কানাঘুষায় শোনা যায় এটা পুলিশের বাগানবাড়ি। যে দুজন চাকর আছে, তারা প্রহরী এবং রান্না আর বাড়ির সব কাজ করে। প্রতিমাসেই লোকটা নিয়মিত বাইরে যায়। মেয়েটিকে তখন আবার মাঝে দু এক সপ্তাহ আসতে বারণ । করে। এরকম এক একটা অনুপস্থিতির পর দেখা যায় লোকটার গলা আর শরীরের ওপরটা ক্ষতবিক্ষত। একবার দেখা গিয়েছিল তার পাজরার কাছে এক ফুট সার্জিক্যাল প্লাস্টারের নিচে প্রায় শুকিয়ে আসা একটা ক্ষতের লাল দাগ। যখন তাকে প্রথম এই বাড়িতে পাঠান হয়, চাকরদের মধ্যে একজন তাকে বলেছিল যা সে দেখবে, সে কথা বলাবলি করলে তাকে হাজতে পাঠানো হবে। হাসপাতালের চীফ সুপারিনটেনডেন্ট আগে কখনো তার অস্তিত্ব স্বীকার করেননি। তিনিও মেয়েটিকে একই কথা বলেছিলেন।
মেয়েটির বরাবরের ধারণা এটা একটা রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার ব্যাপার। হয়ত সে কারণেই এই চমৎকার শরীরটার ওপর তার বিতৃষ্ণা।
এবার সে তার মুখটা মালিশ করার জন্য তেলের শিশি নিল। লোকটার চোখ বোজা ছিল। মেয়েটির আঙুল সবে চোখ দুটো দুয়েছে এমন সময় বাড়ির টেলিফোন বেজে উঠল। সাথে সাথে লোকটা এক মুহূর্তে হাঁটু মুড়ে উঠে পড়ল, যেন একজন দৌড়বাজ। বন্দুকের সংকেতধ্বনির জন্য অপেক্ষা করছে। একটা অস্ফুট কণ্ঠস্বর শোনা গেল। বিনীত কণ্ঠস্বর–মনে হয় যেন কিছু আদেশ গ্রহণ করছে। কণ্ঠস্বর থামল। একজন চাকর দরজায় দাঁড়িয়ে ইঙ্গিতে ওকে কিছু বলে দিয়ে সঙ্গে সঙ্গে চলে গেল। বেরিয়ে এসে লোকটা যেন তাকে না ভাবে সে আড়ি পেতে কথা শুনছিল। উঠে সে সুইমিং পুলের পাড়ে গিয়ে চমৎকার ডাইভ দিল।
যে লোকটার শরীর মেয়েটি ম্যাসাজ করত তার পরিচয় খানিকটা আঁচ করলেও সে জানত না। তাই সে বিশেষ বিচলিত হয়নি।
লোকটার আসল নাম জেনোভান গ্রান্ট অথবা Red গ্রান্ট। কিন্তু গত দশ বছর ধরে জ্বাসনো গ্রানিৎঙ্কি নামেই সে পরিচিত, তার সাংকেতিক নাম গ্রনিট। নোকটা কুখ্যাত গুপ্ত সংস্থা SMERSH -এর প্রধান ঘাতক। SMERSH হলো রাশিয়ার সর্বোচ্চ গুপ্তচর সংঘ MGB-র এক অঙ্গ। শত্রুপক্ষের বিপজ্জনক গুপ্তচরদের নির্মূল করাই হচ্ছে SMERSH -এর কাজ। গ্রান্ট এখন সরাসরি টেলিফোন মারফত মস্কোয় সংস্থার সদর দফতর থেকে নির্দেশ নিচ্ছিল।
.
