায় শুতে যায়। সন্তান সম্ভাবনার সময় তার মা গ্রামে তার খুড়ির কাছে যায়। একটি বার পাউন্ড সন্তানকে জন্ম দিয়ে সে সূতিকা রোগে মারা যায়। মরার আগে তার সন্তানের নাম দেয় জেনোভান এবং গ্রান্ট, যেটা ছিল মেয়েটির নিজের নাম।
সেই খুড়ি নিতান্ত অনিচ্ছা সত্ত্বেও বাচ্চাটাকে মানুষ করে। ছেলেটা তাগড়া হয়ে ওঠে। কিন্তু ভারি চাপা প্রকৃতির। তার কোন বন্ধু ছিল না। কারোর কোন জিনিস সে ঘুষির জোরে নিত। স্থানীয় স্কুলে কেউ তাকে ভালবাসতো না, বরং ভয় করত। আশেপাশের গ্রামাঞ্চলে বক্সিং আর কুস্তি প্রতিযোগিতায় সে খুব নাম করেছিল।
এই সময় থেকেই সে নিজের শরীরের মধ্যে পূর্ণিমার সময় একটা তীব্র হিংস্রতা অনুভব করতে থাকে, যেটা সে দমন করতে পারে না। তার মোল বছর বয়সে অক্টোবর মাসে অসহ্য আবেগ তাকে ভর করে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে সে একটা বেড়ালকে ঘাড় মটকে খুন করে। তারপর পুরো একমাস স্বস্তিতে কাটায়। নভেম্বরে আবার ঘাড় মটকে বিরাট একটা পাহারাদার কুকুরকে খুন করে। এবং বড়দিনের মাঝরাতে একটা গরুর টুটি চিরে ফেলে। এগুলো করে। সে তৃপ্তি পায়। সে বোকা নয়। তাই কেউ যাতে বুঝতে না পারে সেজন্য সে একটা বাইসাইকেল কিনে মাসে একবার। আশে পাশের গ্রামে গিয়ে তার রক্ত লালসা চরিতার্থ করত। দুমাস পরে এক ঘুমন্ত ভবঘুরে লোকের গলা কাটে সে। রাতে স্বভাবতঃই পথগুলো জনবিরল। ক্রমশ সে সকালে বেরোতে লাগল। দূর-দূরান্তের গ্রামে সে গোধূলির সময়। পৌঁছয়–যখন একলা মানুষ বাড়িতে ফেরে কিংবা কোন মেয়ে চলে তার গোপন প্রেমিকের কাছে।
মেয়েদের সে হত্যা করত, কিন্তু তাদের ওপর কোন অত্যাচার করত না। খুন করাটাই তার কাছে ছিল চমকপ্রদ ব্যাপার। সেটা করতে পারলেই তার পরিপূর্ণ তৃপ্তি।
তার সতের বছরের শেষে আশেপাশের প্রতিটি গ্রামের সর্বত্র নানা ভয়ংকর গুজব ছড়িয়ে পড়ে। প্রকাশ্য দিবালোকে একটি মহিলার ঘাড় মটকে খড়ের গাদায় ফেলে দেবার ঘটনায় দারুণ আতঙ্কের সৃষ্টি হয়। গ্রামে খবরদারী দল সংগঠিত হয়, পুলিশ-কুকুর নিয়ে আসে এবং চান্দ্র হত্যাকারীর নানা কাহিনী শুনে বহু সাংবাদিকও আসে। বাইসাইকেলে ঘোরার সময় একাধিকবার তাকে থামিয়ে নানা প্রশ্ন করা হয়। কিন্তু অঘম্যাকলয় গ্রামের লোকেরা তার প্রবল অনুরাগী। সে তখন তার গ্রামের গর্ব। উত্তর আয়ার্ল্যান্ড লাইট-হেভিওয়েট বক্সিং চ্যামপিয়নশিপের সে প্রতিযোগী।
তার সহজাত বুদ্ধিতে অষম্যাকলয় ছেড়ে সে আসে বেলফাস্টে এবং আশ্রয় নেয় এক বৃদ্ধ বক্সিং শিক্ষকের কাছে। বৃদ্ধের জিমনেশিয়ামের নিয়ম ছিল খুব কড়া। তাই গ্রান্টের শিরায় শিরায় আবার খুনের নেশা চাপে। সে তখন তার অনুশীলনকারী বক্সিং জুড়িকে প্রায় আধমরা করে ছাড়ে।
১৯৪৫ সালে আঠার বছর বয়সে গ্রান্ট চ্যামপিয়ন হয়। তারপর তাকে নিয়ে যাওয়া হয় সৈন্যবাহিনীতে। রয়্যাল কোর অব সিগন্যালস -এ সে ড্রাইভার হিসেবে নিযুক্ত হয়। ইংল্যান্ডে ট্রেনিং-এর সময় সে খানিকটা ধাতস্থ হয়ে ওঠে– অর্থাৎ সেই অনুভূতি যখন চাড়া দিত সে তখন খুব সাবধানী হয়ে পূর্ণিমার সময় খুনের বদলে ড্রিঙ্ক করত। অল্ ডারশট-এর অরণ্যে হুইস্কি নিয়ে ঢকঢক করে গিলে শান্তভাবে নিজের ওপর তার প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করত। তারপর ভোরে টলতে টলতে ক্যাম্পে ফিরত। তৃপ্তি তার হত না কিন্তু তখন সে আর বিপজ্জনক নয়। প্রহরী তাকে ধরলে বলত কম্যান্ডিং অফিসার তার মেজাজ ভাল রাখতে চান–যাতে সে চ্যামপিয়ন হয়।
রুশদের সঙ্গে রাজনৈতিক গণ্ডগোলের সময় গ্রান্টের পরিবহন বিভাগকে ঝট করে বার্লিনে পাঠানো হয়। বার্লিনে থাকাকালীন সে রুশদের নিষ্ঠুরতার কথা, ছলাকলার কথা শুনেছিল। তার ভাল লেগেছিল বলে স্থির করল সে সেখানেই। যাবে। কিন্তু যাবে কি করে? কি তাদের দিতে পারবে? কি চায় তারা।
