তুমিও কি সেই মতলবে ঘুর ঘুর করছ? শিকারী? দেখি লাইসেন্সটা।
বিনা বাক্যব্যয়ে বুকপকেট থেকে এক তা কাগজ বার করল। লাইসেন্সই বটে। ভাবমেন্টের বেনিংটন থেকে জুডি হ্যাভলকের নামে লাইসেন্স বেরিয়েছে। একটা ফর্দর পারমিটও রয়েছে। তীর ধনুকের জায়গায় রয়েছে। জুডি হ্যাভলকের বয়স পঁচিশ। জন্মস্থান, জ্যামাইকা।
ভেতরে ভেতরে চমকে উঠল বন্ড। সর্বনাশ! মেয়েটার সাহস তো কম নয়।– জুডি, তুমি একটা মেয়ে বটে! জ্যামাইকা থেকে মাঠ-বন-প্রান্তর পেরিয়ে এসেছ পিতৃহত্যার শোধ নিতে ঐ তীর ধনুক দিয়ে? চীনদেশের সেই প্রবাদটার কথা মনে পড়ছে। প্রতিহিংসা নিতে যাওয়ার আগে, দুটো কবর একসঙ্গেই খুঁড়ে রেখ।
কে আপনি? কি করছেন এখানে? এত কথাই বা জানলেন কি করে?
নাম তো শুনলেই, আমার আবির্ভাব লন্ডন, মানে স্কটল্যান্ড থেকে। তোমার কথা আমি জানি, নিচের বাড়ির ঐ ওরা যাতে কোনদিন তোমাকে না জ্বালাতে পারে, সে ব্যবস্থা আমাকেই করতে হবে।
আমার অত্যন্ত প্রিয় টাট্ট ঘোড়াকে ওরা বিষ খাইয়ে মেরেছে। আমার ছোটবেলার অ্যালেসেশিয়ানকে গুলি করে খতম করেছে। তারপরেই এল একটা চিঠি, মরণের হাত অগুন্তি। একটা হাত উদ্যত হল তোমার শিরে। বিশেষ একটা দিনে খবরের কাগজে একটা নোটিশ ছাপতে হবে–হুঁকুম শিরোধার্য জুডি। সিধে গেলাম পুলিশ ফাঁড়িতে। তারা অভয় দিল। আর বলল, ভয় দেখানোর চিঠির লেখক কিউবার গুণ্ডারা বলেই মনে হয়। কিউবাতে গিয়ে নামী। দামী পোশাক আর গয়না পরে সেরা হোটেলে উঠে জুয়া খেলার খেলায় মাতলাম। কাজেই সবাই আমাকে ছেকে ধরল। আমিও এমন ভান করলাম যেন রোমাঞ্চের অন্বেষণে এতদূর আসা। জিজ্ঞেস করতে করতে অবশেষে খুঁজে পেলাম ঐ শয়তানের তর্জনীর নির্দেশে নিচের বাড়িটা দেখাল জুডি। কিন্তু বীরপুরুষ তখন কিউবা ছেড়ে পালিয়েছে। ব্যাঠিসটা নাকি অনেক কুকীর্তির খবর জেনে ফেলেছিল। বাকিটুকু উদ্ধার করলাম এক হোমরাচোমরা পুলিশ অফিসারের পেট থেকে। সে জন্য অবশ্য আমাকে একটু বেশি রকমের ঢলাঢলি করতে হয়েছিল। যাক, কিউবা থেকে সোজা গেলাম আমেরিকায়। পিংকারটনরা নাকি পৃথিবীর বিখ্যাত ডিটেকটিভ। মোটা টাকার বিনিময়ে ঐ হতভাগার এখানকার ঠিকানা পেলাম। এই হল আমার কাহিনী।
এখানে এলে কি করে?
বেনিংটন পর্যন্ত আকাশপথে। তারপর হেঁটে। চারদিন হেঁটেছি। সবুজ পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে রাস্তা। জ্যামাইকার পাহাড়ে আমার বাড়ি। এখানকার চাইতে চড়াই উত্রাই সেখানে আরো বিপজ্জনক।
বেশ, এবার মতলব কি? মানে, কি করা হবে?
