খেঁকিয়ে উঠল বন্ড, অনেক ইডিয়েট মেয়েমর্দানী দেখেছি। এমনটি কখনো দেখিনি। ফাজলামি ছাড়, খেলনার হাতিয়ার নামাও। এ কাজ ব্যাটাছেলের–খামোকা নালা কেটে পানি আনতে যেও না। তীর ধনুক দিয়ে চার চারটে শয়তানের মহড়া নেওয়ার প্ল্যানটা কি শুনি?
একগুয়ে দুই চোখে যেন দপ করে আগুন জ্বলে উঠল। ক্রোধে কঠিন ঠোঁট নেড়ে বলল, গোল্লায় যান আপনি। বেশি টেণ্ডাই মেণ্ডাই করবেন না–সরে দাঁড়ান। খুন হয়েছে আমার বাবা-মা, আপনার নয়। এর আগেও আমি একটা দিন ও রাত্রি কাটিয়েছি। ওরা কি করে আমি জানি। আর হ্যাঁমারস্টাইনকে কোন সময়ে মাটিতে ফেলা যায় তাও আমি জানি। অন্যকে নিয়ে আমার মাথাব্যথা নেই। যা বলি তা করুন। নইলে পস্তাবেন। হ্যাঁমারস্টাইনকে আমিই নিপাত করব। এই আমার পণ। ত্রিভুবনে কেউ নেই আমাকে রোখে।
মহাফাঁপরে পড়ল বন্ড। মেয়েটা ফাঁকা আওয়াজ দেবার পাত্রী নয়। তাই মোলায়েম গলায়– জুডি, সব চাইতে ভাল হয়, যদি দু জনে হাত লাগাই। লন্ডনে তোমাদের একজন ফ্যামিলি ফ্রেন্ড আছেন। তাঁর হুকুমেই এসেছি ওদের খতম করতে। আমার যে হাতিয়ার, তার পাল্লাও তোমার হাতিয়ারের পাঁচগুণ। বেশি। উঠোনে ঐ অবস্থায় আমি সবকটাকে খুন করতে পারি। কিন্তু আরো সুবিধে হবে ওরা যখন লেকে গোসল করতে আসবে। আমি ঠিক তখন গুলি চালাব। তীর ছুঁড়ে আমাকে বরং সাহায্য কর।
না। ইচ্ছে হলে আপনি বরং আমাকে সাহায্য করলে করতেও পারেন। ওরা দল বেঁধে পানিতে নামবে-বন্দুকবাজ গার্ড দুটো ছাড়া। কালকেও দেখেছি এগারটা নাগাদ জলকেলি করেছে কুত্তার দল। পানিতে ওরা নামবেই। টমিগানের মত বন্দুক নিয়ে ঐ বেঁটে বকেশ্বর দুটো পাড়ে বসে পাহারা দেবে। কাল রাতে আমি নিচে গিয়ে একটা জায়গা বেছে এসেছি। তীর ছোঁড়ার উপযুক্ত জায়গা। চললাম সেখানে যদি এখনো সুবুদ্ধির উদয় না ঘটে, কাটমোল্লার যা হাল হয় আপনারও তাই হবে, বলে ছিলেয় আরো খানিকটা টান মারল রূপসী।
রেগে বন্ড বলল, বেশ, তাই হোক। একবার বেরোই জঙ্গল থেকে, তারপর এমন টাইট দেব যে ঠেলা বুঝবে। যাও চালাও তীর। আমিও নজর রাখছি। কাজ বাগিয়ে যদি ফিরতে পার তাহলে ভালই। না পারলে আমাকেই নামতে হবে। ধড়মুণ্ডু যা পাই, তুলে নিয়ে আসব খন।
ছিলেতে ঢিলে দিল রূপসী। বলল, এই তো সুবুদ্ধি হয়েছে। এ তীর একবার চামড়ায় ঢুকলে টেনে বার করাও মুশকিল। আমাকে নিয়ে আদিখ্যেতা না করে খেয়াল রাখবেন টেলিস্কোপের লেন্সে যেন রোদ না লাগে। নিচ থেকে লেন্সের ঝিকিমিকি দেখে ফেললেই মুশকিল। যেন শেষ কথা বলা হল, এমনিভাবে অদ্ভুত হাসল সুন্দরী। পর মুহূর্তে উধাও হল জঙ্গলের মধ্যে।
