কিন্তু না। সেরকম কিছুই দেখা গেল না। শেষে ওকগাছের গুঁড়ির আড়ালে দাঁড়িয়ে বন্ড দেখল তখনো জানলায় পর্দা নামানো। ধোঁয়া উঠছে শুধু একটা চিমনি দিয়ে।
আটটা বাজে। ঢালু মাঠের মাঝে মস্ত একটা মেপল্ গাছকে মনে ধরল বন্ডের। জামা কাপড়ের সঙ্গে রঙে দিব্বি মিশ খাবে ও গাছ। ঘাপটি মারবার উপযুক্ত জায়গা। হৃদ আর বাড়ি দুদিকেই নজর রাখা যাবে। তবে ঘাসের মধ্যে দিয়ে বুকে হেঁটে পৌঁছতে হবে। হাওয়া বইছে। যতক্ষণ হাওয়া বইবে, ততক্ষণ বন্ডের গতিও গোপন থাকবে। নইলে–
আচম্বিতে একটা শব্দ শোনা গেল। মট করে একটা ডাল ভাঙল বাঁদিকে। সঙ্গে সঙ্গে হাঁটু পেতে বসে পড়ল বস্তু। ঝাড়া দশ মিনিট ওৎ পেতে রইল।
পশু পাখিরা শুকনো ডাল ভেঙে শব্দ সৃষ্টি করে না। শুকনো কাঠ বিশেষ বিপদ সংকেত বহন করে ওদের কাছে। তাই ওরা অত হুঁশিয়ার। তবে কি জঙ্গলেও পাহারা বসিয়েছে হ্যাঁমারস্টাইন?
সন্তর্পণে কাঁধ থেকে রাইফেল নামাল বন্ড। বুড়ো আঙুল রইল সেফটি ক্যাচে। সহসা দুটো হরিণ হেলতে দুলতে এগিয়ে গেল গাছের দিকে, যেখানে ডাল ভেঙেছে। শান্ত চোখে ভয়ের লেশমাত্র নেই। স্বস্তির নিশ্বাস ফেলল বন্ড। পাহারাদার নয়, এরাই শব্দ সৃষ্টি করেছে।
ঘাসের মধ্যে দিয়ে সাপের মত বুকে হেঁটে পাঁচশ গজ যাওয়া চাট্টিখানি কথা নয়, তবুও বন্ড এগুলো। হাওয়া বইছে, ঘাস দুলছে।
আকাশ থেকে দেখলে মনে হত যেন মস্ত একটা উদবিড়াল ঘাসের মধ্যে দিয়ে এগুচ্ছে। না, একটা নয়–দুটো উদবিড়াল। কেননা, ঘাস সমুদ্রে পেছন থেকে এগিয়ে আসছে আর একজন বন্ডের মতই ঘাসের মধ্যে বুকে হেঁটে।
বন্ড কিন্তু কিছুই টের পায়নি। লক্ষ্য শুধু মেপল গাছের দিকে। বিশ ফুট দূরে এসে একটু জিরিয়ে নেওয়ার জন্য থামল। হাঁটু আর কনুই টনটন করছিল। তাই ম্যাসাজ করছে, এমন সময়ে ফিসফিসানি শোনা গেল বাঁদিক থেকে। শুনেই আচমকা ঘাড় ঘোরাতে গিয়ে কট করে উঠল বন্ডের পিঠের শিরদাঁড়া।
লাশ ফেলে দেব আর এক ইঞ্চি নড়লেই, গলাটা মেয়েলী। কিন্তু হুকুমটা কঠোর।
বন্ডের বুকের মধ্যে দুরমুশ পেটা শুরু হয়ে গেল তীরের ডগা দেখে। মাত্র আঠারো ইঞ্চি দূরে ঘাসের মধ্যে থেকে মাথা তাগ করে রয়েছে নীলচে ইস্পাতের তীরের ফলা।
ধনুকটা জমির সঙ্গে সমান্তরাল করে ধরা, ঘাসের মধ্যে লুকানো ছিলের সঙ্গে তীর ধরে, আঙুলটার গাঁট পর্যন্ত সাদা হয়ে গিয়েছে। পটভূমিকায় জ্বলজ্বল করছে একজোড়া ধূসর চোখ, ঘামে চকচকে রোদে-পোড়া তামাটে চামড়া। থুথু দিয়ে গলা ভিজিয়ে নিল বন্ড। অতি সন্তপর্ণে ডান হাত এগোল রিভলবারের দিকে। মোলায়েম স্বরে–তুমি আবার কে হে?