ভন হ্যামারস্টাইনকে তীর দিয়ে এফোঁড়-ওফোঁড় করা হবে। তারপর ফের হাঁটাপথে ফেরা হবে বেনিংটনে।
কথা বলার শব্দ ভেসে এল নিচের উপত্যকা থেকে। বন্ড উঠে ডালপালার ফাঁক দিয়ে দেখল দু জন মেয়ে আর তিনটে পুরুষ উঠানে দাঁড়িয়েছে। হাসি আর কথার মধ্যে চেয়ারে বসল। একটা চেয়ার শূন্য। এ চেয়ারের দু পাশে দুটি মেয়ে বসে। চেয়ারের অবস্থানও গুরুত্বপূর্ণ জায়গায় টেবিলের মাথার দিকে।
টেলিস্কোপ বার করল বন্ড। লেন্সের মধ্যে দিয়ে দেখা গেল কালচে রঙের বামনাকার তিনটে পুরুষকে। একজনের মুখে হাসি যেন আর ধরে না। গোনজালিস এরই নাম সন্দেহ নেই। অপর দু জনের চাষাড়ে চেহারা।
মেয়ে দুটি শ্যামাঙ্গী। কিউবার নিচু মহলের স্বৈরিণী বলেই মনে হল। পরনে অতি উজ্জ্বল গোসলের কাপড়, বিস্তর সোনার গহনা। সুদৃশ্য বানরের মত হাসি আর কিচকিচ কথায় মত্ত, কিছু বোঝা যাচ্ছে না। কেননা ভাষাটা স্পেনীয়।
বন্ড টের পেল, পেছনে দাঁড়িয়েছে রূপসী বনমালা। টেলিস্কোপ দিয়ে বন্ড বলল, স্মার্ট লোকটা হল মেজর গোনজালিস। অন্য দু জন বন্দুকবাজ বডিগার্ড। মেয়ে দুটোকে চিনি না। ভন হ্যাঁমারস্টাইন এখনো আসেনি।
টেলিস্কোপে দেখে মেয়েটা সঙ্গে সঙ্গেই ফেরত দিল। মন্তব্য করল না। বাবা-মার হত্যাকারীদের চিনতে পারল কি জুডি হ্যাভলক?
স্বাগত ধ্বনির উল্লাস কণ্ঠ ভেসে এল কানে। খর্বকার চৌকোনো চেহারার, প্রায় উলঙ্গ একটা লোক বেরিয়ে এল। টেবিল পেরিয়ে সবুজ লনের কিনারায় গিয়ে শরীর চর্চা শুরু হল। পুরো পাঁচ মিনিট চলল।
বন্ড মানুষটাকে দেখছিল। লম্বা প্রায় পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি। মুষ্টিযোদ্ধাদের মত গড়ন। কুচকুচে কালো ঘন লোমে বুক ও পিঠ ঢাকা। হাতে পায়েও কালো লোমের কম্বল। কিন্তু একগাছি চুলও নেই মুখে ও মাথায়। মাথার পেছন দিকে একটা টোল। সম্ভবত পুরোনো চোট। জার্মান অফিসারের মত মুখের গড়ন চারচৌকো, কঠোর, উদ্ধত। ন্যাংটা ভুরুর তলায় চোখ দুটো শুওরের মত কুকুতে। ঠোঁট দুটো কদাকার রকমের পুরু, লালচে। মনিবন্ধে জড়োয়া ব্রেসলেটে সোনার মস্ত রিস্টওয়াচ। M-এর ফাইলে ভন হ্যাঁমারস্টাইনের যেভাবে বর্ণনা আছে। লোকটা অবিকল সেইরকমই।
বন্ড রূপসী বনমালার মুখ নিষ্ঠুর ও ভয়ঙ্কর দেখল। এতদূরে এসে দেখা পাওয়া গেল। কিন্তু এ মেয়েকে নিয়ে তো ঝামেলা হবে। শেষ মুহূর্তে হয়ত তীরধনুক বার করে গোলমালও বাধাতে পারে। বেশি কিছু নয়, করোটির নিচে ঘাড়ের ওপর ছোট এক ঘা মারলেই জ্ঞান হারাবে জুডি। তারপর কাম ফতে না হওয়া পর্যন্ত মুখ আর হাত বেঁধে রাখলেই হল। বন্ড রিভালবারে হাত রাখল।
ধড়ফড় করল না বনমালা। কয়েক পা পিছিয়ে, মাটিতে টেলিস্কোপ রেখে ধনুক তুলে তুন লাগাল। বন্ডের দিকে– নষ্টামি বুদ্ধি ছাড় ন। তফাতে থাকুন আমার নজর সবদিকেই। মেরে পোস্তা ওড়াতে না পারি, তীর আমার ফসকায় না। একশ গজ দূর থেকেও পাখিরা রেহাই পায়নি আমার ধনুকের সামনে। খামোকা আপনার পায়ে তীর মারতে চাই না, পথ ছাড়ুন, মরণ বাড় বাড়বেন না।
