শূন্য ফাইল বন্ধ করল কর্নেল জন্স। টাইপ করা ফর্দটা কুচিয়ে ফেলে দিল ছেঁড়া কাগজের ঝুড়িতে। বন্ডের সঙ্গে দরজা গিয়ে বলল, আর্মিতে যখন ছিলাম, এ ধরনের, দু একটা কাজ আমাকেও করতে হয়েছে। পুলিশের কাজে সে মজা নেই, পেনশনের প্রত্যাশায় হাত পরিষ্কার না রাখলেই নয়। যাক, কাগজেই খবরটা পড়া যাবে খন। বলে হাসল কর্নেল–ভাল হোক, মন্দ হোক খবরতো!
ধন্যবাদ জানিয়ে করমর্দন করল বন্ড। শুধাল–ভাল কথা, স্যাভেজ রাইফেলে কটা টান লাগে। একটা না দুটো? টার্গেট দেখলে এক্সপেরিমেন্টের সময় না পেতে পারি।
একটানেই কাজ হবে। হেয়ার-ট্রিগার। টার্গেট না আসা পর্যন্ত ট্রিগারে যেন আঙুল না লাগে। তিনশ গজ পাল্লার মধ্যেও আসবেন না। শুনেছি, শয়তানগুলোর লক্ষ্য নাকি ব্যর্থ হয় না। বেশি কাছে না যাওয়াই মঙ্গল। এক হাতে পাল্লা খুলে ধরে অপর হাত বন্ডের কাঁধে রাখল কর্নেল, কমিশনার একটা কথা হামেশা বলেন, বুলেট যেখানে পৌঁছায়, খামোকা সেখানে মানুষ পাঠিও না, কম্যান্ডার, কথাটা খেয়াল রাখবেন।
সমস্ত রাত এবং পরের দিনটাও মনট্রিয়লের বাইরে কো-জী মোটর কোর্টে কাটাল বন্ড। তিন রাত্রির অগ্রিম পাওনা আগেই মিটিয়ে দিল বন্ড। জিনিসপত্র দেখে শুনে নিতে হল, কিছু গ্লুকোজ বড়ি। খানিকটা মাংস (সেঁকা) আর রুটি কিনে নিজেই স্যান্ডউইচ বানিয়ে খেল। একটা অ্যালুমিনিয়ামের বড় ফ্ল্যাঙ্ক কিনে তিন ভাগ ভরল হুইস্কিতে, এক ভাগ কফি দিয়ে। সন্ধ্যে হতেই ডিনার খেয়ে খানিকটা ঘুমিয়ে নিল। তারপর ওয়ালনাট রঙ পানিতে গুলে, বেশ করে গা ধুয়ে নিল। এমনকি চুলের গোড়া পর্যন্ত রাঙিয়ে নিল। ফলে চোখের নিমেষে বন্ডের রঙ পাল্টে রেড ইন্ডিয়ান হয়ে গেল। রাত দুপুর হতে না হতেই নিঃশব্দে পাশের দরজা খুলে গিয়ে বসল প্লিমাউথে। যথাসময়ে পৌঁছাল ফ্লেলিগসবার্গে।
কর্নেল জন্স বলেছিল, গ্যারেজে যে ছোকরা সারারাত ডিউটি দেয়, ঘুম চোখে সে কিছু লক্ষ্য করবে না। কিন্তু বন্ড দেখল, ছোরার চোখে ঘুম নেই।
মিস্টার কি শিকারে যাচ্ছেন?