তীরের ডগা ভয়ঙ্কর ভঙ্গিমায় নড়ে উঠল। বামাকন্ঠ ডানহাত নড়াবেন না। কাধ ফুটো করে দেব। কে আপনি? গার্ড
না। আপনি কে?
আহাম্মক। কি করছেন এখানে? উচ্চারণ শুনে মনে হল স্কটল্যান্ড বা ওয়েলস-এর বাসিন্দা।
হে রবিনা। তীর ধনুকটা নামালে হয় না? নিশ্চিন্ত হয়ে কথা বলা যেত।
রিভলবারে হাত দেবেন না বলুন?
না। আপাতত ঘাসজমির ভেতর থেকে বেরুনো যাক। বলে আর দ্বিধা করল না বন্ড। ফের কনুই আর হাঁটুর ওপর দিয়ে দেহটাকে সরীসৃপ ভঙ্গিমায় টেনে নিল মেপল গাছের দিকে। মেয়েটির ব্যবস্থা হবে তারপর। গুলিবর্ষণ শুরু হওয়ার আগেই এ মেয়েকে গুলির পাল্লার বাইরে সরাতে হবে।
গাছের গুঁড়ির কাছে পৌঁছল বন্ড। উটে দাঁড়াল অতি সাবধানে। রোদ্দুরে জ্বলন্ত পাতার মধ্যে দিয়ে দেখল, অনেকগুলো জানালার পর্দা এর মধ্যেই সরে গেছে। ভোলা উঠোনে জমজমাট সকালের নাস্তার আয়োজন করছে দু জন কাফ্রী মেয়ে। কাঁধ থেকে রাইফেল নামিয়ে গুঁড়িতে হেলান দিয়ে বন্ড বসল। ঘাসের ভেতর থেকে মেয়েটা বেরিয়ে। এল। হাতে তীর ধুনক, তবে ছিলে এখন ঢিলে।
মেয়েটাকে দেখতে বেশ। তবে জামাকাপড়ে চুলে শ্রী নেই। শার্ট আর ট্রাউজার্স ছেঁড়া, কাদামাখা। পোশাক জলপাই সবুজ রঙের। সোনালি রঙের চুল আঁট করে বাঁধা। চোখে মুখে বুনো রূপ, উঁচু হনু, রূপো রূপো ধূসরাভ ভৎর্সনা মেশানো চোখ। একটা হতে কালসিটে আর আঁচড়ের দাগ। আঁচড় কনুইতেও। হাতে ধনুক আর কোমরের বেল্টে শিকারী ছুরি ছাড়া আর কোন হাতিয়ার নেই। নিতম্বে একটা ছোট্ট বাদামী ক্যানভাসের ব্যাগ–খুব সম্ভব খাবারের থলি। সব মিলিয়ে এ রূপ দেখলেই মনে হয়, সুন্দরী কিন্তু বিপজ্জনক নারী। বন্য প্রকৃতির সঙ্গে মিতালি নিবিড়। জঙ্গল তার নখদর্পণে। জীবনপথে একলা চলার সাহস আছে। সভ্যতার সঙ্গে সম্পর্ক অতি ক্ষীণ।
চমৎকার! মনে মনে ভাবল বন্ড। হেসে বলল, তোমার নাম দিলাম রবিন হুড–রবিন হুডের মহিলা সংস্করণ। আমার নাম জেমস্ বন্ড। ছিপি খুলে ফ্লাস্ক এগিয়ে দিয়ে খাও কফি আর আগুন-পানি একসঙ্গে মেশানো। চাও তো শুকনো মাংসও দিতে পারি। নাকি, ফল আর শিশির খাওয়া অভ্যেস?
কাছে এল সুন্দরী। কিন্তু গজখানেক তফাতে বসল। বসার কায়দা রেড ইন্ডিয়ানদের মত। মুখে ফ্লাস্ক উপুড় করে খানিকটা তরল আগুন গলায় ঢালল। ধন্যবাদ শব্দটা কোনমতে আউড়ে তীরটা গুঁজে রাখল তৃণে। চোখে চোখ রেখে বলল, চুপিসাড়ে জঙ্গলে ঢুকেছেন মনে হচ্ছে। হরিণ শিকারের মরসুম শুরু হতে এখনো তিন সপ্তাহ দেরি। এখানে হরিণ পাবেন রাত্রে, যদি আরও ওপরে ওঠেন তবে দিনেই হরিণ পাবেন। গোটা দলটা পাবেন কিন্তু শব্দ করতে পারবেন না।