গোলাপ বিছানো পথ
ধীরে ধীরে টেলিফোনটা রেখে বসে পড়ে গ্রান্ট সেটার দিকে তাকিয়ে রইল।
বুলেটের মত মাথাওয়ালা এক প্রহরী তার পাশে দাঁড়িয়েছিল। সে বলল, চটপট তৈরি হয়ে নাও।
কি করতে হবে সে কথা কিছু ওরা বলেছে। গ্রান্ট রুশভাষা খুব ভাল বলে, শুধু একটু ভারি গলায়। সোভিয়েতের যে কোন বলটি এলাকার বাসিন্দা বলে তাকে চালান যায়। তার গলার স্বর চড়া আর নিষ্প্রাণ।
না। শুধু বলেছে মস্কোয় তোমার ডাক পড়েছে। প্লেন আসছে। আধঘণ্টার মধ্যে এখানে পৌঁছবে। তেল ভরতে আধঘন্টা আর তারপর তিন-চার ঘণ্টা, যদি খারকোতে নামো। মাঝ রাতে মস্কোতে পৌঁছবে। গাড়ি আসছে, জিনিসপত্র প্যাক করে নাও।
নার্ভাস পায়ে গ্রান্ট উঠে দাঁড়াল, নিচ্ছি। তোমার কথাই ঠিক। কিন্তু কোন জরুরী কাজ কিনা তার কি আভাস দেয়নি? এটা তো নিরাপদ লাইন।
এবার তা দেয়নি।
কাঁচের দরজা দিয়ে গ্রান্ট ধীরে ধীরে লনে এল। মেয়েটির দিকে না তাকিয়েই নিচু হয়ে বইটা তুলে নিল, সেই সঙ্গে সোনার জিনিসগুলো। তারপর নিজের শোবার ঘরে ঢুকল।
নিচু হয়ে খাটের তলা থেকে একটা জরাজীর্ণ ইটালিয়ান ফাইবারের সুইকেস গ্রান্ট বার করল, তারপর আলমারী থেকে ইস্ত্রি করা সস্তা দরের অথচ মোটামুটি ভাল পোশাক বেছে নিয়ে সেটায় ভরল। তারপর সুগন্ধী সাবান মেখে ঠাণ্ডা পানিতে গা ধুয়ে ফেলল।
বাইরে একটা গাড়ির শব্দ শোনা গেল। যে রকম একটা পোশাক প্যাক করেছে সেই ধরনের ধূসর রঙের বৈচিত্র্যহীন একটা পোশাক তাড়াতাড়ি গায়ে গলিয়ে, ঘড়ি পরে, টুকিটাকি জিনিস পকেটে ভরে সুটকেসটা নিয়ে এল।
সদর দরজা খোলা। একটা ছন্নছাড়া ZIS গাড়ির ড্রাইভারের সঙ্গে তার দুজন গার্ডকে কথা বলতে দেখে সে মনে ভাবল ব্লডি ফুল। লোকগুলো নিরুত্তাপ অবজ্ঞার চোখে গ্রান্টের দিকে তাকাল। রান্নাঘরের দরজার হুক থেকে এক গাদা কোর্টের থেকে নিজের ইউনিফর্মটা বের করল–ধূসর রঙের একটা রেনকোট আর সোভিয়েট কর্মচারিরা যে টুপি পরে থাকে সে রকম একটা টুপি। সেগুলো পরে, সুটকেসটা নিয়ে ড্রাইভারের পাশে এসে বসল। গাড়িতে ওঠার সময় তার কাঁধের ধাক্কায় সরিয়ে দিল তার একজন গার্ডকে। ত্রিমপারফুলের এয়ারপোর্টে পোঁছতে দেড় ঘন্টা লাগল। পথে কোন গাড়ি ছিল না। আঙুর ক্ষেতের মধ্যে যে সব গরুর গাড়ি আসছিল তারা মোটরের হর্ন শুনে নেমে পড়ল পাশের খানাখন্দরে। রাশিয়ার সর্বত্র লোকে জানে মোটর গাড়ি মানে সরকারী কাজ। তার সেখানে বিঘ্ন ঘটানো মানেই বিপদ।
সিভিল এয়ারপোর্টের পাশ কাটিয়ে, উঁচু একটা দেওয়ালের পাশ দিয়ে সামরিক বিমান বন্দরের দিকে তারা চলল। দু জন টমি গানধারী প্রহরীকে ড্রাইভার তার পাশ দেখাল। সেখানে নানা প্লেন দাঁড়ান। ক্যামোফ্লেজ করা সামরিক মালবাহী প্লেন, ট্রেনিংয়ের জন্য দু ইঞ্জিনওয়ালা ছোট ছোট প্লেন। দুটো নেভি হেলিকপ্টার। ওভারঅপরা একটা লোককে ড্রাইভার প্রশ্ন করল, গ্রান্টের প্লেনটা কোথায়? সঙ্গে সঙ্গে কনট্রোল টাওয়ার থেকে লাউডস্পিকারের শব্দ বয়ে। অনেক বায়ে। নম্বর V.BO. ।
