বলল, লন্ডন থেকে অবশ্য শুনেই এসেছিলাম, কমিশনার নিজে এ ব্যাপারে থাকবেন না। আমার কর্তাও তা চান না। কমিশনারকে আমি চিনি না, তাঁর হেডকোয়ার্টারের ছায়াও মাড়াইনি। সুতরাং আসুন না মিনিট দশেক প্রাণ খুলে কথা বলা যাক।
কর্নেল জল হেসে ফেলল, নিশ্চয়, নিশ্চয়। আমার ওপরেও হুকুম আছে, গাওনাটা আগে ভাগে গেয়ে নিয়ে কাজে হাত দেবার। বুঝতেই তো পারছেন, অনেকগুলো বেআইনি ব্যাপার করব আপনাকে-আমাতে। বাজে হল ছুতোয় শিকারের লাইসেন্স নেওয়া, সীমান্তের কানুন ভাঙা, সবশেষে আরও খারাপ কাজ করা। তাই না?
হুবহু তাই। এখান থেকে একবার বেরালে কেউ কাউকে চিনতেই পারব না। জেলে আটকা পড়লে তো কথাই নেই। বলুন, এবার কি?
ড্রয়ার টেনে একটা ফাইল বার করল কর্নেল। প্রথমেই রয়েছে একটা ফর্দ। পয়লা দফায় পেন্সিল ঠেকিয়ে তাকাল বন্ডের দিকে। তীক্ষ্ণ চোখ পিছলে গেল বন্ডের সাদা-কালো কুকুর-দাত প্যাটার্নের ট্যুইড-স্যুট, সাদা শার্ট আর এক চিলতে কালো টাইয়ের ওপর দিয়ে।
বলল, জামাকাপড়। ফাইল থেকে বেরুল একটা কাগজ। নিন, পুরোনো জামাকাপড়ের দোকানের ঠিকানা এতে আছে, আর আছে একটা ফর্দ, চট করে চোখে লাগে, এমনি বাহারি পোশাকের ধার দিয়েও যাবেন না। খাকি শার্ট, গাঢ় বাদামী জীন্স, পাহাড়ী বুট। দেখে নেবেন যাতে পরে অস্বস্তি না হয়। কেমিস্টের ঠিকানাও রইল। গেলেই বাদামী রঙ পাবেন। গ্যালন খানেক কিনবেন। বেশ করে গোসল করবেন। এসময়ে পাহাড়ে বাদামী রঙ বিস্তর দেখবেন। প্যারাসুট কাপড়ের দরকার হবে না। ঘাপটি মারবার জন্য বাড়তি কিছুই লাগবে না, বুঝলেন? ধরা যদি পড়েন তো দেখা যাবে জাতে আপনি ইংরেজ, কানাডায় এসেছেন শিকারের নেশায়, পথ ভুলেছেন, সীমান্ত পেরিয়েছেন। : রাইফেল? বাইরের ঘরে মিনিট দশেক বসে ছিলেন আপনি। সেই ফাঁকে আমি নিজেই নিচে গিয়েছিলাম, আমার প্লিমাউথে রাইফেলটা রেখে এসেছি। নতুন মডেলের স্যাভেজ ৯৯ এফ, ওয়েদারবাই ৬৬২ স্কোপ, ট্রিগার টিপলেই পাঁচটা গুলি বেরোবে পর-পর। ম্যাগাজিনে বুলেট থাকে একসঙ্গে বিশটা, হাইভেলসিটি ২৫০-৩.০০০। বাজারে এর চাইতে হাল্কা শিকারী রাইফেল আর নেই। ওজন মাত্র সাড়ে-ছ পাউন্ড। আমার এক বন্ধুর রাইফেল। যে কোন দিন ফেরৎ পেলেই চলবে। না পেলেও বন্ধুবর মন খারাপ করবে না। পরখ করে দেখেছি পাঁচশ গজ দূর পর্যন্ত এর বুলেট ছোটে। বন্দুকের লাইসেন্স, বলে লাইসেন্সটি এগিয়ে দিল কর্নেল পাসপোর্টে যে নাম দিয়েছে, লাইসেন্সও, সেই নামে রইল। শিকারের লাইসেন্সও ঐ নামে। খেয়াল রাখবেন, হরিণ মারবার মরসুম এখন নয়। ছোটখাট শিকার ছাড়া বড় শিকারের ছাড়পত্রও নয় এ লাইসেন্স। ড্রাইভিং লাইসেন্স নতুন করে দিলাম। হ্যাঁভারস্যাক, কম্পাস গাড়িতে রেখে এসেছি। ভাল কথা, নিজস্ব রিভলবার কাছে আছে নিশ্চয়।
তা আছে। ওয়ালথার পি,পিকে, বার্নল মানি হোর।
নাম্বারটা দিন। নাম্বার ছাড়া একটা লাইসেন্স আনিয়ে রাখিয়েছি। দৈবাৎ এ রিভলবার ফেরৎ এলে ধামাচাপা দেবার পথ পরিষ্কার রইল।
রিভলবার বার করে নাম্বারটা বলল বন্ড। ফর্মে লিখে নিয়ে ফেরৎ দিল কর্নেল।
