হ্যামারস্টাইন লেকের দিকে এগুচ্ছে। এবার গোসলপর্ব শুরু হবে। মেয়ে দুটি আগেই পানিতে ঝাঁপ দিয়েছে। ঘাসের ওপর কোট বিছিয়ে বসে পড়েছে গোনজালিস। বন্দুকবাজ দুই বডিগার্ড টমিগান কোলে নিয়ে চারদিকে তাকাচ্ছে, প্রহরায় ত্রুটি নেই। হ্যামারস্টাইন এত অপকর্ম করেও যে এতদিন কেন বেঁচে আছে, বন্ড এবার বুঝল।
কিন্তু গেল কোথায় মেয়েটা? সময় বয়ে যাচ্ছে বলে বন্ড ছটফট করে। রাইফেল বাগিয়ে গুঁড়িতে হেলান দিয়ে দাঁড়ায় বন্ড। হ্যাঁমারস্টাইন গিয়ে দাঁড়িয়েছে ডাইভিং বোর্ডে, পানিতে ঝাঁপ দেবার জন্য হাঁটু বেকেছে। দুই হাত দুলছে– লাফিয়েছে হ্যাঁমারস্টাইন, দু পা লাফ দেবার তক্তা ছেড়ে তখনও শূন্যে–ঠিক সেই সময়ে একটা রূপালী ঝলক দেখা গেল হ্যাঁমারস্টাইনের পিঠে। পরমুহূর্তেই দেহটা গোঁৎ খেয়ে গিয়ে পড়ল লেকের পানিতে।
গোনজালিস উঠে দাঁড়িয়েছে। সত্যিই কিছু চোখে পড়েছে কিনা ঠিক বুঝতে পারছে না। কিন্তু বন্দুকবাজ দুই ঠ্যাঙাড়ের চোখে দ্বিধা নেই। ওরা দেখেছে এইমাত্র কি ঘটে গেল। টমিগান উদ্যত হুকুম পেলেই হয়।
অবিশ্বাসী চোখে তখনো লেকের পানিতে তাকিয়ে আছে গোনজালিস। জার্মান গুরুর দেহ লেকের পানি তোলপাড় করে ডুবে গেছে। খুব জোরে ডুব দিয়েছে তো! কিছুক্ষণ পরেই ভাসল দেহটা। পানিতে মুখ গুঁজে উপুড় হয়ে হ্যাঁমারস্টাইন ভাসছে। পিঠের বাঁদিকে চ্যাটাল হাড়টার ঠিক নিচেই বিঁধে রয়েছে একটা চকচকে বস্তু। অ্যালুমিনিয়াম পালক ঝলসাচ্ছে সূর্যের আলোয়। ধীরে ধীরে পানি লাল হচ্ছে।
তীক্ষকণ্ঠে মেজর গোনজালিস কি যেন বলল। আর গর্জে উঠল টমিগান। আগুনের স্রোত বয়ে গেল নল দিয়ে। গাছপালা, ঝোঁপঝাড় লণ্ডভণ্ড করছে নির্মম বুলেট রাশি। বন্ডের স্যাভেজ গর্জে উঠল। বাঁদিকের বন্দুকবাজ মুখ থুবড়ে পড়ল। ডানদিকের বন্দুকবাজ দৌড়াচ্ছে লেকের দিকে। ছুটন্ত অবস্থাতেই বন্ড গুলি করল। লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে আবার ট্রিগার টিপল। ছুটন্ত লোকটার হাঁটু দুমড়ে পড়ল লেকের পানিতে। পানিতে পড়েও টমিগানের নল গিয়ে গুলি উড়ে গেল। লোকটা মারা গেছে কিন্তু আঙুল টাইট হয়ে বসে রয়েছে টিগারে।
লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বন্ড যে ক টি সেকেন্ড সময় দিয়েছিল মেজর গোনজালিসকে, তারই মধ্যে মেজর গিয়ে লুকিয়েছে প্রথম বন্দুকবাজের আড়ালে। সেইখান থেকেই টমিগান চলল মেপলগাছ লক্ষ্য করে। স্যাভেজের আগুন ঝলক দেখেই আঁচ করেছে শক্রর হদিস।