ধীরে-ধীরে চোখের আড়াল হল গাঢ় সবুজ তন্বী। জাহান্নামে যাক জুডি। নিমেষে মনটা তেঁতো হয়ে যায় বন্ডের। এ পরিস্থিতিতে আগেভাগে গুলি চালানোও সম্ভব নয়–মেয়েটা তাহলে মরবে। জবুথবু হয়ে বসে থাকা ছাড়া পথ নেই। আগে ঐ মেয়েমানী তীর ছুঁড়বে। তারপর অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা।
বাড়ির সামনে নড়াচড়ার আভাস দেখেই চোখে টেলিস্কোপ লাগাল বন্ড। ব্রেকফাস্টের এঁটো বাসনপত্র সরাচ্ছে ঝি দুটো রূপোজীবী দুটোর পাত্তা নেই। বন্দুকবাজ যুগলও নিপাত্তা। কোচে চিৎপটাং হয়ে শুয়ে কাগজ পড়ছে ভন হ্যাঁমারস্টাইন। মাঝে মাঝে কথা বলছে মেজর গোনজালিসের সঙ্গে। কোচের পায়ের কাছে বাগান চেয়ারে বসে চুরুট টানছে মেজর। মধ্যে মধ্যে কাৎ হয়ে তামাক পাতা ফেলছে থু থু করে। পালের গোদার কথা পরিষ্কার না শুনলেও ভাষাটা ইংরেজি বুঝেছিল বন্ড। সাড়ে-দশটা। ঠুটো জগন্নাথের মত কাঁহাতক বসে থাকা যায়। গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে বসে স্যাভেজ রাইফেলের প্রতিটি অংশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরখ করে নিল বন্ড।
হাতে আর কোন কাজ নেই। শুরু হল আকাশ-পাতাল চিন্তা। ভন হ্যাঁমারস্টাইন নিঃসন্দেহে সমাজের শত্রু। এ রকম বদমাইশের চটপট অক্কা পাওয়াই উচিত। জুডি এসেছে বাবা-মার হত্যার শোধ তুলতে। কিন্তু বন্ড? বন্ড কেন এসেছে? তার সঙ্গে হ্যাঁমারস্টাইনের কোন বিবাদ তো নেই? তবুও সমাজের শত্রুকে ধরণীর বুক থেকে সরিয়ে দেওয়াই। তার কাজ, তার পেশা, তার ব্রত। বন্ডের ডাক পড়েছে ভন হ্যাঁমারস্টাইনকে দুনিয়া থেকে সরানোর জন্য।
সহসা লাফিয়ে উঠল বন্ড। উপত্যকায় এক ঝলক আগুন দেখা দিয়েছে। সেই সঙ্গে অটোমেটিক আগ্নেয়াস্ত্রের নির্ঘোষ শোনা গেছে। দ্বিতীয় নির্ঘোষের সঙ্গে সঙ্গে রাইফেল তাক করল বন্ড।
দেখা গেল, নীল ধূসর পালক ছড়িয়ে একটা মাছরাঙা পাখি ঘুরতে ঘুরতে এসে পড়ল হ্যাঁমারস্টাইনের পায়ের কাছে। গুলিবিদ্ধ পাখি, ধোঁয়া উঠতে দেখা গেল হ্যাঁমারস্টাইনের হাতে ধরা টমিগানের নল থেকে। হাসছে আর হাততালি দিচ্ছে সাঙ্গপাঙ্গরা। পালের গোদা মেয়ে দুটিকে হুকুম করার সঙ্গে সঙ্গে ভেতর থেকে দুটি শ্যাম্পেনের বোতল নিয়ে এল।
বন্দুকবাজ দুই স্যাঙাৎ টমিগানে গুলিভরা নতুন ম্যাগাজিন লাগাল। দু জনেই হেলান দিয়ে দাঁড়াল বাধের গায়ে। একই সঙ্গে শ্যাম্পেনের বোতল দুটো শূন্যে নিক্ষেপ করল ভন হ্যাঁমারস্টাইন। একই সঙ্গে ঘুরে গিয়ে একই সঙ্গে টমিগান তুলে একসঙ্গে ট্রিগার টিপল দু জনে। গুলিবর্ষণের বজ্রনির্ঘোষে থরথর করে কেঁপে উঠল উপত্যকা। পাখির দল ককিয়ে উঠে উড়ল আকাশে। গুলির ঘায়ে ছিন্নভিন্ন ডালপালা ঠিকড়ে গেল লেকের পানিতে। একটা বোতল নিমেষে গুঁড়িয়ে পাউডার হয়ে গেল। আর একটা সেকেন্ডের পরেই দু টুকরো হয়ে গেল একটি মাত্র বুলেটের ঘায়ে। বিজয়ী বন্দুকবাজের গর্ব হল, আর মাথা হেট হল অন্যজনের।