এবার, ম্যাপ। এসো কোম্পানির এই ম্যাপেই কাজ হবে। তাটের সব কিছুই এতে পাবেন। উঠে এসে ম্যাপটা বন্ডের সামনে টেবিলে বিছিয়ে ধরে কর্নেল-১৭ নম্বর রাস্তা ধরে মনট্রিয়ল ফিরে যাবেন। তারপর ৩৭ নম্বর রুট ধরুন, সেন্ট অ্যানির ব্রীজ পেরিয়ে ফের ধরুন ৭ নম্বর রাস্তা। পাইক নদী পৌঁছে স্ট্যান ব্রীজের কাছে নেবেন ৫২ নাম্বার রুট। ফ্রেলিবার্গ পৌঁছে গাড়ি গ্যারেজে রাখুন। রাস্তা ভালই, জিরেন নিয়ে সব মিলিয়ে ঘণ্টা পাঁচেকের মোটর হাঁকানো। ঠিক আছে খেয়াল রাখবেন, ফ্রেলিবার্গে যেন রাত তিনটে নাগাদ পৌঁছাতে পারেন। গ্যারেজের ছোকরার ঘুম লেগে থাকবেই। গাড়ি থেকে কি-কি নামালেন, অত খেয়াল থাকবে না। চেয়ারে ফিরে গেল কর্নেল। এবার ফাইল থেকে বেরুল দু-তা কাগজ। প্রথম কাগজে-পেন্সিলে আঁকা একটা ম্যাপের খসড়া। দ্বিতীয়টিতে আকাশ থেকে তোলা একটা ফটোগ্রাফ।
গভীর চোখে তাকাল কর্নেল বিপদ এলেই আগে পুড়িয়ে ফেলবেন কাগজ দুটো। কাজ হয়ে গেলেও পুড়িয়ে ফেলবেন। পেন্সিলে আঁকা এই যে ম্যাপ দেখছেন, এটা একটা গোপন রাস্তা। এককালে যত খুনে গুণ্ডা বাটপাড় এপথে যাতায়াত করত–আগলার। এখন ওরা স্থলপথ ছেড়ে আকাশ পথে কাজ সারে। অতএব আপনি এ পথে নিরাপদ সেকাল হলে নির্ঘাৎ গুলি খেয়ে মরতেন। সবুজ পাহাড়ে পৌঁছানোর এই হল গোপন পথ। তারপর চড়াই ভেঙে উঠবেন উপত্যকার ওপর। এই যে ক্রুশ চিহ, এইখানে রয়েছে একো লেক। ছবি দেখে তো মনে হচ্ছে পুব দিক থেকেই আসা উচিত।
দূরত্ব কত? মাইল দশেক?
সাড়ে-দশ। ঐেলিগৃসবার্গ থেকে ঘণ্টা তিনেকের পথ। ছ টা নাগাদ আসল জায়গায় পৌঁছাবেন। দিনের আলোয় ঘণ্টাখানেক। বাকি পথটুকু দেখে শুনে হাঁটবেন। বলে, চৌকোণা ফটোগ্রাফটা এগিয়ে দিল কর্নেল।
বন্ড দেখল, লন্ডনে যে ছবি সে দেখে এসেছে, তারই মাঝের অংশ বড় করে দেখানো হয়েছে এ ছবিতে। পাথরের একসারি বাড়ি। স্লেটপাথরের ছাদ। ঝিলিমিলি জানালা, ছাউনি দেওয়া ছাদ, দরজার সামনেই ধুলোভরা রাস্তা, পাশেই গ্যারেজ আর কুকুরের ঘর। বাগানের পাশে পাথর বাধানো চত্বর–ফুলঝোঁপের বর্ডার। সামনেই দু-তিন একর সবুজ মাঠ–লেক পর্যন্ত। নকল হ্রদ। পাথরের টেবিল চেয়ার–বাগানে বসার উপযুক্ত। সাঁতারুর পাটাতন, মানে, ডাইভিং বোর্ড। পানি থেকে ওঠবার মই।হ্রদের পর থেকেই জঙ্গল-খাড়াই ভাবে উঠে গেছে ওপরে। কর্নেলের ইচ্ছে এই দিক দিয়েই হানা দেওয়ার। ছবিতে জনমানব নেই। পাথর বাঁধানো চত্বরে শুধু অনেকগুলো দামী অ্যালুমিনিয়ামের গার্ডেন ফানিচার্স। কাঁচের টেবিলে মদ। বন্ডের মনে পড়ল, বড় ছবিতে টেনিস কোর্ট আর আস্তাবলও ছিল। সব মিলিয়ে একো লেক হল কোটিপতির বিশ্রামালয়। নিশ্চিন্ত মনে অ্যাটম বোমার আওতা থেকে বহু দূরে বসে শ্রান্ত মনকে চাঙা করে নেওয়ার নিকেতন। এ নিকেতন আপাতত এমন একজনের দখলে, ক্যারিবিয়ান কূটনীতিতে যে দশটি বছর ঝড় তুলেছে এবং ছমাস জিরিয়ে নিচ্ছে শক্তির ব্যাটারিতে নতুন চার্জ দেওয়ার জন্য।হ্রদ থাকায় সুবিধেও অনেক। রক্তাক্ত হাত সহজেই ধুয়ে নেওয়া যাবে।