পর পর দু বার গুলি করল বন্ড। দুটি গুলিই বিধল মড়ার গায়ে। আবার বন্ড তাক করল। একটা ছোট ডাল ভেঙ্গে পড়ল নলের ওপর। ডাল সরিয়ে লাশের আড়াল থেকে বেরিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে বাগানের চেয়ার টেবিলের দিকে মেজর দৌড়াচ্ছে। ইতিমধ্যে লোহার মস্ত টেবিলটাকে ঢালের মত ফিরিয়ে ধরেছে মেজর। আড়ালে বসে টমিগান চালাচ্ছে। বন্ডের গুলি লোহায় লেগে ঠিকরে যাচ্ছে। বার বার টেলিস্কোপিক সাইট ঠিক করতে বন্ডের সময়ও লাগছে। মেজর বার বার অবস্থান পালটাচ্ছে।
বন্ড দেখল মহা বেগতিক। খোলা মাঠে গিয়ে সামনাসামনি টক্কর দেওয়া যাক। সঙ্গে সঙ্গে গুঁড়ির আড়াল থেকে বেরিয়ে ঢালু মাঠের মধ্যে দৌড়াল বন্ড। মেজরও খলিফা। দেখল এভাবে সময় নষ্ট না করে লেক পেরিয়ে জঙ্গলে ঢুকলে ঘুরে এসে বন্ডকে এক হাত নিতে সুবিধে হবে। সেও আড়াল থেকে বেরিয়ে লেকের দিকে দৌড়াল। এমন। সময়ে খোলামাঠে বন্ডকে দেখে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল ঘাসজমির ওপর। একঝাক গুলি বর্ষণ করল। বন্ড পাথরের মত দাঁড়িয়ে রইল। নিষ্কম্প হাতে লক্ষ্য স্থির করল টেলিস্কোপিক সাইটের মধ্য দিয়ে। ক্রস চিহ্নটা যেই স্পষ্ট হল মেজরের হৃদপিণ্ডের ওপর, সঙ্গে সঙ্গে ট্রিগার টিপল। গোনজালিস দু হাত শূন্যে তুলে হুড়মুড় করে তলিয়ে গেল হ্রদের পানিতে।
সবুর করল বন্ড। না মেজরের ভেসে ওঠার লক্ষণ নেই। বন্ড হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে মুখ মুছে মেপলগাছের দিকে এগিয়ে গেল।
দেখল, গুঁড়ির গায়ে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে জুডি হ্যাভলক। ডান বাহু দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে। তীর ধনুক পড়ে পায়ের কাছে।
কাঁধে হাত রাখল বন্ড। জুডি, আর ভয় নেই। খেল খতম। কোথায় লাগল?
তেমন কিছু নয়। হঠাৎ কি যেন বিধে গেল। উঃ এমন যে হবে ভাবতেও পারিনি?
ওরা পেশাদার খুনে–তাই বলেছিলাম এ কাজ পুরুষের। মেয়েদের নয়। যাকগে দেখি হাতটা। চটপট চম্পট দিতে হবে। নষ্ট মেয়েগুলো এতক্ষণে বুঝি বর্ডার ফোর্সকে খবর দিতে দৌড়াচ্ছে।
ঘুরে দাঁড়াল জুডি। জুডির কোমরের বেল্ট থেকে শিকারী ছুরি নিয়ে ওর কাঁধের শার্ট কেটে দিল বন্ড। বুলেট বিধে নেই, মাংসপেশী চিরে হাঁ করেছে। নিজের খাকি রুমাল তিনফালি করল বন্ড। গিঁট দিয়ে লম্বা করল। ফ্লাস্ক থেকে কফি আর হুইস্কি ঢেলে ক্ষতস্থান ধুয়ে দিল। হ্যাঁভারস্যাক থেকে পাউরুটি বেরুল। ক্ষতস্থানে পাউরুটি চাপা দিয়ে বেশ করে বাঁধল ঘেঁড়া রুমাল। তারপর ব্যান্ডেজ বাঁধা হাতটা ফাস করে ঝুলিয়ে দিল জুডির গলায়। গোলাপী ঠোঁট দুটি বন্ডের ঠোঁটের অত্যন্ত কাছে মাত্র কয়েক ইঞ্চি ব্যবধান। রূপসীর গায়ের গন্ধে উতলা হল মন। কেমন জানি বুনো গন্ধ। আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়াল ঠোঁটে। জুডির চোখে বিস্ময় আর তৃপ্তি। এবার ঠোঁটের দু প্রান্তে দুটি চুমু দিতেই হেসে ফেলল সুন্দরী। সরে দাঁড়িয়ে বন্ডও হাসল।