বন্ড কাঁধের রাইফেল নামাতে নামাতে বলল, হু।
শনিবার হাইগেট ঝরণার ধারে একটা ভারি সুন্দর বীভার মেরে আনলেন একজন।
তাই নাকি? অন্যমনস্কভাবে বলে বন্ড বেরিয়ে পড়ল গ্যারেজ থেকে। সদর রাস্তা ধরে খানিক হাঁটতেই ডাইনে দেখা গেল কালচে পথটা। পায়ে চলা রাস্তা সেঁধিয়েছে জঙ্গলের মধ্যে। আধঘণ্টা চলার পর দেখা গেল একটা ভাঙাচোরা বাড়ি। অন্ধকার খামার বাড়ি। বাড়ি প্রদক্ষিণ করে নদীর ধারে যেতেই আবার পথটা পাওয়া গেল। এবার তিনমাইল যেতে হবে। কুকুরের ডাক শোনা যাচ্ছিল, এবার নীরবতা। লম্বা পা চালিয়ে বন্ড এগোল। নরম পাহাড়ী জুতায় বেশ আরাম। ভোর চারটে নাগাদ জঙ্গল কমে এল, ডাইনে ফ্রাঙ্কলিনের আলো দেখা গেল। পিচের রাস্তা পেরিয়ে ফের মেঠো পথ। পাঁচটা নাগাদ ১০৮ ও ১২০ নম্বর সদর রাস্তা পেরিয়ে শুরু চড়াই ভাঙা। বেশ খানিকটা উঠে বন্ড ম্যাপটা পুড়িয়ে ফেলল। মনের চোখে বন্ড পাহাড়ের ওদিকের দৃশ্য দেখল। জানালায় পর্দাটানা বাড়ির মধ্যে ঘুমোচ্ছে চারটে রক্তলোভী মানুষ-পশু। জল্লাদ যাচ্ছে চার শয়তানকে যমালয়ের রাস্তা দেখাতে।
বন্ড পাহাড়ের মাথায় উঠেও নিচের উপত্যকা দেখতে পেল না। একটু জিরিয়ে একটা ওক গাছের মগডালে উঠল বন্ড। এবার চোখের সামনে ভেসে উঠল সবুজ পাহাড়ের দিগন্ত ছোঁয়া বিস্তার। পুব আকাশে সূয্যদেবের স্বর্ণগোলক। দু হাজার ফুট ঢালু জঙ্গলের প্রান্তে চওড়া মাঠ, হ্রদ, বাড়ি
ভোরের আলো মিনিট পনেরোর মধ্যেই হ্রদের পানিতে পড়ল। সবুজ মাঠ আর স্লেট ছাদ ঝলমল করে উঠল। রঙ্গমঞ্চ পরিষ্কার। এবার নাটক শুরু হবে।
পকেট থেকে টেলিস্কোপ বার করে টার্গেট দেখতে লাগল বন্ড। মাঠের কিনারায় দাঁড়ালে বাড়ির ছাদ রাইফেলের আওতার পাঁচশ গজের মধ্যে। ড্রাইভিং-বোর্ড আর হ্রদের তীর আসে তিনশ গজের মধ্যে। চার শয়তান কখন কি করে কিছুই জানা নেই, তাই সবুর করাই ভাল। কিন্তু বেটারা সকালে ওঠে কখন?
প্রশ্নের জবাবে পর্দা উঠে গেল একটা জানালা থেকে। স্প্রিং রোলারের শব্দ অত দূর থেকেও স্পষ্ট ভেসে এল বন্ডের কানে। একো লেক নামের তাৎপর্য এতক্ষণে বোঝা গেল। প্রতিধ্বনি হ্রদ। সামান্য আওয়াজের প্রতিধ্বনিও গম গম করে উঠে আসছে হ্রদে প্রতিহত হয়ে পাহাড় বেয়ে। কিন্তু বন্ডের নড়াচড়ার শব্দ নিচে পৌঁছানোর সম্ভাবনা নেই।
বাদিকের একটা চিমনির ডগায় ধোঁয়া উঠতে শুরু করেছে। বন্ড কল্পনা করল, নিশ্চয় মাংসের বড়া আর ডিম ভাজা শুরু হবে এখুনি। সেই সঙ্গে গরম গরম কফি। কিঞ্চিৎ খাদ্য উদরে দেওয়া দরকার, তারপর ফায়ারিং পয়েন্টে নেমে শুরু হবে গুলি বর্ষণ।
কিন্তু রুটি গলায় আটকালো। উদ্বেগ বাড়লে যা হয় আর কি। গলা কাঠ হয়ে আসছে, কল্পনায় দেখল, স্যাভেজ রাইফেল গুলি বর্ষণ শুরু করেছে। মিশমিশে কালো বুলেটগুলো যেন ধীর গতিতে নেমে যাচ্ছে নিচে উপত্যকার গোলাপি চামড়া লক্ষ্য করে। চামড়া ছিঁড়ে যেন তপ্ত বুলেট প্রবেশ করল ভেতরে…আরও ভেতরে…ধীরে এগুচ্ছে ছন্দিত হৃদপিণ্ডের দিকে…টিশু আর শিরা উপশিরা সরে সরে পথ করে দিচ্ছে বুলেটটাকে।
ফ্লাস্কে চুমুক দিল বন্ড। হুইস্কি আর কফির মিশ্রণ পৌঁছল পাকস্থলীতে, শরীর গরম হচ্ছে। রাইফেলটা কাঁধে ঝুলিয়ে অতি সন্তর্পণে নামতে লাগল গাছপালার ফাঁক দিয়ে। এমনভাবে নামতে লাগল যেন কোন শব্দ না জাগে। কিন্তু শব্দ জাগল। সমগ্র বনস্থলী সজাগ হল বন্ডের অনধিকার প্রবেশে। দুটো বাচ্চা নিয়ে ভয়ার্ত চোখে পালাল একটা হরিণী। একটি ভারি সুন্দর কাঠঠোকরা পাখি মহা সোরগোল তুলল। বেশ কয়েকটা ডোরাকাটা কাঠবেড়ালী দাঁত খিঁচিয়ে গলা বাড়িয়ে বেজায় লম্ফ ঝম্প শুরু করল। বন্ড মহা ভাবনায় পড়ল।
